উত্তর কলকাতার একটি পূজামণ্ডপে বৃষ্টি ও অতিরিক্ত জনস্রোতের কারণে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন। এই করুণ বিপর্যয় ভারতে আবারও নতুন করে বড় ধরনের ধর্মীয় জনসমাগম, উৎসব পরিচালনা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
গতকাল উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক থানা এলাকার চোরবাগান সার্বজনীন পূজামণ্ডপে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক তদন্ত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যায় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে বাইরে অপেক্ষারত শত শত দর্শনার্থী একযোগে মণ্ডপের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। ঠিক সেই সময়েই মাইকে করা একটি ঘোষণায় দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। প্রস্থান ও প্রবেশপথ অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় দর্শনার্থীরা একে অপরের ওপর পড়ে যান মানুষ, যার ফলে ঘটে এই পদদলনের ঘটনা।
তবে ভারতে এমন দুর্ঘটনা নতুন নয়। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সর্বোচ্চ সংস্থা ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথোরিটির (এনডিএমএ) ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঘটা সিংহভাগ পদদলনের ঘটনা ঘটে থাকে নানা ধর্মীয় উপাসনালয় বা উৎসব কেন্দ্রিক বড় জনসমাগমে।
সাধারণত যে ঘটনাকে আমরা ‘পদদলিত হওয়া’ বলি, বিজ্ঞানের ভাষায় তা মূলত ‘ক্রাউড ক্রাশ’ বা অতিরিক্ত জনচাপ। এ ধরনের ঘটনায় নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় প্রতি বর্গমিটারে মানুষের ঘনত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে, ব্যক্তি তাঁর নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান, তখনই এই বিপর্যয় ঘটে।
অবকাঠামোগত ত্রুটি: অত্যন্ত সংকীর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, অপ্রতুল ব্যারিকেড, দুর্বল বা অস্থায়ী সিঁড়ি এবং চলাচলের রাস্তায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব।
অতিরিক্ত ভিড় ও ধারণা ক্ষমতা সম্পর্কে না জানা: মণ্ডপ বা ভেন্যুর ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি মানুষকে একবারে প্রবেশ করতে দেওয়া।
হঠাৎ কোনো আতঙ্ক বা গুজব: আগুন, বিদ্যুতায়িত হওয়া, বৃষ্টি কিংবা মাইকের ভুল বা আতঙ্কজনক ঘোষণা।
শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু: এনডিএমএ-এর মতে, এ ধরনের দুর্ঘটনায় মানুষ সাধারণত পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যায় না। মারা যায় চারপাশে থাকা মানুষের প্রচণ্ড চাপে বুকের খাঁচা সংকুচিত হয়ে শ্বাস নিতে না পেরে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চোরবাগানের মণ্ডপে একযোগে কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
প্রথমত, আকস্মিক বৃষ্টি। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বাইরে থাকা হাজারো মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে সংকীর্ণ মণ্ডপের দিকে ধেয়ে যান। এর মধ্যে মন্দিরের মাইকে ভেসে আসে একটি অসাবধানী ঘোষণা। পূজা কমিটির করা এই ঘোষণাই আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি বাড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে পূজা কমিটির সদস্য ও দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, চলাচলের পথের সংকীর্ণতা। চোরবাগান মণ্ডপে ঢোকা ও বের হওয়ার পথ দুটিই ছিল সংকীর্ণ, যা অতিরিক্ত মানুষের চাপ সহ্য করতে পারেনি।
এই ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত অন্যান্য বড় পূজামণ্ডপগুলোতে দর্শনার্থী প্রবেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দেয়।
এনডিএমএ-র দিকনির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের বিপর্যয় রোধে কেবল ঘটনাপরবর্তী উদ্ধার কাজ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আগাম ও সুপরিকল্পিত ভিড় ব্যবস্থাপনা।
একটি মণ্ডপ বা ভেন্যুতে একবারে কতজন মানুষ অবস্থান করতে পারবেন, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে গেলে প্রবেশপথে বিকল্প ‘হোল্ডিং এলাকা’ তৈরি করে মানুষকে আটকে রাখতে হবে।
ভেতরে ঢোকা এবং বের হওয়ার পথ সম্পূর্ণ আলাদা হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই দুটি বিপরীতমুখী জনস্রোতকে একটি রাস্তায় মেশানো যাবে না।
উৎসব বা পূজা মণ্ডপে দর্শনার্থীদের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার একমুখী পথ নির্ধারণ করা জরুরি, যাতে কোথাও কোনো ‘বোটলনেক’ বা যানজটের সৃষ্টি না হয়।
মাইক বা সাউন্ড সিস্টেমে এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া যাবে না যা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে। মাইকের তথ্য হবে নির্দেশনামূলক, স্পষ্ট ও শান্তিপূর্ণ।
ড্রোন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও সেন্সরের সাহায্যে মণ্ডপের কোন অংশে ভিড় বা ঘনত্ব বেশি হচ্ছে, তা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হবে এবং ঘনত্ব বাড়ার আগেই প্রবেশ পথ বন্ধ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস