পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমার জনক আবদুল কাদির খান এক সময় বলেছিলেন, ‘নিজেরদের পূত–পবিত্র মনে করা আমেরিকান ও ব্রিটিশদের প্রশ্ন করতে চাই যে, এই হারামজাদারা কি পৃথিবীর রক্ষক হয়ে জন্মেছে?’ ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক প্রযুক্তি দেওয়ার জন্য তিনি যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, সেটির যৌক্তিকতা কী—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন।
গত ছয় সপ্তাহ ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের অন্যতম বড় যুক্তি ছিল—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে থামানো। অথচ ইসরায়েল যে নিজেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী, তা আন্তর্জাতিক মহলে বহুল স্বীকৃতও—যদিও দেশটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি।
অথচ, সেই ইসরায়েলই ১৯৮০-এর দশকে আরেকটি মুসলিম-প্রধান দেশকে বোমা বানানো থেকে থামাতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছিল। সেই দেশ ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের সফল পারমাণবিক কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, নিজ দেশে যিনি এ কিউ খান নামে পরিচিত, তিনি কেবল নিজের দেশকে পারমাণবিক শক্তিধর বানাতেই থেমে থাকেননি।
ইসরায়েলি গুপ্তচরদের নজরদারির মধ্যেই খান যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে চেয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যেই তিনি ইরানসহ অন্য দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহায়তা দেন। সিআইএ–এর সাবেক পরিচালক জর্জ টেনেট পরে তাঁকে ‘ওসামা বিন লাদেনের মতোই বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। আর সাবেক মোসাদ প্রধান শাবতাই শাভিত আফসোস করেছিলেন—তাঁকে হত্যা করা হয়নি বলে।
আবদুল কাদির খান যেসব দেশকে সহায়তা করেছিলেন, তাদের মধ্যে কেবল উত্তর কোরিয়াই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ইরানের কর্মসূচি ফাঁস হয়ে যায় এবং ধ্বংস করা হয়। পাকিস্তানি এই বিজ্ঞানী কীভাবে ইরানকে এত দূর এগিয়ে দিয়েছিলেন, সেই গল্প সত্যিই বিস্ময়কর।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ১৯৭০-এর দশকে দুই দফা প্রধানমন্ত্রী থাকা জুলফিকার আলি ভুট্টোই দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। ভুট্টোর অধীনে পাকিস্তান অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন তদারককারী মুনির আহমদ খান বলেন, ‘আমরা বোমা বানাচ্ছিলাম না। আমরা প্রতিরোধক্ষমতা (ডিটারেন্ট) তৈরি করছিলাম।’
ভারত ১৯৭৪ সালের ১৮ মে ‘স্মাইলিং বুদ্ধা নিউক্লিয়ার টেস্ট’ নামে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালায়। এর পরপরই জুলফিকার আলি ভুট্টো বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ঘাস বা পাতা খেয়ে থাকব, এমনকি না খেয়ে থাকব তবুও আমরা নিজেদের একটি বোমা বানাব।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘একটি খ্রিষ্টান বোমা আছে, একটি ইহুদি বোমা আছে, আর এখন একটি হিন্দু বোমা এসেছে। তাহলে একটি ইসলামি বোমা কেন থাকবে না?’
