মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দিনের সাময়িক শান্ত পরিবেশের অবসান ঘটিয়ে ইরানের নতুন সামরিক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের রণকৌশলে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনীর ওপর একটি ‘অপ্রত্যাশিত’ আক্রমণের মাধ্যমে তেহরান কৌশলগতভাবে নতুন বার্তা দিল—এবার তারা কেবল আমেরিকান হামলার প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজেদের শর্তে সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করতে প্রস্তুত।
ইরানের এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আবারও মারাত্মক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী নজিরবিহীন ও কঠোর আক্রমণ চালাবে। এই হুমকির জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে জোরালো বিমান হামলা শুরু করেছে এবং ইসলামি রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ডজনখানেক ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে।
এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের অনুরোধেই যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে বিমান হামলা স্থগিত রেখেছিল। যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দেয়নি, তবে সাময়িকভাবে সেনা অভিযান বন্ধ রাখার কথা স্বীকার করেছিল। তার পরও, নতুন করে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো প্রমাণ করেছে, তেহরান মার্কিন সামরিক চাপ উপেক্ষা করেই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈঠকের পরই ইরানের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদ রেজা আজিজির মতে, ইরান এবার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি বদলে সম্ভাব্য হুমকি ঠেকাতে আগাম বা পূর্বপ্রস্তুতিমূলক হামলার পথে হাঁটছে। ইসরায়েল যখন ইরানি জ্বালানি অবকাঠামোয় আক্রমণের পথ খুঁজছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে তেহরান নিজের সামরিক সক্ষমতার জানান দিল।
সংঘাত এখন একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। জর্ডানে হামলার পরপরই মার্কিন ও সৌদি বাহিনী যৌথভাবে ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর হামলা চালায়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ সৌদি আরব এখন তিন দিক থেকে (ইয়েমেনের হুতি, ইরাকের মিলিশিয়া এবং ইরান) সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
ইরানের ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি স্পষ্ট করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের সার্বভৌমত্ব তাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল হাতিয়ার। ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিকল্প নৌপথকে তেহরান তাদের রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমার লঙ্ঘন হিসেবে দেখে। স্বল্পমেয়াদে এই যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করাই তেহরানের প্রধান অগ্রাধিকার।
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সাইট্রিনোভিচের মতে, তেহরান মার্কিন সাময়িক বিরতিকে সংযম নয়, বরং ‘কৌশলগত দুর্বলতা’ হিসেবে গণ্য করছে। এর ফলে দুই পক্ষই এমন এক চক্রে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে কেউ পিছপা হতে রাজি নয়। পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো ইরানি দাবির কিছু অংশ মেনে নিতে হবে, অথবা মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপথ ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী এক বিধ্বংসী যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে হবে।