বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ছয় মাস ধরে বিপরীতমুখী দাবি করে আসছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ কার্যত চালু রয়েছে এবং প্রতিদিন মার্কিন সামরিক নিরাপত্তায় কোটি কোটি ব্যারেল তেল বহনকারী ডজনখানেক জাহাজ পার হচ্ছে। অন্যদিকে তেহরান বলছে, হরমুজ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং কেবল অনুমোদিত জাহাজই নির্ধারিত পথ ব্যবহার করতে পারছে।
তবে স্বাধীন সংস্থাগুলোর জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য বলছে, বাস্তবে চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—হরমুজ দিয়ে আসলে কী পরিমাণ তেল পরিবাহিত যাচ্ছে, আর কেন যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবের সঙ্গে সামুদ্রিক ও ইরানের তথ্যের এত বড় ব্যবধান?
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তাঁদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর এটি এক দিনের সর্বোচ্চ সংখ্যা।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই ধরনের দাবি করে বলেছেন, প্রতি রাতে প্রায় ৩০টি জাহাজকে হরমুজ পার হতে সহায়তা করছে মার্কিন নৌবাহিনী। পরে তিনি আরও বলেন, জলপথটি এখন ‘যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ভাষ্য, প্রতিদিন অন্তত ১ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে। আর গত সোমবার সেই পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের মধ্যে।
এর আগে সেন্টকমের কমান্ডার ব্র্যাড কুপার দাবি করেছিলেন, মার্কিন বাহিনী হরমুজের নৌপথ থেকে সমুদ্র মাইন অপসারণ করেছে।
ইরান স্বীকার করেছে যে, কিছু জাহাজ হরমুজ পার হচ্ছে। তবে তারা বলছে, জলপথের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত মঙ্গলবার বলেন, ‘শত্রুপক্ষ কিছু জাহাজ পার করাতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু হরমুজ এখনো আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আমরা এটিকে উন্মুক্ত হতে দেব না।’ তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র জাহাজগুলোকে দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি পথ ব্যবহার করার ‘ভুয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ দিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ওই পথে চলাচলকারী জাহাজও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
পরদিন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করে, ‘অবৈধ পথ’ ব্যবহার করতে গিয়ে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার মাইন বিস্ফোরণে অচল হয়ে গেছে। একই সময়ে সৌদি আরব অভিযোগ করেছে, একটি সৌদি ট্যাংকারে ইরানের হামলায় দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন।
জাহাজ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের দাবির সঙ্গে মিলছে না।
সামুদ্রিক ডেটা বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার হরমুজ অতিক্রম করেছে মাত্র ৬টি জাহাজ, মঙ্গলবার ১১টি এবং সোমবার ৫টি। আর গত ১০ দিনে গড়ে দৈনিক হরমুজ অতিক্রম করেছে মাত্র ১৩টি জাহাজ।
লন্ডনভিত্তিক শিপিং-বিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সও প্রায় একই চিত্র দিয়েছে। তাদের হিসাবে, ২৬ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দৈনিক গড়ে প্রায় ১২টি কার্গো জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে।
যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র বা জেএমআইসি গত ১ সেপ্টেম্বরের তথ্য বলেছে, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল এখনো স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। তবে সাম্প্রতিক নিম্ন অবস্থান থেকে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে। একই সঙ্গে তারা ভাসমান বা অচিহ্নিত মাইনের কারণে ঝুঁকির মাত্রা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাহাজ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানের হিসাবের পদ্ধতি ভিন্ন হওয়াই বড় কারণ হতে পারে।
লয়েডস লিস্টের সামুদ্রিক গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ব্রিজেট ডিয়াকুন বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান কেবল ১০ হাজার ডেডওয়েট টনের বেশি কার্গোবাহী জাহাজ গণনা করে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো টাগবোট, ছোট উপকূলীয় নৌযান, অফশোর সাপোর্ট ভেসেল ও নৌবাহিনীর সহায়ক জাহাজও হিসাবের মধ্যে রাখছে।
ড্রুরি মেরিটাইম গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এরিক হুপার বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে স্যাটেলাইট, বিমান ও অন্যান্য সেন্সরের তথ্য এবং নিজেদের কনভয়ের তালিকা থাকে। ফলে তারা এমন অনেক জাহাজ শনাক্ত করতে পারে, যেগুলো স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) বন্ধ রেখে চলাচল করে।
এরিক হুপার জানান, আগস্টের শেষ দিকে হরমুজ অতিক্রমকারী অধিকাংশ জাহাজই ‘ডার্ক ট্রানজিট’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত ছিল। অর্থাৎ তারা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখায় তাৎক্ষণিকভাবে ট্র্যাকিং ডেটায় ধরা পড়েনি। পরে তথ্য হালনাগাদ হলে তাদের চলাচল যুক্ত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষেরই হরমুজে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে দেখানোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি এনশার আলজাজিরাকে বলেন, সেন্টকমের ‘মাইনমুক্ত’ ঘোষণার পরই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার নতুন পর্ব শুরু হয়। হেনরি বলেন, ‘দুই পক্ষই যদি কিছুটা কম কথা বলত, তাহলে পরিস্থিতি সবার জন্যই ভালো হতো।’
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ এবং প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে যেত। তবে বর্তমানে স্বাধীন তথ্য অনুযায়ী সেই সংখ্যা তার অনেক নিচে থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।