এই প্রকল্পকে তিনি দেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছিলেন। ভুট্টো ঘোষণা করেন, ‘বোমা শুধু একটি অস্ত্র নয়, এটা আমাদের টিকে থাকার চাবিকাঠি।’ যে ব্যক্তি সেই ‘চাবি’ তৈরি করবেন—এ কিউ খান—১৯৭৪ সালে তখনো ইউরেনকো নামের একটি কোম্পানির সাব কন্ট্রাক্টরের হয়ে আমস্টারডামে কাজ করছিলেন।
এই কোম্পানি ইউরোপের পারমাণবিক চুল্লিগুলোর জন্য সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি সরবরাহ করত। খানের হাতে ছিল ইউরেনকোর অত্যন্ত গোপন অংশে প্রবেশাধিকার এবং বিশ্বের সেরা সেন্ট্রিফিউজের নকশা—যেগুলো প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে সমৃদ্ধ করে বোমার জ্বালানিতে পরিণত করে। তিনি পাকিস্তানে ভুট্টোকে একটি হাতে লেখা চিঠি পাঠান। সেখানে খান লেখেন, ‘আমি গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ ব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত বিস্তারিত ও বিস্তৃত জ্ঞান অর্জন করেছি এবং এখন পাকিস্তানকে সাহায্য করার অবস্থায় আছি...এটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়।’
পরে আবদুল কাদির খান স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, তাঁকে হত্যা বা গ্রেপ্তার করা হতে পারে—এই ঝুঁকি সচেতনভাবে জেনেই তিনি চিঠি লিখেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, আমার আর কোনো বিকল্প নেই। ভারত পরীক্ষা চালিয়েছে। আমাদের প্রতিক্রিয়া জানাতেই হতো।’
খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি নেদারল্যান্ডস থেকে ইউরেনিয়াম সেন্ট্রিফিউজের নকশা চুরি করেছিলেন, যা ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র মানের জ্বালানিতে পরিণত করতে পারে। ১৯৭৬ সালের জুলাইয়ে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে একটি গবেষণাগার স্থাপন করেন, যা পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করে।
ভারত ও ইসরায়েলের বিরোধিতা সত্ত্বেও চীন পাকিস্তানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, ট্রিটিয়াম এবং এমনকি বিজ্ঞানীও সরবরাহ করে। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার পাকিস্তানের কর্মসূচি ফাঁস হওয়ার পর ইসলামাবাদের জন্য সহায়তা বন্ধ করে দেন। কিন্তু কয়েক মাস পরই সিদ্ধান্ত পাল্টান—কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে হামলা চালায়। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল প্রতিবেশী পাকিস্তানের সহায়তা।
১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে পাকিস্তানি পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেয় এবং কর্মসূচির দিকে চোখ বন্ধ করে রাখে। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর সবকিছু বদলে যায়। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতিবাদে। তখন পাকিস্তান জানায়, তারা পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন বন্ধ করবে।
তবে পরে কাদির খান প্রকাশ করেন—গোপনে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন চলতেই থাকে। ১৯৯৮ সালের ১১ মে ভারত প্রথম পারমাণবিক ওয়ারহেড পরীক্ষা চালায়। এরপর একই মাসে বেলুচিস্তানের মরুভূমিতে পাকিস্তান সফলভাবে নিজের পরীক্ষা সম্পন্ন করে। বিশ্বে সপ্তম পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয় পাকিস্তান। কাদির খান বলেন, ‘আমি ভুট্টো সাহেবকে বলেছিলাম, আমরা বোমা বানাব। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমি সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছি।’
কিন্তু এই পুরো সময়জুড়েই খান আরও একটি, আরও সাহসী কর্মসূচি চালাচ্ছিলেন—একটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে ইরান, উত্তর কোরিয়া ও লিবিয়াকে প্রযুক্তি ও নকশা সরবরাহ করা হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি পশ্চিমাদের সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু শাহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেই সমর্থন হারিয়ে যায়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি পারমাণবিক বোমার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেন, বলেন এটি ইসলামের পরিপন্থী। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে পর্দার আড়ালে ইরান সরকার পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হকের কাছে সহায়তা চায়। এই বিষয়ে ২০১৫ সালে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি বলেন, ‘আমাদের পাকিস্তানিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল।’ তিনি ১৯৮৯–১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আকবর হাশেমি রাফসানজানি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
