হোম > বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের দুই পরাজয় এড়ানোর লড়াই

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধ নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ‘পরপরই’ শেষ হবে। তিনি চলমান এই সংঘাতকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যেন তেহরান নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। গত বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তারা মরিয়া হয়ে নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে।’ কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে এতটাই প্রভাবিত করছে যে, এই নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন করে দিতে পারে।

ইরানের আত্মসমর্পণ নিয়ে ট্রাম্পের দাবিগুলো অবশ্য নতুন নয়। এখন পর্যন্ত তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা মোকাবিলা করে টিকে আছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলা। আগস্টের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপরও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেওয়া হয়।

লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিষয়ক শিক্ষক আলি আলাভি ট্রাম্পের নির্বাচনের পর ইরানের পতন ঘটার পূর্বাভাস সম্পর্কে বলেন, ‘এটি সম্ভবত অভ্যন্তরীণ (দেশীয়) দর্শকদের উদ্দেশে দেওয়া একটি বক্তব্য ছিল।’ তিনি বলেন, ‘এটি ছিল ট্রাম্পের এমনভাবে বার্তা দেওয়ার পদ্ধতি, যাতে বোঝানো যায় যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান নীতি নিয়ে তাকে ব্যর্থ মনে হওয়ার একমাত্র কারণ হলো ইরান চেয়েছিল বিষয়টি সেভাবেই মনে হোক।’

যুদ্ধের ব্যয়

ইরানের আত্মসমর্পণ না করার মূল্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে অনুভূত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। এই নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক পেট্রলের দাম। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে পেট্রলের গড় দাম বেড়ে প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ২৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এক বছর আগের তুলনায় এটি প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি আবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর এপ্রুভাল রেট বা অনুমোদনের হার অর্থাৎ, তাঁর কাজের প্রতি সাধারণ জনগণের সমর্থন ছিল ৪০-এর কোটার শেষাংশে। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৩০-এর কোটার শেষ থেকে মাঝামাঝি পর্যায়ে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের ভোগান্তি শুধু পেট্রলের দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬ সালে লেন্ডিং ট্রির (LendingTree) এক জরিপে দেখা গেছে, এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন বা ‘বাই নাও, পে লেটার’ সুবিধা ব্যবহারকারীদের ২৯ শতাংশ এই ঋণ নিয়ে সাধারণ নিত্যপণ্য কিনেছেন। অন্যদিকে ৪৭ শতাংশ জানিয়েছেন, গত এক বছরে অন্তত একবার তারা এই ধরনের ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে পারেননি।

এ ছাড়া মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদেরা দেখেছেন, ইরানের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের আস্থা এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এটা এমনও হতে পারে যে, দেশটির দ্বিতীয় আরেকটি পরিকল্পনা ছিল। বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা যখন কোনো ফল দিচ্ছে না বলে ইরান বুঝতে পেরেছিল, তখন তারা এতদিন টিকে থাকার পরিকল্পনা করেছিল, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করা যায়।’

সিনেট নেতা চাক শুমারসহ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। ইরানের যুদ্ধ এবং অন্যান্য ইস্যুতে রিপাবলিকানদের সমস্যার কথা বিবেচনায় নিয়ে থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক এইচ. এ. হেলিয়ার বলেছেন, ৩ নভেম্বরের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি এমন যে ডেমোক্র্যাটরা খুব বেশি জয়ের অবস্থানে নেই, বরং রিপাবলিকানরাই হারার অবস্থানে রয়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘প্রশ্নটি আসলে (ভোটার) উপস্থিতির। রিপাবলিকান ঘাঁটির অনেক ভোটার হঠাৎ করে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করা শুরু করবেন, বিষয়টি এমন নয়। বরং তারা ঘরেই থেকে ভোট না দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ হেলিয়ার বলেন, পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত ভোটারদের সিদ্ধান্তে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তবে ‘অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম, যেমন পাম্প থেকে তারা যে পেট্রল কেনেন, সেটার দাম গুরুত্বপূর্ণ। আর এটাই হয়তো (নির্বাচনের ফল) বদলে দিতে পারে।’

সামরিক সাফল্যের দাবি তারা যতই করুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়কেই এমন এক ভোটারের রায়ের মুখোমুখি হতে হবে, যাদের নেতারা সহজ বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে সেই হিসাব হবে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য। আর ইসরায়েলে অক্টোবরের গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য।

তবে ইরানের সামনে এমন কোনো নির্বাচনী সময়সীমা নেই। দেশটি অনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এবং সেখানে পরবর্তী পার্লামেন্ট নির্বাচন ২০২৮ সালের আগে হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল বলেন, ‘ইরানের জন্য বিজয় মানে হলো এতদিন টিকে থাকা, যতদিন পর্যন্ত না তারা তাদের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে একটি গুরুতর কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পারে যে তাদের ওপর আর হামলা করা হবে না।’

তিনি বলেন, ‘বিজয় মানে নিজেদের প্রভাব দেখানো। তবে সেটি হলো নেতিবাচক ধরনের প্রভাব। অর্থাৎ সামরিক সক্ষমতা যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তারা এখনও বিশ্বের অর্থনীতিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, সেটি প্রমাণ করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের কিছু মানুষের কাছে এর অর্থ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। অন্যদের কাছে এটি কেবল আলোচনার সময় ব্যবহার করার একটি সম্ভাব্য দর-কষাকষির হাতিয়ার। তবে সবার জন্যই বিজয়ের অর্থ হলো টিকে থাকা এবং সেই টিকে থাকাকে স্থিতিশীলতায় রূপ দেওয়ার পথ খুঁজে বের করা। এটি একটি কঠিন কাজ।’

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা