হোম > বিশ্লেষণ

ট্রাম্পকে ‘শায়েস্তা’ করতে চায় ইরান, নিয়েছে যে কৌশল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য পরবর্তী কয়েকটি সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর (মিডটার্ম ইলেকশন) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানির চড়া দামের বিষয়ে কম সংবেদনশীল থাকবেন—এমনটা অনুমান করে, তেহরান এখন হরমুজ প্রণালিতে হামলা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সর্বোচ্চ চাপ বা ক্ষতি তৈরি করতে তড়িঘড়ি চেষ্টা করছে। এমনটাই মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা ইরানি কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টকে দুই ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান সরকার ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপর জোর দিচ্ছে এবং ট্রাম্পের ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য এই নির্বাচনের আগের সময়টুকুকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। সব কর্মকর্তা ও কূটনীতিকই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

এক আরব কূটনীতিক এবং এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেছেন, কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তার লক্ষ্য হলো মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পকে ‘শাস্তি দেওয়া’, বা শায়েস্তা করা। ঠিক যেভাবে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে ইরানে আমেরিকান জিম্মি সংকট প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের ১৯৮০ সালের পুনঃনির্বাচন অভিযানকে ব্যাহত করেছিল। আরব কূটনীতিক বলেন, ‘তারা (ইরানিরা) এটা নিয়ে ভীষণ মগ্ন। তারা মনে করে, তারা একজনকে প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে দুর্বল করতে পারবে।’

এর পরিণতি হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে সহিংসতার ব্যাপক বেড়েছে। সরু এই জলপথ দিয়ে সমুদ্রিক জলযানের যাতায়াত বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র যখন বিভিন্ন অভিযান শুরু করে, ঠিক তখন ইরানও জাহাজ চলাচলের ওপর হামলার হার বাড়িয়ে দেয়, যা যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর পর আর দেখা যায়নি।

এক পশ্চিমা কর্মকর্তা এবং পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক সূত্রের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রতিদিন বড় আকারের অভিযান পরিচালনা করছে। তারা যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের বহুস্তরীয় সুরক্ষার মাধ্যমে সরু প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পথ দেখিয়ে নিরাপদে পার করে দিচ্ছে। ওই কর্মকর্তার মতে, সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি হামলার গড় সংখ্যা ছিল সপ্তাহে প্রায় ৩০টি। যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের তথ্য অনুসারে, চলতি মাসে এ পর্যন্ত ইরান ২০টিরও বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে একটি জাহাজ ডুবে গিয়েছে।

হামলার এই বৃদ্ধি সত্ত্বেও, পারস্য উপসাগর থেকে খনিজ তেল রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছে। গ্লোবাল অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে। গত এক মাসে বেশ কয়েকদিন দৈনিক অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সংখ্যা যুদ্ধপূর্ব গড়ের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।

কেপলার-এর মধ্যপ্রাচ্য জ্বালানি বিভাগের প্রধান আমেনা বকর বলেন, জাহাজ চলাচলের ‘খরচ ও ঝুঁকি’ যেমন উচ্চ রয়েছে, ঠিক তেমনি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামও চড়া থাকবে। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে গেছে বলে মনে করা উচিত হবে না।’ তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ‘ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি’র কারণে বর্তমানে প্রতি ব্যারেল তেলের দামে অতিরিক্ত ৩০ ডলার যুক্ত হচ্ছে।

ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্প্রসারিত অভিযানকে ‘চোরাচালান’ বলে বর্ণনা করেছেন। কট্টরপন্থী সংবাদপত্র কায়হানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি এমপি ফাদা হোসেইন মালেকি বলেছেন, এই ধরনের নৌ-চলাচল প্রণালির পরিস্থিতিকে ‘খুব জটিল’ করে তুলেছে। ফাদা বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক জলপথ, যা আমাদের ভূখণ্ড ও সীমানা, তা দৃঢ়তার সঙ্গে রক্ষা করতে ইরান বাধ্য।’

ইরানি গণমাধ্যমে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের টকশোগুলোতে আকাশচুম্বী জ্বালানির দাম ট্র্যাক করা হচ্ছে এবং রিপাবলিকানদের পরাজয় ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ অর্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে কীভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদে প্রতিদিন ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিংয়ের পরিবর্তন আপডেট করা হচ্ছে।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মহসিন রেজাই সরকার পরিচালিত প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালির অভিযান নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, ইরান প্রতি রাতে ‘পাঁচ বা ছয়টি’ জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এর জবাব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ওমানের উপকূলীয় পানিতে সক্রিয় কিছু দুষ্কৃতকারীকে ভাড়া করে ট্রাম্প এখন চোরাচালানের পথ বেছে নিয়েছেন।’

