হোম > বিশ্লেষণ

যেসব কারণে এবারের ইরান চুক্তি আগের চেয়ে আলাদা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আজ বৃহস্পতিবার ইরানের তেহরান থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত ফারসি ভাষার দৈনিক হামশাহরির প্রথম পাতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি ব্যঙ্গাত্মক ছবি। ছবি: এএফপি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অতর্কিত বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে অবশেষে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৪ দফার এই খসড়া চুক্তি প্রকাশের পর থেকে এর ভেতরে কী আছে আর কী বাদ পড়েছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

অনেকেই এই চুক্তির সঙ্গে ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের আমলে হওয়া জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) বা ইরান পারমাণবিক চুক্তির তুলনা করছেন, যা ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে (২০১৮ সাল) বাতিল করেছিলেন। বিবিসি ভেরিফাই চুক্তির নথিপত্র পর্যালোচনা করে তিনটি ভিন্ন সময়ের (২০১৬-১৮ সালে জেসিপিওএ কার্যকরের সময়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থা এবং বর্তমান চুক্তি স্বাক্ষরের পর) পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ‘অস্ত্র, অর্থ ও জাহাজ’—এই তিন ভাগে চুক্তির পার্থক্যগুলো তুলে ধরেছে।

চলুন জেনে নিই—এবারের চুক্তিতে ইরান কতটা শক্ত অবস্থানে আছে বা ট্রাম্প কতটা ছাড় দিলেন—

অস্ত্র

ওবামা আমলে হওয়া চুক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টানা। সে সময় ইরানের পারমাণবিক উপাদানের মজুত ৩০০ কেজিতে সীমিত করা হয় এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের ওপরে নেওয়ার ওপর ১৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকেও (আইএইএ) দেওয়া হয় সার্বক্ষণিক নজরদারির ক্ষমতা।

কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প আগের চুক্তিটি বাতিল করার পর ইরান আবার পুরোদমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত ছিল এবং এটি সহজেই সামরিক গ্রেডের ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা সম্ভব।

এবারের চুক্তিতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেও বিস্তারিত কোনো রূপরেখা নেই। চুক্তিতে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও জমা করা উপাদান নিষ্ক্রিয় করার বিষয়ে ‘ভবিষ্যতে আলোচনা করবে’। ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক উপাদান ধ্বংস বা দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে, তবে চুক্তির মূল নথিতে এর কোনো উল্লেখ নেই।

সবচেয়ে বড় চমক হলো, এই চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কোনো কথাই নেই। অথচ ২০১৮ সালে এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অজুহাতেই ট্রাম্প আগের চুক্তি বাতিল করেছিলেন। গতকাল বুধবার (১৭ জুন) ট্রাম্প উল্টো মন্তব্য করেছেন, আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের যখন ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তখন ইরানের এটি না থাকা ‘অন্যায়’।

অর্থ

ওবামা আমলের চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কোনো অর্থ দেয়নি। এর পরিবর্তে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল এবং বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল।

২০১৮ সালে ট্রাম্প চুক্তি বাতিলের পর ইরানের ওপর একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক ও তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান চরম অর্থনৈতিক সংকটে ছিল, যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশজুড়ে তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল।

নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে ‘সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা’ তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, চুক্তি সইয়ের পরপরই কোনো শর্ত ছাড়াই ইরানকে তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং সেবা ও পরিবহনের ওপর ‘তাৎক্ষণিক ছাড়’ দেওয়া হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে ইরানকে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক সহযোগীরা মিলে ইরানের ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়নের’ জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠন করবে বলে চুক্তিতে সম্মত হয়েছে।

জাহাজ ও জলপথ

প্রথম চুক্তির পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। এর আগে ২০১৫ সালের জেসিপিওএ চুক্তিতে এই সংকীর্ণ জলপথের কোনো উল্লেখই ছিল না। সে সময় এই রুট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ পার হতো।

২০২৬ সালে যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন নৌ অবরোধ ও বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল দৈনিক মাত্র ছয়টিতে নেমে আসে (অনেকে ট্র্যাকার বন্ধ করে যাতায়াত করায় প্রকৃত সংখ্যা কিছুটা বেশি হতে পারে)।

নতুন চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে। বিনিময়ে ইরান আগামী ৬০ দিনের জন্য কোনো রকম ‘টোল বা শুল্ক ছাড়াই’ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ পারাপারের সুযোগ দেবে। তবে এরপর কী হবে, তা নির্ধারণে ইরান ও ওমান নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে।

এর মধ্যেই গত ২১ মে ইরান একতরফাভাবে এই জলপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’ গঠন করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দিয়েছে, সামনে ট্রানজিট টোল না নিলেও এই জলপথ ব্যবহারের জন্য তারা বিভিন্ন ‘ফি’ বা চার্জ আদায় করবে। নতুন চুক্তিতে ইরানের এই ফি আদায়ের অধিকার বন্ধ করার কোনো চেষ্টা করা হয়নি, যা এই অঞ্চলে ইরানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

ওবামার চুক্তিটি ছিল দীর্ঘ দুই বছর ধরে আলোচনার পর একটি চূড়ান্ত ও বিস্তারিত দলিল। আর ট্রাম্পের বর্তমান সমঝোতা স্মারকটি মূলত আগামী ৬০ দিনের আলোচনার একটি প্রাথমিক রূপরেখা মাত্র। তবে আপাতদৃষ্টিতে, কোনো বড় ছাড় দেওয়া ছাড়াই ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা ও আঞ্চলিক ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পেরেছে।

অন্যদিকে, ট্রাম্প যে কারণে ইরানের ওপর হামলা করেছিলেন, এবারের চুক্তিতে এ রকম অনেক বিষয়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চুক্তি সইয়ের পরপরই কোনো শর্ত ছাড়াই ইরানকে বিভিন্ন আর্থিক খাতে ‘তাৎক্ষণিক ছাড়’ দেওয়া হয়েছে এবং ইরানের ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়নের’ জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠন করা হবে বলেও বলা হয়েছে। অর্থাৎ, বলাই যায়, এবারের চুক্তিতে ইরানই ‘জয়ী’।

ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের নাম পরিবর্তন: ভারতের ওপর ভরসা কমাচ্ছেন ট্রাম্প?

ট্রাম্পের ইউ-টার্নে নেতানিয়াহুর অজেয় ও গ্রেটার ইসরায়েলের স্বপ্নে ফাটল

আরও শক্তিশালী ইরান, প্রতিদ্বন্দ্বী তেহরানের দিকেই ঝুঁকছে উপসাগরীয় দেশগুলো

৪৭ বছরের বৈরিতা: অবশেষে যেভাবে চুক্তিতে পৌঁছাল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে কারা

৩ নাবিকের মৃত্যু, পচন ধরা লাশ: উপসাগরীয় সংঘাতের কোলাটেরাল ড্যামেজ ভারতীয় নাবিকেরা

রাজনীতির যৌনকরণ: ভারতে মুসলিম নারীদের লক্ষ্যবস্তু করতে যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এআই

বিজেপিতে না গিয়ে কেন ‘অস্তিত্বহীন’ দলে ভিড়ছেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা

ব্রেক্সিটের বর্ষপূর্তিতে ইইউতে ফেরার দাবি জোরদার, তবে পথ কতটা কঠিন

মার্কিন হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর পর ট্রাম্প-মোদি সম্পর্ক নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে

গাজা গণহত্যা: বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, ইসরায়েলের ৮০ বছরের পরিকল্পনার ফসল