হোম > বিশ্লেষণ

‘বিকশিত ভারত’ স্বপ্নপূরণে ২১ বছর ধরে ৯.২৫% প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হবেন কি মোদি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত

গত প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের অধিকাংশ বড় অর্থনীতির জন্য এমন প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয়। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্ন অনুযায়ী দেশকে ‘উন্নত রাষ্ট্রে’ পরিণত করতে এই প্রবৃদ্ধিও যথেষ্ট নাও হতে পারে।

ভারতকে ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদায় নিতে চান মোদি। ২০৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্ণ হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতিকে টানা ২১ বছর ধরে প্রতি বছর ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি করতে হবে বলে জানিয়েছেন ভারতের সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান নীতি আয়োগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অশোক লাহিড়ী।

‘বিকশিত ভারত’ বা ‘Viksit Bharat’ নামে পরিচিত এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য মোদির তৃতীয় মেয়াদের সরকারের অন্যতম প্রধান কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে মোদির সেই স্বপ্ন পূরণ হবে না বলে মনে করছেন বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ।

২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি বর্তমানে ভারতের সম্ভাব্য ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হারের তুলনায় অনেক কম। গত ৫০ বছরে ভারতের অর্থনীতি মাত্র তিনবার ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ বা তার বেশি হারে বেড়েছে। বছরগুলো হলো ১৯৭৫,১৯৮৮ ও ২০২১।

লন্ডনভিত্তিক অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ আলেকজান্দ্রা হারমান প্রসাদ বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রবৃদ্ধিতে ‘অসাধারণ শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ত্বরণ’ প্রয়োজন হবে। তবে অর্থনীতির আকার যত বাড়বে এবং ভিত্তি যত বড় হবে, এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা ‘ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে’।

আজ সোমবার প্রকাশিত হতে যাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগের প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ৮ শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধি হলে ভারত তথাকথিত ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এই পরিস্থিতিতে একটি দেশের মজুরি বাড়তে থাকে এবং কম খরচে উৎপাদনের সুবিধা কমে যায়, কিন্তু একই সময়ে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা এতটা উন্নত হয় না যে দেশটি ধনী অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রেও ভারতের সামনে বড় দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। ২০২৫ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৮১৩ ডলার। ২০৪৭ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশের সীমা অতিক্রম করতে হলে এই আয় ৬ গুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ডলারে পৌঁছাতে হবে বলে জানিয়েছেন নীতি আয়োগের অশোক লাহিড়ী।

ওভারসিজ-চাইনিজ ব্যাংকিং করপোরেশনের অর্থনীতিবিদ লাবণ্য ভেঙ্কটেশ্বরন বলেন, ভারতের অর্থনীতিতে ‘উল্লেখযোগ্য কিছু ঝুঁকি’ রয়েছে। তিনি ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতি, বাজেট ঘাটতি এবং বৈদেশিক ভারসাম্য বজায় রাখতে অস্থির বিদেশি পুঁজি প্রবাহের ওপর নির্ভরতার বিষয়গুলোকে ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন।

এর একটি কারণ হলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের আকর্ষণ কমে যাচ্ছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা মুদ্রা হলো ভারতীয় রুপি। আগস্টে ব্যাংক অব আমেরিকা করপোরেশনের তহবিল ব্যবস্থাপকদের ওপর করা এক জরিপে ইন্দোনেশিয়াকে সরিয়ে এশিয়ার সবচেয়ে কম পছন্দের শেয়ারবাজারে পরিণত হয়েছে ভারত।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এর একটি সমাধান হতে পারে উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ। মোদি সরকারের কর্মসূচির মধ্যেও এই বিষয়টি রয়েছে। তবে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মধ্যে উৎপাদন খাতের অংশ প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে স্থির রয়েছে। অথচ মোদি সরকারের লক্ষ্য এই অংশকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য রপ্তানি বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোও ভারতের অর্থনৈতিক গতি বাড়ানোর উপায় হতে পারে।

বিশ্বের পণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশ ২ শতাংশেরও কম। বিপরীতে চীনের অংশ ১৪ শতাংশের বেশি। একটি শিল্পশক্তিতে পরিণত হতে ভারতকে যে বিশাল ব্যবধান পেরোতে হবে, এই পরিসংখ্যান সেটিই তুলে ধরে। উৎপাদন খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করাও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত সপ্তাহেই ভারতের দুই শীর্ষ মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জাপানের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নতুন মূলধন সংগ্রহের লক্ষ্যে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প তুলে ধরেছেন।

ভারত রেকর্ড পরিমাণ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করেছে। তবে এই অর্থ বিনিয়োগ হিসেবে ধরে রাখতে দেশটি সমস্যায় পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোও বিদেশে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। একই সময়ে ভারতের স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগ করা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বিনিয়োগগুলো তুলনামূলক দ্রুত তুলে নিয়েছেন।

ভারতের প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষ পূরণে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভারত বিশ্ব গড়ের তুলনায় বেশি সঞ্চয় করলেও এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় দেশটির সঞ্চয়ের হার কম এবং চীনের তুলনায় অনেক কম। তুলনামূলক কম আয়ও ভারতীয় পরিবারগুলোকে সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পর পরিবারের হাতে সঞ্চয় করার মতো অর্থ কম থাকে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সঞ্চয় নতুন কারখানা, অবকাঠামো এবং অন্যান্য বিনিয়োগে অর্থায়নের জন্য তুলনামূলক কম খরচের অভ্যন্তরীণ মূলধনের উৎস তৈরি করে। সঞ্চয়ের হার দীর্ঘ সময় ধরে কমতে থাকলে ভারতের প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধির অর্থায়নে দেশটিকে আরও ব্যয়বহুল ঋণ অথবা বিদেশি মূলধনের ওপর নির্ভর করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নত মানের চাকরি ও দক্ষতার সুযোগ তৈরি করতে না পারলে ভারত আগামী আরও প্রায় তিন দশক ধরে চলতে পারে বলে ধারণা করা জনমিতিক সুবিধাও নষ্ট করার ঝুঁকিতে রয়েছে।

নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ২০২১ সালের জরিপের তথ্য ব্যবহার করে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ভারতীয় কোনো কাজ করছেন না এবং শিক্ষা বা প্রশিক্ষণেও নেই। মানসম্মত চাকরির ঘাটতির কারণে ভারতের প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মশক্তি আত্ম-কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছে। এর বড় একটি অংশ কৃষিতে কাজ করে, যেখানে সাধারণত আয় কম।

গ্লোবালডেটা ডট টিএস লম্বার্ডের প্রধান অর্থনীতিবিদ শুমিতা দেবেশ্বর বলেন, ‘ভারতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে এবং সরকার নিজেকে সংস্কারমুখী বলে দাবি করে। তাহলে মূল প্রশ্ন হলো, এত বছর ধরে বিনিয়োগচক্র কেন প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেছে এবং নিট এফডিআই কেন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি? তরুণ ও ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক চাকরি কেন তৈরি হচ্ছে না?’

তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি বাড়ানো না গেলে ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই হবে ‘কঠিন কাজ’। আর একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য ভারতের যে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, সেটি অর্জন করা হবে আরও কঠিন।

অর্থাৎ, ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ফলাফল। কিন্তু ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু দ্রুত বাড়লেই হবে না, দীর্ঘ ২১ বছর ধরে আরও দ্রুত এবং ধারাবাহিকভাবে বাড়তে হবে।

তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