হোম > বিশ্লেষণ

বিজেপির প্রভাব: পশ্চিমবঙ্গে নিশ্চিহ্ন হচ্ছে গরুর মাংসের দোকান, বদলাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

কলকাতার ট্যাংরায় সেই কসাইখানা। ছবি: আল জাজিরা

কর্মব্যস্ত এক দুপুর। দুপুর ১২টা। কলকাতার ট্যাংরা এলাকার শহরের একমাত্র গরু-মহিষ জবাইখানার গলিটিতে কোনো লোকের আনাগোনা নেই। শহরের পৌর করপোরেশনের পরিচালনাধীন ঔপনিবেশিক আমলের ভবনটি দেখতে অনেকটা দুর্গের মতো। বিশাল লোহার ফটক ভেতর থেকে বন্ধ।

ফটকের ছোট ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, বিশাল খালি চত্বরে স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন ছেলে দৌড়াদৌড়ি ও খেলাধুলা করছে। কসাইখানার ঠিক বিপরীতে থাকা রাস্তার পাশের একটি খাবারের দোকানের ম্যানেজার মোহাম্মদ মেহমুদ আলম বলেন, ‘মে মাসে কসাইখানাটি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ওই ছেলেরা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে খেলছে।’ মেহমুদের দোকানে মূলত দিনমজুর, ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকেরা খেতে আসেন।

এই নির্জন পরিবেশের সঙ্গে এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি তিনি। মেহমুদ বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এই (বিজেপি) সরকার খুব তাড়াতাড়ি এটি আবার খুলতে দেবে।’

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে গরু ও অন্যান্য গবাদিপশু জবাই নিয়ে একটি নির্দেশনা জারি করে। এর মাত্র চার দিন আগে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হয়। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে টিএমসি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপির বিরোধী দল।

সরকারি ওই নোটিশে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়। এতে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে জবাইয়ের উপযোগী হিসেবে সনদ না পাওয়া পর্যন্ত গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির মহিষ জবাই করা যাবে না। কোনো প্রাণীকে জবাইয়ের জন্য উপযুক্ত ঘোষণা করে সনদ দেওয়া যাবে কেবল তখনই, যখন তার বয়স ১৪ বছরের বেশি, অথবা সেটি কাজ বা প্রজননের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। বয়স, আঘাত, শারীরিক ত্রুটি কিংবা এমন কোনো দুরারোগ্য রোগের কারণে প্রাণীটি যদি স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে, তাহলেও সনদ দেওয়া যেতে পারে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, সনদ পাওয়া প্রাণী কেবল কোনো পৌরসভা পরিচালিত বা স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত কসাইখানায় জবাই করা যাবে। খোলা জনসমক্ষে পশু জবাইও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বিক্রি কমেছে, মেনু থেকে বাদ গরুর মাংসের স্টু

মে মাসে ঈদ সামনে রেখে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। দ্রুতই এর প্রভাব দেখা যায়। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও বাজারে গরুর মাংসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। তবে ঈদ শেষ হওয়ার পরও সেই সংকট কাটেনি। তিন মাসেরও বেশি সময় পরেও গরুর মাংসের সরবরাহ কম। অথচ পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে গরুর মাংস বেশ জনপ্রিয়।

এর কারণ শুধু জবাইয়ের সনদ পাওয়া নয়। নির্দিষ্ট কোনো প্রাণী জবাইয়ের শর্ত পূরণ করেছে, সেটি প্রমাণ করার সনদ ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের দেখাতে হয়। কিন্তু কলকাতায় গরুর মাংসের ব্যবসা আটকে দেওয়ার এটিই একমাত্র বাধা নয়।

