হোম > বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ইরানের অন্দরে বিরোধ, কী চান বিরোধীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে ও বিপক্ষে ক্ষমতার অন্দরমহল দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি নিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনড় অবস্থান ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে বিরোধী কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী আরও শক্ত অবস্থান নিতে শুরু করেছে।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তির রাজনৈতিক দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরই তুলনামূলক মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত পেজেশকিয়ান এখন কট্টরপন্থী অংশের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ আবারও শুরু হতে পারে।

পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে, তা ইসরায়েলের সব রাজনৈতিক শিবির থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইসরায়েলের বিভিন্ন পক্ষ মনে করছে, ইরানকে দুর্বল করতে এবং তেহরানের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ জোটকে ভেঙে দিতে সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। এই জোটের মধ্যে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও রয়েছে।

নীতিগত আপত্তির পরও খামেনির অনুমতি

মার্চে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি নিয়ে তাঁর অবস্থান লিখিতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতিতে খামেনির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘নীতিগতভাবে আমার অবস্থান ভিন্ন ছিল।’ বক্তব্যটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে সইয়ের প্রসঙ্গে।

তবে বিবৃতিতে বলা হয়, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ‘স্পষ্টভাবে দায়িত্ব গ্রহণ’ করায় তিনি অনুমোদন দিয়েছেন। খামেনির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আমেরিকান পক্ষ অতিরিক্ত দাবি তুললে ইরান তা মেনে নেবে না। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সামনে সরাসরি আলোচনা শুরু হলেও তা ‘শত্রুপক্ষের অবস্থান মেনে নেওয়ার সমার্থক নয়।’

ইরানি গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে, খামেনি শর্ত দিয়েছিলেন, ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত চার ভাগের তিন ভাগ সদস্যদের, যার মধ্যে সামরিক কমান্ডাররাও থাকবেন এই চুক্তিকে সমর্থন করতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় সব সদস্যই চুক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তবে ভোটাভুটির বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

নিরাপত্তা পরিষদের আশ্বাসের পরও ‘পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনা

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে খামেনিকে আশ্বস্ত করেছে, তারা ‘ইরানি জাতির অধিকার ও প্রতিরোধ ফ্রন্টের’ স্বার্থ রক্ষা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত ইরানি নেতাদের স্মৃতি অক্ষুণ্ন রাখবে। পরিষদ বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘সম্পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়েই আলোচনা এগিয়ে নেবে। একই সঙ্গে চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন হলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পরিকল্পনাও আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই সমঝোতা স্মারককে ‘একটি ঐতিহাসিক দলিল এবং পারস্পরিক সম্মানের ছায়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শক্তিশালী ইরানের বার্তা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘এই নথি এমন একটি জাতির কণ্ঠস্বর, যারা কোনো হুমকি বা চাপের বিনিময়ে নিজেদের মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিক্রি করেনি।’

গালিবাফের নতুন অবস্থান, ‘যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক কমান্ডার’

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ খামেনির ‘দিকনির্দেশনামূলক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বার্তার’ প্রশংসা করেন। তাঁর ভাষ্য, এই সমঝোতা যুদ্ধের সময় অর্জিত অবস্থানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছে, তবে এটি কেবল ‘এক কঠিন ও বন্ধুর পথের শুরু।’

গালিবাফ নিজেকে ‘যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক কমান্ডার’ হিসেবেও তুলে ধরেন এবং আলোচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পাওয়ার বিষয়ে সরাসরি অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ‘আমি এমন কেউ নই যে সিদ্ধান্ত ছাড়া বসে থাকব আর অপেক্ষা করব। আমি চাই, সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপকরণ আমার কাছে প্রস্তুত করা হোক, যাতে আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’

গালিবাফ আরও বলেন, এখন ইরানি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ‘ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী ইউনিটগুলোর কাছ থেকে ট্রেঞ্চের দায়িত্ব গ্রহণ করা, অবস্থান ধরে রাখা এবং জনগণকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করা।’ এমন সময়ে এই বক্তব্য এসেছে, যখন যুদ্ধ ইরানের আগের থেকেই বিদ্যমান কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

কট্টরপন্থীদের চাপ, হরমুজ ইস্যুতে কঠোর অবস্থান

খামেনিপন্থী গোষ্ঠীর দাবি, ইরানি আলোচকদের হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টি আলোচনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদি কোনো চুক্তিতে এই বিষয় অন্তর্ভুক্ত না হয়, তাহলে আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বিভিন্ন শহরে রাষ্ট্র-সমর্থিত যে রাতের সমাবেশগুলো হয়েছে, সেখানে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা হয়েছে।

