হোম > বিশ্লেষণ

মার্কিন এআই ‘ক্লদ’ দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজে নজর রাখছে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন উভচর যুদ্ধজাহাজ এলএইচএ-৭। ছবি: ইউএস নেভি

মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক স্বীকার করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে এবং সেগুলোর দুর্বলতা খুঁজে বের করতে তাদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ‘ক্লদ’ ব্যবহার করেছে ইরান।

অ্যানথ্রোপিকের সাম্প্রতিক একটি হুমকি বিশ্লেষণ প্রতিবেদন প্রকাশের পর এই তথ্য সামনে আসে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ গবেষক জ্যাকব কক্সনের পদত্যাগ এবং আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে এআই শিল্পের নজিরবিহীন রাজনৈতিক অর্থায়নের তথ্য উন্মোচিত হওয়ায় এআই নিরাপত্তা, সামরিক অপব্যবহার এবং করপোরেট স্বার্থ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে নিশানা ও সাইবার নজরদারি

অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদন এবং মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান-সংশ্লিষ্ট একটি সাইবার চক্র ‘ক্লদ’ মডেলটি ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর অবস্থান, গতিবিধি এবং রণতরীগুলোর নিরাপত্তাজনিত গলদ অনুসন্ধানে একটি পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা নির্দেশিকা তৈরি করার চেষ্টা চালিয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা নির্দিষ্ট বিষয়গুলো হলো:

জনসমক্ষে থাকা তথ্য বিশ্লেষণ: এআই মডেল ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক কর্মীদের সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছবি বিশ্লেষণ করা হয় এবং সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পরিচয় ও তথ্য শনাক্ত করা হয়।

ট্রান্সপন্ডার ও স্যাটেলাইট ডেটা: বাণিজ্যিক কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) ছবি, সামরিক বিমান ও যুদ্ধজাহাজের ট্রান্সপন্ডার কোড এবং রণতরীর চলাচলের সংবেদনশীল তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়।

প্রযুক্তিগত সিস্টেমের দুর্বলতা অনুসন্ধান: মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ব্যবহৃত সিসকো যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামুদ্রিক স্যাটেলাইট টার্মিনাল এবং শিল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নিরাপত্তাজনিত ফাঁকফোকর খুঁজে বের করতে এআই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হয়।

অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, তাদের নিরাপত্তা অ্যালগরিদম অনেকগুলো অনৈতিক অনুরোধ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হলেও কিছু সংবেদনশীল তথ্য বের করে নিতে সক্ষম হয় দুষ্কৃতকারীরা। ঘটনাটি জানার পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেওয়া হলেও, এই সংগৃহীত তথ্য কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্বজুড়ে শত্রুপক্ষ ও মারণাস্ত্রের নকশায় এআই

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, কেবল ইরানই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মার্কিন-বিরোধী সামরিক গোষ্ঠী, অস্ত্র গবেষক ও গোয়েন্দা চক্র ক্লদ মডেলটির অপব্যবহারের চেষ্টা করেছে:

ইয়েমেনের রকেট ও হাইপারসনিক প্রযুক্তি: উত্তর ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র দল ২ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেটের গাইডেন্স সফটওয়্যার তৈরিতে এআই-এর সাহায্য নেয়। এমনকি তারা একটি ‘হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল’ সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা নিয়েও গবেষণা চালায়। অ্যানথ্রোপিক উল্লেখ করেছে, ‘আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাদের বহু অনুরোধ আটকে দিয়েছিল, তবে সব অনুরোধ আটকানো সম্ভব হয়নি।’ এই সশস্ত্র দলটিকে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হুতি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

চীনের অ্যান্টি-টর্পেডো গবেষণা: চীনের একটি চক্র চীনা নৌবাহিনীর ব্যবহারের জন্য একটি অ্যান্টি-টর্পেডো ব্যবস্থার ওপর ২০০ পৃষ্ঠার এক বিস্তারিত প্রযুক্তিগত প্রস্তাবনা তৈরি করতে ‘ক্লদ’ ব্যবহার করে।

রাশিয়ার ড্রোন ঝাঁক: রাশিয়ার সামরিক গবেষকেরা স্বনিয়ন্ত্রিত ড্রোনের ঝাঁক তৈরির প্রযুক্তিতে এআই-এর সহায়তা নিয়েছে।

ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নজরদারি: তিব্বতি, উইঘুর, তাইওয়ানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক ধর্মীয় নেতাদের ওপর গোপন নজরদারির জন্য ক্ষতিকর সাইবার সরঞ্জাম ও নজরদারি ব্যবস্থা তৈরিতে এআই প্রযুক্তি অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া

সুরক্ষা ব্যবস্থার এই মারাত্মক ঘাটতি সামনে আসার পরই অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআই-এর গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করেছেন। তিন বছর ধরে প্রি-ট্রেনিং গবেষণায় নিয়োজিত থাকা কক্সন তাঁর পদত্যাগপত্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লাগামহীন দৌড় নিয়ে গুরুতর বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।