সব মাংস সরবরাহকারীকেই ব্যবসা পরিচালনার জন্য লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু এসব লাইসেন্স নবায়নের কাজও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। জুন মাসে কলকাতা পৌর করপোরেশন ভেঙে দেওয়ার পর লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম কার্যত ঝুলে আছে। এর আগে মেয়র ফিরহাদ হাকিম পদত্যাগ করেন। কলকাতার পরবর্তী পৌর নির্বাচন ডিসেম্বর মাসে হওয়ার কথা।

মেহমুদ আলমের পাশে বসে থাকা তাঁর বন্ধু মুশতাকও ক্ষতিগ্রস্ত মাংস ব্যবসায়ীদের একজন। তাঁর ব্যবসার লাইসেন্সের বার্ষিক নবায়নের সময় হয়েছে। মুশতাক তিক্ত হাসি দিয়ে বলেন, কলকাতার বাসিন্দা তাঁর পরিবারের আগের ছয় প্রজন্মের কেউ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। তাঁরা সবাই গরুর মাংস সরবরাহের ব্যবসা করতেন। অতীতের কোনো সরকারের সময়ই তাঁদের এমন সমস্যায় পড়তে হয়নি।

ট্যাংরায় কসাইখানার বিপরীতে খাবারের দোকানে রান্না হচ্ছে গরুর মাংস। ছবি: আল জাজিরা

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের কারণে লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু কবে নবায়ন হবে, সে বিষয়ে আমাদের কিছুই বলা হয়নি। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে আমি এক পয়সাও আয় করতে পারিনি।’

খাবারের দোকানটির প্রবেশমুখের কাছে একটি বড় কড়াইয়ে গরুর মাংসের ভুনা হচ্ছে। দোকানের ঠিক বাইরে ছোট আরেকটি কড়াইয়ে ফুটন্ত ঝোলে মাছের টুকরো রান্না হচ্ছে। মেহমুদ জানালেন, ‘ভালো’ সময়ে দুই কড়াইয়েই গরুর মাংস রান্না হতো। তিনি বলেন, ‘এখন আমরা শুধু ভুনা বিক্রি করি। আগে চাপ ও স্টু বানাতাম। কিন্তু এগুলোর জন্য ভালো মানের গরুর মাংস দরকার। গত কয়েক মাস ধরে যে ধরনের মাংস পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে এগুলো বানানো যায় না।’

সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। এখন এক প্লেট গরুর মাংস ভুনার দাম ১২০ রুপি (১ দশমিক ২৫ ডলার)। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে এর দাম ছিল ১০০ রুপি (১ দশমিক ৪ ডলার)। কলকাতায় এখন এক কেজি গরুর মাংস কিনতে ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপি (৩ দশমিক ৬৬ থেকে ৫ দশমিক ২২ ডলার) লাগে। মে মাসের আগে দাম ছিল ২০০ থেকে ২৫০ রুপির মধ্যে।

তবে দাম বাড়লেও বিক্রি কমেছে। মেহমুদ বলেন, ‘বিক্রি অন্তত ৫০ শতাংশ কমে গেছে।’ এর কারণ—তাঁর কাছে বিক্রির জন্য আগের মতো মাংস নেই। একই সঙ্গে মাংসের মান নিয়েও তিনি আগের মতো নিশ্চিত হতে পারছেন না। এর পাশাপাশি বিজেপি সরকারের অধীনে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেতে দেখা যাওয়ার বিষয়েও অনেক ক্রেতা এখন ভয় পাচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন।

মেহমুদ আলম বলেন, তিনি একদল তরুণকে খুব মিস করেন। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন হিন্দু। তাঁরা নিয়মিত তাঁর দোকানে এসে গরুর মাংসের স্টু খেতেন। তিনি বলেন, ‘বাড়িতেও আমরা প্রায় গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।’ কথার শেষ দিকে তাঁর কণ্ঠ আরও ক্ষীণ হয়ে আসে। তিনি বলেন, ‘হয়তো সপ্তাহে একবার খাই। আগে প্রায় পাঁচ থেকে ছয়বার খেতাম। এখন শুধু সবজি আর সস্তা মাছ খাচ্ছি। হয়তো মুরগিও। খাসির মাংস কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই।’