কট্টরপন্থীদের ধারণা, মধ্যপন্থী এই নেতারাই যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি ছাড় দিতে পারেন। রাজধানীর কাছের শাহর-ই-রেতে রাষ্ট্র-সমর্থিত ধর্মীয় শোকগাথা পাঠক মোহাম্মদ আলী বাখশি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘জনাব প্রেসিডেন্ট, যদি সর্বোচ্চ নেতার শর্ত বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে আপনার গলা থাকবে আমাদের ছুরির সামনে। আমরা আপনার জীবন দুর্বিষহ করে তুলব।’

এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক কর্মকর্তা মেহদি তাবাতাবাই বাখশি এবং অন্যান্য ‘সন্দেহভাজন উপাদানের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর অভিযোগ, তারা ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করছে।

পার্লামেন্ট খোলার দাবি, ‘আমার সর্বোচ্চ নেতা একা’ ও মাশহাদ থেকে যুদ্ধংদেহী বার্তা

কয়েকজন কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য দাবি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর সীমিত কার্যক্রমে থাকা পার্লামেন্ট পুরোপুরি চালু করতে হবে, যাতে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি ঠেকানো যায় যা ইরানের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে পারে। অতিমাত্রায় রক্ষণশীল শহর কোমের প্রতিনিধি মোহাম্মদ মান্নান রাইসি এক্সে লেখেন, ‘ন্যায়বিচার করুন এবং পার্লামেন্ট খুলে দিন। আমার সর্বোচ্চ নেতা একা পড়ে আছেন।’

উত্তর-পূর্ব ইরানের ধর্মীয় নগরী মাশহাদে জুমার নামাজের খতিব এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ আহমদ আলামোলহোদা বলেন, ‘ওয়াশিংটনের সঙ্গে আমাদের লড়াই শেষ হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘৭০ বছর ধরে এই ব্যবস্থা আমাদের ওপর অপরাধ, অবিচার ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। তাহলে কি আমরা পিছু হটব? আমাদের শহীদ ইমামের প্রতিশোধ একজন দুর্নীতিগ্রস্ত, পাপাচারে নিমজ্জিত কুকুরকে হত্যা করে নেওয়া সম্ভব নয়। তারা এমন শত শত কুকুর হত্যা করলেও তা আমাদের শহীদ নেতার একটি চুলের সমানও হবে না।’

এখানে তিনি সাবেক সর্বোচ্চ নেতার প্রতি ইঙ্গিত করেন।

সংবাদপত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যা

শনিবার ইরানে কর্মসপ্তাহের প্রথম দিনে দেশটির সংবাদপত্রগুলো প্রথম পাতাজুড়ে খামেনির বার্তা এবং সমঝোতা স্মারককে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। রক্ষণশীল কিছু দৈনিকের ভাষ্য, সর্বোচ্চ নেতা শর্ত সাপেক্ষে এই চুক্তিকে অনুমোদন দিয়েছেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তির পথে এখনো দীর্ঘ ও কঠিন পথ বাকি।

অন্যদিকে সংস্কারপন্থী সংবাদপত্র এতেমাদ এই সমঝোতা স্মারককে ‘বিজয়ের দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তির এখনো নিশ্চিত না হওয়া বিভিন্ন শর্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে যেভাবে পাল্টে দেবে

দিল্লিকে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধু ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে না দেখার পরামর্শ বেইজিংয়ের

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা: জয়-পরাজয়ের সমীকরণে কার কিস্তিমাত

যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া ইসরায়েল কি আত্মরক্ষা করতে পারবে

ইরান যুদ্ধে যেসব অর্জনের লক্ষ্য জলাঞ্জলি দিলেন ট্রাম্প

যেসব কারণে এবারের ইরান চুক্তি আগের চেয়ে আলাদা

ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের নাম পরিবর্তন: ভারতের ওপর ভরসা কমাচ্ছেন ট্রাম্প?

ট্রাম্পের ইউ-টার্নে নেতানিয়াহুর অজেয় ও গ্রেটার ইসরায়েলের স্বপ্নে ফাটল

আরও শক্তিশালী ইরান, প্রতিদ্বন্দ্বী তেহরানের দিকেই ঝুঁকছে উপসাগরীয় দেশগুলো

৪৭ বছরের বৈরিতা: অবশেষে যেভাবে চুক্তিতে পৌঁছাল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে কারা