কক্সন লিখেছেন, ‘অ্যানথ্রোপিক বা ওপেনএআই—কোনো প্রতিষ্ঠানই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে না। তারা নিয়ন্ত্রণহীন “সুপারইন্টেলিজেন্স” (পরম-বুদ্ধিমত্তা) তৈরির উন্মাদ প্রতিযোগিতায় মেতে মানবজাতির জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে।’

তিনি আরও জানান, এআই শিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে আশঙ্কা করছেন যে, অতিরিক্ত উন্নত এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে যেতে পারে, সংকটপূর্ণ সাইবার সিস্টেমে হ্যাক করতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজস্ব ক্ষমতা ও সম্পদ দখল করতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি অবিশ্বাস ও অনাস্থার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা নীতি উপেক্ষা করে সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যা তিনি একটি ‘অহংকারী জুয়া’ হিসেবে আখ্যা দেন। কক্সন সাময়িকভাবে এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করেছেন।

আলাস্কা সংকট

অ্যানথ্রোপিকের প্রযুক্তিগত সুরক্ষার এই সংকটের সময়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের ২০২৬ সালের গভর্নর নির্বাচনে এআই খাতের নজিরবিহীন রাজনৈতিক অর্থায়নের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।

নির্বাচনী অর্থায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ডেমোক্র্যাট সমর্থিত গভর্নর পদপ্রার্থী জোনাথন ক্রেইস-টম্পকিনসের প্রচার তহবিলে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে অ্যানথ্রোপিকের মাত্র ছয়জন কর্মী সম্মিলিতভাবে ৩ লাখ ৭২ হাজার মার্কিন ডলার দান করেছেন।

এর মধ্যে কেবল অ্যানথ্রোপিকের কর্মী ড্রেক থমাস একাই ১ লাখ ডলার দান করেন। অন্য বড় দাতাদের মধ্যে রয়েছেন ড্যানিয়েল জিগলার, ইয়ান লাইকে, স্টিভেন বিলস এবং ইভান হুবিঙ্গার।

সান ফ্রান্সিসকো স্ট্যান্ডার্ড-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই শিল্প খাত থেকে ক্রেইস-টম্পকিনসের তহবিলে এ পর্যন্ত মোট ৫ লাখ ২১ হাজার ৮১২ ডলার এসেছে, যা তাঁর সংগৃহীত মোট ১ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন তহবিলের প্রায় ২৮ শতাংশেরও বেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন এআই গবেষণা ও সুরক্ষা সংস্থা থেকে আরও ২ লাখ ৭৩ হাজার ডলার এবং এআই নীতি সংক্রান্ত থিংক-ট্যাংক থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৬৫ ডলার এসেছে। একটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি শিল্প খাত থেকে এত বড় অঙ্কের অর্থ আসা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।

ডেটা সেন্টারে নিষেধাজ্ঞা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের সংশয়

বিতর্ক আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে গভর্নর পদপ্রার্থী ক্রেইস-টম্পকিনসের একটি সাম্প্রতিক নীতিগত প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আলাস্কা রাজ্য আইনসভা একটি পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি না করা পর্যন্ত রাজ্যে নতুন কোনো এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের ওপর তাৎক্ষণিক সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে।

সমালোচক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন, এই প্রস্তাবের পেছনে অ্যানথ্রোপিক বা তাদের প্রভাবশালী দাতাদের কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা রয়েছে কি না। কারণ:

১. নতুন প্রতিযোগীদের বাধা প্রদান: আলাস্কায় ডেটা সেন্টার নির্মাণে ঢালাও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে নতুন এআই স্টার্টআপ বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামোগত সুবিধা পাবে না, যা অ্যানথ্রোপিক বা অন্য প্রতিষ্ঠিত জায়ান্টদের বাজারের একক প্রাধান্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

২. স্থানীয় বিদ্যুৎ ও মেগা প্রজেক্টের ভবিষ্যৎ: এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আলাস্কার ‘নর্থ স্লোপ’ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম প্রস্তাবিত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি স্বাধীন এআই সেন্টার প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়বে।

৩. মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রজেক্ট: মার্কিন বিমানবাহিনী তাদের জয়েন্ট বেস এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসন, ইলসন এয়ার ফোর্স বেস এবং ক্লিয়ার স্পেস ফোর্স স্টেশনে অন্তত ১২টি এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, রাজ্য সরকারের এমন ঢালাও নিষেধাজ্ঞায় তা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশ সুরক্ষায় ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ বা পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে সব ধরনের নতুন ডেটা সেন্টারের ওপর একচেটিয়া নিষেধাজ্ঞা জারির এই প্রস্তাব মূলত বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার কৌশল হতে পারে।