বাংলায় গরুর মাংস খাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস

পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের গরুর মাংস খাওয়ার অন্যতম প্রধান রাজ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের গ্রামীণ পরিবারের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শহুরে পরিবারের ৭ দশমিক ৯ শতাংশ জানিয়েছে—তারা গরু বা মহিষের মাংস খায়।

ভারতের প্রেক্ষাপটে, যেখানে অনেক হিন্দুর কাছে গরু পবিত্র প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস খাওয়ার হার দেশের অন্যতম বেশি। প্রতিবেশী আসাম এবং দক্ষিণ ভারতের কেরালাতেও গরুর মাংস খাওয়ার হার বেশি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গরুর মাংস খান। পশ্চিমবঙ্গের খ্রিস্টান, বিভিন্ন দলিত সম্প্রদায়ের একটি অংশ এবং কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসেরও অংশ গরুর মাংস।

কোনো প্রাণী জবাইয়ের আগে যে শর্তগুলো পূরণ করতে হবে, সেই আইন নতুন নয়। তবে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরই আইনটির প্রয়োগ কঠোর হয়েছে। সরকারিভাবে ট্যাংরার কসাইখানাটিও বন্ধ হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কসাইখানার সীমানার দেয়ালের পাশে থাকা ছোট সবুজ দরজাটি খুলে বাইরে উঁকি দেন। কে দরজায় কড়া নাড়ছে, তা দেখে তিনি বলেন, ‘পরে আসুন। আজ প্রধান কর্মকর্তা অফিসে নেই।’

এই সময় অফিসে তিনি কী করেন, জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা শুধু আসি, কয়েক ঘণ্টা থাকি, তারপর বাড়ি চলে যাই।’ ব্যবসা কবে স্বাভাবিক হবে, কিংবা আদৌ হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই বলেও তিনি জানান।

সংকটের আশঙ্কায় আগেই ব্যবসা বন্ধ করেছিলেন কেউ কেউ

কলকাতার ব্যবসায়ী আলফাজ লায়েকের মতো কেউ কেউ অবশ্য আগেই এই সংকটের আশঙ্কা করেছিলেন। এপ্রিল মাসে যখন পশ্চিমবঙ্গে সেই নির্বাচন চলছিল—যে নির্বাচনের পর বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসে—তখন মধ্য পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় নিজের দুগ্ধ ব্যবসা বন্ধ করে দেন লায়েক।

তিনি সাধারণত বয়স্ক গরুগুলো কসাই ও মাংস সরবরাহকারীদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেন। লায়েক বলেন, ‘আমি যদি একটি গরু ১০০ টাকায় কিনে থাকি, তাহলে সেটি ৩০ টাকায় বিক্রি করেছি। সাধারণত যে দামে বিক্রি করা হয়, তার চেয়ে এটি অনেক কম।’ তবে তাঁর মতে, ‘বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু ব্যবসায়ীদের যে ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে, সেই ঝামেলা মোকাবিলা করার চেয়ে এটাই ভালো।’ তিনি বলেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গবাদিপশু ব্যবসায়ীদের ওপর এই হয়রানি শুরু হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে মেনু থেকে বাদ পড়ছে গরুর মাংস, বাড়ছে অনিশ্চয়তা

লায়েক আশঙ্কা করছেন, বাংলার মানুষের খাদ্যতালিকায় গরুর মাংস একসময় অতীতের বিষয় হয়ে যেতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে এটি এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। লায়েক বলেন, ‘আমি এমন একজন মানুষ, যে আগে সকালের নাশতাতেও গরুর মাংস খেতাম। কিন্তু এখন আমি পুরোপুরি গরুর মাংস আনা বন্ধ করে দিয়েছি। পশ্চিমবঙ্গে এখন গরুর মাংস বহন করা মাদক বহনের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে গেছে।’

