জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে বিশ্বের অনেক দেশে জনসংখ্যা এখন আর বাড়ছে না, বরং স্থায়ীভাবে কমতে শুরু করেছে। জনসংখ্যাবিদদের কাছে এটি মানব ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ বা মহামারির মতো সাময়িক কারণে অতীতে জনসংখ্যা কমেছে। কিন্তু বর্তমানে বহু দেশের জনসংখ্যা কমছে মূলত দীর্ঘমেয়াদি জন্মহার পতনের কারণে।
জাতিসংঘের জনসংখ্যাসংক্রান্ত হিসাব ও মধ্যমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৬৪টি দেশ ও ভূখণ্ড তাদের সর্বোচ্চ জনসংখ্যার পর্যায় অতিক্রম করেছে। এসব দেশের অধিকাংশই ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায়। গত কয়েক দশকে এসব অঞ্চলে প্রজনন হার দ্রুত কমেছে এবং অনেক দেশেই তা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে রয়েছে। পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশে ব্যাপক অভিবাসনও জনসংখ্যা কমার গতি বাড়িয়েছে।
তবে শুধু ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়াই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়ের মতো দেশও এই তালিকায় রয়েছে। থাইল্যান্ডে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতেই নারীপ্রতি সন্তান জন্মের হার দুইয়ের নিচে নেমে যায়; বর্তমানে তা ১ দশমিক ২-এরও কম। উরুগুয়েতেও জন্মহার কমে নারীপ্রতি গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৪ সন্তানে দাঁড়িয়েছে।
কিছু দেশ অবশ্য খুব সম্প্রতি তাদের জনসংখ্যার সর্বোচ্চ পর্যায় অতিক্রম করেছে। আবার জাপান ও ইতালির মতো দেশ এক দশকের বেশি আগে এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত কিছু দেশের জনসংখ্যা কমার মাত্রা হবে অত্যন্ত বড়। দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের জনসংখ্যা অর্ধেকের বেশি কমে যেতে পারে। ইতালির জনসংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি এবং স্পেন ও থাইল্যান্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমতে পারে।
মধ্য শতাব্দীতে আরও অনেক দেশ শীর্ষ জনসংখ্যা অতিক্রম করবে
আগামী কয়েক দশকে আরও বহু দেশ এই তালিকায় যুক্ত হবে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০-এর দশকে দক্ষিণ আমেরিকার বড় অংশের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করতে পারে। ২০৬০-এর দশকে দক্ষিণ এশিয়ারও বড় অংশ একই পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। এর মধ্যে থাকবে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতও।
তবে এসব পূর্বাভাস পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কারণ, ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা নির্ভর করে জন্মহার, মানুষের গড় আয়ু ও অভিবাসন—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। আগামী ৫০ বছরে এই তিন বিষয়ে কী পরিবর্তন হবে, তা নির্ভুলভাবে বলা কঠিন।
বিশেষ করে, অভিবাসন অনেক দেশের জনসংখ্যার চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে পারে। উচ্চ আয়ের অনেক দেশে বর্তমানে অভিবাসন না থাকলে জনসংখ্যা কমে যেত। যুক্তরাষ্ট্র এর অন্যতম বড় উদাহরণ। জাতিসংঘের বর্তমান পূর্বাভাসে দেশটির জনসংখ্যা শতাব্দীর শেষ নাগাদও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে না—কারণ ধরে নেওয়া হয়েছে—দেশটিতে অভিবাসন অব্যাহত ধারায় চলবে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে যদি অভিবাসন একেবারেই না থাকে, তাহলে দেশটির জনসংখ্যা শিগগির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ২১০০ সালের মধ্যে বর্তমান অভিবাসন-নির্ভর পূর্বাভাসের তুলনায় দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি কম হতে পারে।
অর্থাৎ, সব দেশের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা কমার সময় নির্ধারণ এক নয়। জন্মহার, আয়ু ও অভিবাসনের পরিবর্তনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের চিত্র। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু দেশে জন্মহার অত্যন্ত নিচে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি বদলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্ব তাই এমন এক নতুন জনমিতিক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং জনসংখ্যা হ্রাস, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংকুচিত হওয়া হবে বহু দেশের প্রধান বাস্তবতা।