রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ইতিহাস বলছে, রাশিয়ার সামরিক ব্যর্থতা প্রায়ই দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। ফলে ইউক্রেনে কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হলে পুতিনকেও ব্যক্তিগতভাবে এর মূল্য দিতে হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
গত ৯ মে মস্কোয় অনুষ্ঠিত রাশিয়ার বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজে এই সংকটের প্রতীকী চিত্র ফুটে ওঠে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সেদিন রেড স্কয়ারে প্রচলিত ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র প্রদর্শন থেকে বিরত থাকে ক্রেমলিন। এটি ইঙ্গিত দেয়, ইউক্রেনকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি রুশ বাহিনী এখন রাজধানী মস্কোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।
সোমবার (১ জুন) ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন সরাসরি রাশিয়ার অভ্যন্তরে অনুভূত হচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মস্কোর প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে বারবার কার্যক্রম স্থগিত করতে হচ্ছে, মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং রাজধানীর রাস্তায় উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের হামলায় রুশ তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানির দামও বেড়েছে।
ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ-এর প্রধান অ্যান কিস্ট-বাটলারের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় পাঁচ লাখ রুশ নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছেন। জনসংখ্যা হ্রাসের সমস্যায় থাকা রাশিয়ার জন্য এটি বড় ধরনের ধাক্কা।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে রাশিয়া এখনো ইউক্রেনের পুরো দোনবাস অঞ্চল দখল করতে পারেনি। বরং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কিছু এলাকায় ভূখণ্ড হারানোর খবরও এসেছে। ফলে রুশ অভিজাত মহলের মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। সম্প্রতি প্রভাবশালী সাময়িকী ‘রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, কিয়েভের পশ্চিমাপন্থী সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয় এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠাই রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
রাশিয়ার ইতিহাসে সামরিক ব্যর্থতার পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের একাধিক নজির রয়েছে। ১৯০৫ সালের রুশ-জাপান যুদ্ধের পর দেশে গণ অসন্তোষ বেড়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যর্থতা রুশ বিপ্লবের পথ তৈরি করেছিল। কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর নিকিতা ক্রুশ্চেভও ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। আফগানিস্তান যুদ্ধও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে পুতিনকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পথ সহজ নয়। তাঁর শাসনামলে বিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে, অনেক বিরোধী নেতা নিহত বা নির্বাসিত হয়েছেন। ২০২৩ সালে ভাড়াটে যোদ্ধার দল ‘ওয়াগনার’-এর প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের বিদ্রোহ পুতিনের ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে সেই বিদ্রোহও ব্যর্থ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হতে পারে রুশ অভিজাতদের মধ্যে বিভাজন। যদি প্রভাবশালী একটি অংশ মনে করে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দেশের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে তারা নতুন নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। তবে বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোতে পুতিনের প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের আধিপত্য থাকায় এমন পরিবর্তন ঘটানো কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে।
তারপরও অনেকের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার বর্তমান অবস্থান দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়। আর যা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না, একসময় না একসময় তা থেমে যাবে—এটাই বাস্তবতা।