অতীতে বিজেপি সরকারগুলো ভারতের কয়েকটি রাজ্যে গরুর মাংস খাওয়ার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ চালু করেছে বা সেগুলো কার্যকর করেছে। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, ছত্তিশগড় ও কর্ণাটকে গবাদিপশু জবাই নিয়ন্ত্রণে আইন রয়েছে। রাজস্থান, গুজরাট, হরিয়ানা ও উত্তরাখণ্ডে গরুর মাংস বা গরুর মাংসজাত পণ্য বিক্রি সরাসরি নিষিদ্ধ। মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে বেআইনিভাবে জবাই করা গবাদিপশুর মাংস রাখা নিষিদ্ধ। মহারাষ্ট্রে গরু, ষাঁড় ও বলদ জবাই এবং এসব প্রাণীর মাংস রাখা নিষিদ্ধ। আর কর্ণাটকে মূলত গবাদিপশু জবাই এবং জবাইয়ের উদ্দেশ্যে গবাদিপশু বিক্রি বা পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এখন পশ্চিমবঙ্গে লায়েক ছাগল কেনাবেচা, কৃষিকাজ এবং নিজের কৃষিজমি ইজারা দিয়ে আয় করার দিকে চলে গেছেন।

গরুর মাংস ছাড়া মেনু

মুসলিম অধ্যুষিত কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় সারি সারি গরুর মাংসের দোকানের মালিকরা নিয়মিত ক্রেতা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে নিজেদের ব্যবসা নিয়ে কথা বলতে রাজি নন। এমন পাঁচটি গরুর মাংসের দোকানের মালিক ও ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, মে মাসের পর থেকে তাদের ব্যবসায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোকসান হয়েছে।

এক ব্যবস্থাপক বলেন, ‘এই সারির সব দোকানই প্রথম দুই মাস বন্ধ ছিল। গত এক মাস থেকে দেড় মাসের মধ্যে আমরা কেবল সেগুলো আবার খুলতে পেরেছি।’ আরেক দোকানদার বলেন, ‘সরবরাহ নিয়মিত নয়, দাম বেড়ে গেছে। ফলে বিক্রিও ভালো হচ্ছে না। আর সত্যি বলতে, মাংসের মানও বদলে গেছে। একেবারেই ভালো সময় যাচ্ছে না।’

গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর বিধিনিষেধ আরও কঠোর হওয়া এবং সরবরাহ করা মাংসের মান কমে যাওয়ার মধ্যে গত তিন মাসে কলকাতার অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ জানিয়েছে, তারা তাদের মেনু থেকে গরুর মাংসের পদ বাদ দিয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী জমজম রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁটির তিনটি শাখার পরিচালক শাদমান ফায়েজ বলেন, তারা খাবারের মানের সঙ্গে আপস করতে চাননি। তাই শহরের তিনটি শাখার মেনু থেকেই সব গরুর মাংসের পদ বাদ দিতে হয়েছে। ফায়েজ বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা ক্রেতা হারিয়েছি এবং এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ লোকসান হচ্ছে। এমনকি আমাদের কর্মীদেরও ছাঁটাই করতে হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই। আশা করি, মানুষ আমাদের অন্য খাবারগুলোও একইভাবে পছন্দ করবে।’

এর কাছেই বাণিজ্যিক এলাকা পার্ক স্ট্রিটে রয়েছে ১৯৪৭ সাল থেকে কলকাতার অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান অলিপাব। কয়েক দশক ধরে গরুর মাংসের স্টেকের জন্য বিখ্যাত এই রেস্তোরাঁ। তবে এখন সবসময় সেখানে সেই স্টেক পাওয়া যাচ্ছে না। না প্রকাশ না করার শর্তে অলিপাবের ব্যবস্থাপনার পর্ষদের এক সদস্য বলেন, ‘আমরা এটি আমাদের মেনু থেকে বাদ দিইনি। কিন্তু এখন আর নিয়মিত গরুর মাংসের সরবরাহ নেই। তাই যখন গরুর মাংস পাওয়া যায়, তখনই এটি পাওয়া যায়। কলকাতায় এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতি হয়নি।’

আল জাজিরা কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (কেএমসি) কমিশনার ও প্রশাসনিক প্রধান স্মিতা পান্ডের কাছে জানতে চেয়েছিল, ট্যাংরা কসাইখানা কবে আবার চালু হবে এবং গরুর মাংস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়ন কবে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অ্যানিম্যাল রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত।’

তবে রাজ্যের অ্যানিম্যাল রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের অধীনে প্রাণিসম্পদ পালন ও ভেটেরিনারি সার্ভিসের পরিচালক নিখিল কুমার শিট বলেন, পান্ডের নেতৃত্বাধীন কেএমসিই কসাইখানা ও লাইসেন্সের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, ‘ট্যাংরা কসাইখানা কিছুদিন ধরে চালু নেই, এ বিষয়টি আমি জানি না। সাধারণত ফিটনেস সার্টিফিকেট কেএমসি এবং কেএমসিতে কর্মরত এক ভেটেরিনারি কর্মকর্তা দিয়ে থাকে। এর বাইরে আর কিছু সম্পর্কে আমি সত্যিই অবগত নই।’

রাজ্যের অন্য এলাকাতেও অনিশ্চয়তা

পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা রাজ্যের অন্য এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে। কলকাতার সীমানার ঠিক বাইরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বারুইপুর শহরে মে মাস থেকে স্থানীয় বাজারে সকাল ১১টার মধ্যেই গরুর মাংস শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বারুইপুরের বাসিন্দা সায়েদ সাইফুল্লাহ কলকাতার একটি সেলুনে হেয়ারড্রেসার হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো দিন একেবারেই গরুর মাংস থাকে না।’ সাইফুল্লাহ বলেন, মে মাস পর্যন্ত গরুর মাংসই ছিল এমন একটি মাংস, যার দাম খুব বেশি ওঠানামা করত না। মাছ ও খাসির মাংসের দাম বাড়লেও গরুর মাংসের দাম তুলনামূলক স্থির থাকত। এখন সেই পরিস্থিতিও বদলে গেছে। গরুর মাংসের দামও অনেক বেড়েছে।

তিনি নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা সারা জীবন প্রায় প্রতিদিনই গরুর মাংস খেয়েছি। এখন সেটা সপ্তাহে এক বা দুইবারে নেমে এসেছে।’

এই সমঝোতা করার পরও পরিবারের সাপ্তাহিক খাবারের খরচ ২০ শতাংশ বেড়েছে। মে মাসের আগে যেখানে সপ্তাহে ৫ হাজার রুপি খরচ হতো, এখন সেখানে ৭ হাজার রুপি খরচ হচ্ছে। তিনি প্রশ্নের সুরে বলেন, ‘আমাদের আয়ও তো একইভাবে বাড়ছে না, তাই না?’

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা মালদায় জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মুসলিম। জেলার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন গরুর মাংস শুধু গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি এমন কাউকে চেনেন, যার একটি গরু আছে, তাহলে তাঁর কাছে কিছু গরুর মাংস দেওয়ার জন্য বলতে পারেন। এরপর তাঁরা গভীর রাতে গরুটি জবাই করে এবং আপনার বাড়ির দরজায় এসে গরুর মাংস দিয়ে যায়।’

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মালদায় গরুর মাংসের সঙ্গে লেনদেনের সময় ধরা পড়ার ভয় স্পষ্টভাবে মানুষের মধ্যে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘কিন্তু দরিদ্র মুসলমানের জন্য এই মাংস ছেড়ে দেওয়া সহজ নয়। তাই এখন তারা এটি খাওয়া চালিয়ে যেতে নিজেদের নিরাপত্তা ও জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’