ইরানের এই সাবেক প্রেসিডেন্ট স্মরণ করেন, ‘আমরা তখন যুদ্ধে ছিলাম। আমাদের এমন একটি বিকল্প দরকার ছিল—যেদিন আমাদের শত্রুরা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে চাইবে, তখন আমরা যেন প্রতিরোধ গড়তে পারি। এটাই ছিল আমাদের মানসিকতা।’ রাফসানজানি স্মরণ করেন, ‘আবদুল কাদির খান বিশ্বাস করতেন, ইসলামি একটি পারমাণবিক বোমা থাকা উচিত।’
রাফসানজানি আরও বলেন, ‘সমঝোতা হয়েছিল যে তারা (পাকিস্তান) আমাদের কিছুটা সহায়তা করবে—যেমন, ব্যবহৃত প্রথম প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ সরবরাহ করা এবং কিছু নকশা দেওয়া—দেওয়া—যাতে আমরা নিজেরাই তা তৈরি করতে পারি। ধীরে ধীরে আমরা কাজ শুরু করি...পাকিস্তানিরা আমাদের ৪ হাজার ব্যবহৃত প্রথম প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ দেয়, সঙ্গে নকশাও।’
পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রকল্পের সবচেয়ে তীব্র বিরোধিতা হয়েছিল ইসরায়েলের তরফ থেকে। পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির সাবেক কর্মকর্তা ফিরোজ খানের ভাষায়, ইসরায়েলিরা ‘কোনো মুসলিম দেশের হাতে বোমা থাকুক, তা চাইত না।’
এরপর, ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ইসরায়েল ভারতকে প্রস্তাব দেয়—দুই দেশ মিলে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির কাহুতা পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাবে। সে সময়ের ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই হামলার অনুমোদনও দিয়েছিলেন। পরিকল্পনা ছিল, ইসরায়েলের এফ–১৬ ফাইটিং ফ্যালকন এবং এবং এফ–১৫ ঈগল যুদ্ধবিমান গুজরাটের জামনগর ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে ওই স্থাপনায় আঘাত হানবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধী পিছিয়ে যান। পরিকল্পনাটি বাতিল হয়ে যায়।
এদিকে, আবদুল কাদির খান নিজের খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণ যন্ত্রাংশ অর্ডার করে অতিরিক্ত অংশ গোপনে বিক্রি করছিলেন তিনি। তত দিনে পাকিস্তানের সামরিক মহলে তিনি নানা—‘অদৃশ্য জেনারেল’, ‘ড. একিউকিউ, ‘বোমার জনক’ এবং ‘মোহসিন-ই-পাকিস্তান—পাকিস্তানের রক্ষক’—নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পাকিস্তান ১৯৮৬–২০০১ সালের মধ্যে ইরানকে তাদের প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্যে আবদুল কাদির খানকে নজরদারিতে রেখেছিল। কিন্তু তিনি আসলে কী করছেন, তা তারা বুঝতে পারেনি। পরে মোসাদের তৎকালীন প্রধান শাবতাই শাভিত বলেন, যদি তিনি খানের উদ্দেশ্য বুঝতে পারতেন, তাহলে ইতিহাস বদলাতে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার কথাও ভাবতেন।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী খানের আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বেসামরিক সরকারকে অন্ধকারে রেখেছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে—যিনি জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে—তাঁর জেনারেলরা ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তি বিনিময়ের বিষয়টি একেবারেই জানাননি। ১৯৮৯ সালে তেহরানে গিয়ে ঘটনাচক্রে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘বিশেষ প্রতিরক্ষা বিষয়ে আমাদের চুক্তি আবার নিশ্চিত করা যাবে কি?’ বিভ্রান্ত ভুট্টো জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন, মি. প্রেসিডেন্ট?’ রাফসানজানির উত্তর ছিল, ‘পারমাণবিক প্রযুক্তি, ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী, পারমাণবিক প্রযুক্তি।’ এতে ভুট্টো হতবাক হয়ে যান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয়জন ইরানি বিজ্ঞানী পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন—ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং নিউক্লিয়ার স্টাডিজ ইনস্টিটিউটে। এমন দাবিও আছে, ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ১৯৮৭ সালের জানুয়ারিতে খান নিজে ইরানের বুশেহর রিঅ্যাক্টর পরিদর্শন করেছিলেন। যদিও তিনি তা অস্বীকার করেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে খান ইরানে ২ হাজারের বেশি সেন্ট্রিফিউজের যন্ত্রাংশ ও সাব-অ্যাসেম্বলি পাঠিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