আবারও পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হলে, ইরান ইতিমধ্যে যেসব স্থানে আঘাত করেছে তার বাইরেও অঞ্চলের অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলা চালানোর হুমকি দেন রেজাই। তিনি বলেন, ‘অনেক সাবমেরিন ক্যাবল, ডাটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্র, যেগুলো আর্থিক দিক থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সেগুলো আমাদের লক্ষ্যের মধ্যে থাকবে।’

ইরানি গণমাধ্যমের কিছু মতামত ইঙ্গিত দিয়েছে, নভেম্বর নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় ইরানকে লাভবান করবে। কারণ, এটি ট্রাম্পকে কোণঠাসা করবে, তাঁর অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) ঝুঁকি বাড়াবে এবং যুদ্ধ চালানো তাঁর জন্য কঠিন করে তুলবে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্সে গত মাসে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘যিনি যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের দলকে পরাজয়ের কয়েক ধাপ কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন।’ আগস্টে রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার এক টকশোতে অংশ নিয়ে প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানুচেহর মোত্তাকি বলেন, নভেম্বরে ট্রাম্পের যদি ‘বাজে পরিণতি’ হয়, তবে ‘তাঁর মেয়াদের বাকি দুই বছর তাঁকে এক দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে কাটাতে হবে।’

নির্বাচনের হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি, বর্তমানে প্রণালিতে হামলা বাড়িয়ে ইরান যুদ্ধ সমাপ্তির আলোচনায় নিজেদের প্রভাব বা দরকষাকষির ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমা কূটনীতিক। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক আইসোলেশন বা একঘরে পরিস্থিতির মুখে পড়ে, ইরানি নেতৃত্বের ভেতরেই এই উদ্বেগ বাড়ছে যে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীকে বেতন দেওয়ার মতো মৌলিক কাজগুলো করার ক্ষমতাও দেশের থাকবে না।

উভয় পক্ষের ওপর তীব্র চাপ থাকা সত্ত্বেও, ইরানি ও মার্কিন আলোচনার দলগুলো কোনো বড় ধরণের ছাড় দিতে ইচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে না। উভয় পক্ষ শেষবার সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে উচ্চ পর্যায়ে সরাসরি বৈঠকে বসেছিল। আলোচনা সম্পর্কে অবহিত একজন ইরানি কর্মকর্তার মতে, তারা প্রস্তাব বিনিময় করেছিল এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি নেতা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই একটি চুক্তির পক্ষে জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা শুরুতেই পরমাণু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় দেওয়ার দাবিটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ইরান যেমন যুদ্ধ সমাধানের জন্য চাপ দিচ্ছে, তেমনি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের কৌশলটি ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রশাসনের জন্য একটি বার্তা হিসেবেও তৈরি করা হয়েছে। এটি জানিয়েছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রগতিশীল থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির ইরানি গবেষক নিগার মোর্তাজভি।

মোর্তাজভির মতে, ইরানি কর্মকর্তারা এই বার্তা দিতে চাইছেন যে ‘ইরানে আক্রমণ করার সঙ্গে উচ্চ রাজনৈতিক মূল্য জড়িত থাকে, যার মধ্যে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তেহরান শুধু ট্রাম্পকে নিয়ে ভাবছে না। তারা চায় ভবিষ্যতের মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধের কথা চিন্তা করার আগে তাঁর (ট্রাম্পের) সাথে কী ঘটেছিল তা যেন মনে রাখেন।’

কিম জং-উনের মৃত্যুর গুজব কেন বারবার ফিরে আসে

ইয়েমেন সংকট ও হুতিদের উত্থান: সৌদির শত বছরের ভুল নীতি যেভাবে বুমেরাং হলো

সৌদি আরবে কোন কোন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হয়—কেন

কলকাতায় পদদলিত হয়ে ১৯ প্রাণহানি: এ ধরনের দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটে, প্রতিরোধের উপায় কী

তৃতীয় মহাযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব, লক্ষণ স্পষ্ট

দিল্লি যাবেন না, মুম্বাইয়ে বৈঠক করবেন রুবিও, ভারতকে কী বার্তা দিল যুক্তরাষ্ট্র

হুয়াওয়ে যেভাবে চীনের সফট পাওয়ারের হাতিয়ার হয়ে উঠল

বাংলাদেশের মতো সরকার পতনে বিজেপি কেন সতর্ক করছে

ইয়েমেনের তাইজ দখলের লড়াই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বিপুল সামরিক ব্যয় সত্ত্বেও কেন হুতিদের সামনে নাকাল সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র কেন দূরে