হোম > বিশ্লেষণ

ভারত বা পাকিস্তানের অংশ হতে পারত দুবাই, হাতছাড়া হলো কীভাবে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 

দুবাই ভারত বা পাকিস্তানের অংশ হওয়ার কথা ছিল। ছবি: এক্স

আজকের ঝলমলে স্কাইস্ক্রেপার, বিলাসবহুল জীবনযাত্রা আর আধুনিকতার প্রতীক দুবাই কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ভারত বা পাকিস্তানের প্রশাসনিক অংশ হিসেবে কল্পনা করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তবে ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মাত্র আট দশক আগেও দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক রূপরেখা এমন ছিল না।

ইতিহাসবিদ ও লেখক স্যাম ডালরিম্পল তাঁর গবেষণাধর্মী কাজ ও ‘শ্যাটার্ড ল্যান্ডস’ বই সংক্রান্ত আলোচনায় তুলে ধরেছেন ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। তিনি জানান, ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়া ত্যাগের সময় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠী প্রস্তাব করেছিল দুবাই ও তৎসংলগ্ন উপসাগরীয় শেখডমগুলোর নিয়ন্ত্রণ নতুন স্বাধীন ভারত অথবা পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে।

যদি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হতো, তবে আজকের মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করত। লন্ডন নয়, দিল্লি থেকে পরিচালিত হতো উপসাগরীয় শাসন।

ইতিহাসবিদ ডালরিম্পল জানান, উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পারস্য উপসাগরের একটি বিস্তৃত অঞ্চল লন্ডন থেকে সরাসরি শাসিত হতো না। বরং সমগ্র প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হতো ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে। ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সার্ভিস (আইপিএস)-এর কর্মকর্তারা এই অঞ্চলে রাজনৈতিক রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সেখানকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে মোতায়েন ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি ও সেপাইরা। চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সার্বিক জবাবদিহি ছিল ভারতের ভাইসরয়ের কাছে।

১৮৮৯ সালের ‘ইন্টারপ্রিটেশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে কুয়েত থেকে ইয়েমেনের এডেন পর্যন্ত বিস্তৃত এই ‘আরব প্রটেক্টরেট’ বা রক্ষিত বা আশ্রিত অঞ্চলগুলোকে আইনত ভারতের প্রশাসনিক সীমানার অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই গণ্য করা হতো। ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আমলে পারস্য উপসাগরে ভারতের প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তৎকালীন ব্রিটিশ নথিপত্রে আবুধাবিকে ভারতের দেশীয় রাজ্য বা ‘প্রিন্সলি স্টেটস’-এর তালিকায় যুক্ত করা হয়েছিল। এমনকি লর্ড কার্জন ওমানকেও ব্রিটিশ ভারতের একটি দেশীয় রাজ্যের মতো পরিচালনা করার প্রশাসনিক প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন।

বোম্বে প্রেসিডেন্সির অংশ এডেন ও ‘ইন্ডিয়ান অ্যাম্পায়ার পাসপোর্ট’

এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরতা কেবল প্রশাসনিক কাগজে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রতিফলিত হতো। বর্তমান ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এডেন বন্দরটি দীর্ঘকাল বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) প্রেসিডেন্সির একটি জেলা হিসেবে পরিচালিত হতো। সেখানকার অধিবাসীদের জন্য আলাদা কোনো প্রটেক্টরেট পরিচয়পত্র ছিল না; তাঁরা সবাই ছিলেন ‘ইন্ডিয়ান অ্যাম্পায়ার পাসপোর্ট’-এর অধিকারী।

ডালরিম্পল একটি বিরল ঐতিহাসিক তথ্য উল্লেখ করে জানান, ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার পর ফিলিস্তিনে হিজরত করতে চাওয়া ইয়েমেনি ইহুদিদেরও ভারতীয় পাসপোর্টে ভ্রমণ করতে হয়েছিল। কারণ আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁদের পরিচয় ছিল জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক। ১৯৩১ সালে মহাত্মা গান্ধী যখন গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে লন্ডন যাওয়ার পথে এডেন বন্দরে যাত্রাবিরতি করেন, তখন হাজার হাজার স্থানীয় আরব বাসিন্দা তাঁকে সংবর্ধনা জানান। তখনকার অনেক উদীয়মান আরব তরুণ নিজেদের ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করতেন।

মুদ্রা ও বাণিজ্যের ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন

প্রশাসনিক কাঠামোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক আত্মিকতা ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। দুবাই ও অপরাপর ট্রুশিয়াল অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিক বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম ছিল ভারতীয় রুপা ও কাগজের টাকা (রুপিয়া)। পরবর্তীকালে ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ ‘গালফ রুপি’ চালু করে, যা ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দুবাই, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে বৈধ মুদ্রা হিসেবে প্রচলিত ছিল।

ট্রুশিয়াল স্টেটস, যা ট্রুশিয়াল কোস্ট বা ট্রুশিয়াল শেখডম বা ট্রুশিয়াল ওমান নামেও পরিচিত। এটি ছিল পারস্য উপসাগরের দক্ষিণে দক্ষিণ-পূর্ব আরবে অবস্থিত উপজাতীয় কনফেডারেশনগুলোর একটি গোষ্ঠী, যার নেতারা ১৮২০ থেকে ১৮৯২ সালের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সুরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।

১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর চুক্তি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত ট্রুশিয়াল স্টেটস একটি অনানুষ্ঠানিক ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্য ছিল। পরের দিন, ছয়টি শেখডম—দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, আজমান, উম্ম আল কুয়াইন এবং ফুজাইরাহ—সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠন করে। সপ্তম শেখডম রাস আল খাইমাহ এতে যোগ দেয় ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি।

দুবাইয়ের মুক্তা বা রত্ন ব্যবসা এবং সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্যে সিন্ধি ও মাড়ওয়ারি ভারতীয় বণিকদের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে তৎকালীন দুবাই মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে তৎকালীন বোম্বে ও করাচির একটি বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ হিসেবেই কাজ করত।

কেন হাতছাড়া হলো এই বিশাল অঞ্চল?

১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালের দিকে ব্রিটিশ সরকার যখন নিশ্চিত হয় যে তারা ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তখন একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে আসে—পারস্য উপসাগরের শাসনভার কার কাছে হস্তান্তরিত হবে? স্বাধীন ভারত, নতুন সৃষ্টি হতে যাওয়া পাকিস্তান, নাকি অন্য কোনো মাধ্যম?

ডালরিম্পল উল্লেখ করেন, ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকেরা কৌশলগত কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলটি ভবিষ্যৎ ভারতীয় সরকারের অধীনে রেখে দেওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে দুটি প্রধান কারণে এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনা ভেস্তে যায়:

১. দিল্লির অন্তর্বর্তী সরকারের অনাগ্রহ: জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ মূল ভূখণ্ডকে একীভূত করা। সাম্রাজ্যবাদী বা ঔপনিবেশিক কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব বহির্বিশ্বে সম্প্রসারিত করা তাদের পররাষ্ট্রনীতির (যা পরবর্তীতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম-এ রূপ নেয়) পরিপন্থী ছিল। তৎকালীন তেহরানে নিযুক্ত এক ব্রিটিশ প্রতিনিধি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছিলেন, ‘দিল্লির কর্মকর্তারা পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে একেবারেই উদাসীন এবং তারা এ বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।’

২. ব্রিটিশ রেসিডেন্টদের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা: ব্রিটিশ প্রশাসনের ভেতরের এক অংশও আরব ভূখণ্ড দক্ষিণ এশীয়দের হাতে ছাড়তে রাজি ছিল না। পারস্য উপসাগরের তৎকালীন ব্রিটিশ পলিটিক্যাল রেসিডেন্ট স্যার উইলিয়াম হে শক্ত যুক্তি দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘উন্মুক্ত আরব শেখডমগুলোর প্রশাসনিক ও সামাজিক দায়িত্ব ভারতীয় বা পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া নীতিগতভাবে একেবারেই অন্যায্য ও অনুচিত হবে।’

১ এপ্রিল, ১৯৪৭: মানচিত্রের চূড়ান্ত রূপান্তর

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ১৯৪৭ সালের ১ এপ্রিল—উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়া এবং ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের ঠিক চার মাস আগে—একটি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়। দুবাইসহ পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ ভারতের এখতিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন করে সরাসরি লন্ডনের ‘ফরেন অফিস’-এর অধীনে হস্তান্তর করা হয়। এর কয়েক মাস পর ভারত ও পাকিস্তান যখন জুনাগড়, হায়দরাবাদ বা কাশ্মীরের মতো শত শত দেশীয় রাজ্যকে (প্রিন্সলি স্টেট) নিজ নিজ ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়, ততক্ষণে আরব শেখডমগুলো দক্ষিণ এশিয়ার আইনি ও রাজনৈতিক সীমানা থেকে বহু দূরে ছিটকে গেছে।

১৯৭১ সালে যুক্তরাজ্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তাদের সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নিলে দুবাই, আবুধাবি ও অন্যান্য অঞ্চল একত্রিত হয়ে গঠন করে ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত’ (ইউএই)।

দূরদর্শী সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৪৭ সালের ১ এপ্রিলের সিদ্ধান্তটি যদি সামান্য ভিন্ন হতো, তবে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর ওপর দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থাকত। যদিও রাজনৈতিকভাবে পথ আলাদা হয়ে গেছে, তবুও সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সেই ঐতিহাসিক বন্ধন আজও টিকে আছে। বর্তমানে দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রবাসী নাগরিক। অতীত ইতিহাসের প্রশাসনিক শিকড়ই হয়তো আজকের দুবাইকে দক্ষিণ এশীয়দের জন্য এক ‘হোম অ্যাওয়ে ফ্রম হোম’ বা দ্বিতীয় ঘরে পরিণত করেছে।

ন্যাটোকে পরীক্ষা করতে জোটের একটি দেশে হামলা করতে পারেন পুতিন

মক্কা চুক্তি কি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের বিদায়ঘণ্টা বাজাল

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ছে ইরান, ঢাল-তলোয়ার চীনের

এখনই রাজনীতিতে নামছে না ককরোচ জনতা পার্টি, কেন?

যেসব কারণে ইরানের কাছ থেকে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ কাড়া শিগগির সম্ভব হবে না

যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে যেভাবে চাপ বাড়াচ্ছে ইরান

ইসরায়েলি লবি: ট্রুম্যান থেকে ট্রাম্প, ওয়াশিংটনকে নাকে দড়ি দিয়ে যেভাবে ঘোরায় তেল আবিব

‘গুপ্তচরের স্বর্গরাজ্য’ জাপান বানাল কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, ৮০ বছর পর কেন এই পরিবর্তন

ক্রিপ্টো, জুয়া আর নিষেধাজ্ঞার গোলকধাঁধায় ইরানের পকেটে ৪ বিলিয়ন ডলার

জর্ডান পিটারসনের নিবন্ধ: ‘জলবায়ু পরিবর্তন বিপর্যয়বাদ’ পুঁজিবাদকে ধ্বংস করার একটি বামপন্থী হাতিয়ার