কিন্তু ২০০৩ সালে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেতে গিয়ে খানের এই গোপন কার্যক্রম ফাঁস করে দেন। তিনি সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই–৬কে জানান, খান লিবিয়ার সরকারের জন্য পারমাণবিক স্থাপনা তৈরি করছিলেন। এসব স্থাপনা মুরগির খামারের ছদ্মবেশে তৈরি করা হয়েছিল।
সুয়েজ খাল দিয়ে পাচারের সময় লিবিয়াগামী যন্ত্রপাতি জব্দ করে সিআইএ। তদন্তকারীরা ইসলামাবাদের এক ড্রাই ক্লিনারের ব্যাগে অস্ত্রের নকশাও খুঁজে পান। ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে যুক্তরাষ্ট্র হতভম্ব হয়ে যায়। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘ভাবলে অবাক লাগে—এটা এমন এক রূপান্তর, যা আমরা আগে কখনো দেখিনি। প্রথমে খান একটি বিচ্ছিন্ন বাজারকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত উন্নত পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার তৈরি করেন। তারপর হঠাৎ দিক পাল্টে পুরো প্রযুক্তি, এমনকি বোমার নকশা পর্যন্ত, বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ কিছু সরকারের কাছে বিক্রি করার পথ বের করেন।’
এদিকে, ২০০৪ সালে খান স্বীকার করেন—তিনি এই পারমাণবিক বিস্তার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। তিনি বলেন, ইরান, লিবিয়া এবং উত্তর কোরিয়াকে তিনি পারমাণবিক প্রযুক্তি দিয়েছেন। সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি টেলিভিশনে এসে দাবি করেন, তিনি একাই কাজ করেছেন, পাকিস্তান সরকারের কোনো সহায়তা ছিল না। এরপর দ্রুত তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। পরে খান বলেন, ‘আমি প্রথমবার দেশকে বাঁচিয়েছি, যখন পাকিস্তানকে পারমাণবিক শক্তিধর বানিয়েছি। আর দ্বিতীয়বার বাঁচিয়েছি, যখন সব দোষ নিজের ওপর নিয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছি।’
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০০৫ সালে ইরান আইএইএ-এর তত্ত্বাবধানে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে সম্মত হয়। ২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়ার সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তাদের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। তিন বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সেই চুক্তি থেকে সরে এসে আবার কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
যারা এ কিউ খানকে কাছ থেকে চিনতেন, তারা বলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—তিনি যা করেছেন, তা সঠিক। তাঁর লক্ষ্য ছিল পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। তাঁর এক ঘনিষ্ঠজনের ভাষায়, ‘একটি মুসলিম দেশকে প্রযুক্তি দেওয়া কোনো অপরাধ নয়—এটাই ছিল তার বিশ্বাস।’ ২০০৯ সালে খান বলেন, ‘ইরান যদি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তা ভুল। কিন্তু ইসরায়েল করলে তা ঠিক—এই দ্বিচারিতা কেন?’
২০২১ সালে মৃত্যুর ১২ বছর আগে দেওয়া এই বক্তব্যে তাঁর ক্ষোভ স্পষ্ট ছিল। আজও পাকিস্তানই একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যার হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। ২০১১ সালে খান বলেন, ‘একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—যেসব দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা আছে, তাদের ওপর আক্রমণ হয়নি, তাদের দখল করা হয়নি, বা তাদের সীমানা বদলানো হয়নি। ইরাক ও লিবিয়ার যদি পারমাণবিক শক্তি থাকত, তাহলে তাদের আমরা যেভাবে ধ্বংস হতে দেখেছি, তা হয়তো হতো না।’
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান