ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত কঠোর অবস্থান এবং তেহরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার’ হুমকি থেকে তিনি নাটকীয়ভাবে পিছু হটেছেন বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সম্প্রতি তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পাদিত প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যগুলোর প্রায় সব কটি তিনি শিথিল করেছেন অথবা পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার একটি চুক্তি নিশ্চিত করতে গিয়ে মার্কিন প্রশাসন তেহরানকে ব্যাপক নীতিগত ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। এটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’
তবে ইরানের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর গত বুধবার ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে একেবারে ভিন্ন সুরে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র থাকা স্বাভাবিক।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের কাছে কিছু (ক্ষেপণাস্ত্র) থাকতেই হবে। কারণ, অন্যদের কাছেও তা রয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র কোনো সমস্যা নয়। কারণ, এগুলো পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দেয় না।’
বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। উল্লেখ্য, ইরান শুরু থেকেই বিষয়টিকে আলোচনার বাইরে বা তাদের ‘রেড লাইন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
গত ৬ মার্চ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে আর কোনো চুক্তি হবে না।’
কিন্তু বর্তমান চুক্তিটিতে ইরানকে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল শিবিরের অনেক সমালোচক এই চুক্তিকে মার্কিনিদের একধরনের ‘নতি স্বীকার’ বা ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনগুলোতে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের সরকার পতনের ডাক দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন কাজ শেষ করব, তখন সরকার আপনাদের হাতে থাকবে। এটি পরিবর্তনের এখনই সময়।’
পরে ইরানিদের পক্ষ থেকে এমন কোনো গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষণ না পাওয়ায় হোয়াইট হাউস এই অবস্থান থেকে সরে আসে। যদিও মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনাকে ট্রাম্প প্রশাসন একধরনের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ হিসেবে দাবি করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক নেতার ছেলে মোজতবা খামেনি। গত বুধবার ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘আমি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য এটি (যুদ্ধ) করিনি।’
গত এপ্রিল মাসেও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘ইরানের কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সহ্য করা হবে না।’
তবে বর্তমানে ট্রাম্প বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বেসামরিক কাজের জন্য ইরানকে স্বল্পমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দিতে সম্মতি জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘যখন আপনার প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে এটি (বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি) রয়েছে, তখন তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কাজে তা ব্যবহার করতে না দেওয়া কঠিন। এখানে আমাদের সাধারণ জ্ঞান খাটানো উচিত।’
একইভাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত প্রসঙ্গে গত মার্চে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা নিজেরা গিয়ে তাদের মজুত করা ইউরেনিয়াম নিয়ে আসব।’
তবে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, সেই মজুত ইউরেনিয়াম জব্দ বা মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি; বরং তা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে ইরানের মাটিতেই নিষ্ক্রিয় বা মিশ্রিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করার চেয়ে তারা যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে ইরানের অর্থায়ন চিরতরে বন্ধ করা। কিন্তু বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। উল্টো এই চুক্তির ফলে ইরান অবিলম্বে বাজারে তেল বিক্রি শুরু করতে পারবে, যা তাদের আর্থিক সংকট কাটাতে সাহায্য করবে।
এ ছাড়া কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ‘স্থায়ীভাবে টোলমুক্ত’ রাখার দাবি জানিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু চুক্তিতে মাত্র ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কোনো ফি ছাড়া নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং অন্যতম প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা পরিষেবার জন্য ফি আদায় করব।’
যুদ্ধের সূচনালগ্নে মার্কিন প্রশাসনের যে মারমুখী ও অনড় অবস্থান ছিল, তা থেকে বর্তমান সমঝোতার দূরত্ব স্পষ্ট। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু আরেকটি যুদ্ধ এড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কঠোর পূর্বশর্তগুলো একে একে শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। এই সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে ইরান তাদের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হলো, যা ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তথ্যসূত্র: সিএনএন