পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথমবারের মতো সরাসরি আক্রমণাত্মক সমরাস্ত্র মোতায়েনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বিমানবাহিনী মন্ত্রী ট্রয় মেঙ্ক জানিয়েছেন, শত্রুভাবাপন্ন দেশের যেকোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সুরক্ষায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ‘এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্স’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রয় মেঙ্ক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী মহাকাশে ‘ক্রমবিকাশমান হুমকি’ মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে এই অস্ত্রের নির্দিষ্ট ক্ষমতা কিংবা ঠিক কবে এটি কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
দীর্ঘদিন ধরেই পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছিলেন। তাঁদের দাবি, চীন ও রাশিয়া এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে যা যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের সময় মার্কিন যোগাযোগ, গোয়েন্দা নজরদারি ও জিপিএস স্যাটেলাইটগুলোকে অকার্যকর বা ধ্বংস করে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংক্রান্ত কমান্ড ‘ইউএস স্পেস ফোর্স’-এর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মহাকাশে শত্রুভাবাপন্ন শক্তিকে প্রতিহত করা এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনবোধে প্রতিপক্ষের সক্ষমতাকে ব্যাহত, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করার জন্য কাইনেটিক ও নন-কাইনেটিক দুটি পদ্ধতিই ব্যবহার করা যেতে পারে।’
পেন্টাগনের এই কৌশলগত অবস্থান হঠাৎ তৈরি হয়নি। বাস্তবে মহাকাশে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মার্কিন চেষ্টা বহু পুরোনো। পেন্টাগনের তৎকালীন ‘ইউএস স্পেস কমান্ড’-এর ‘ভিশন ২০২০’ শীর্ষক নীতিগত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জাতীয় সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে আধিপত্য বজায় রাখতে হবে। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বিমানবাহিনী মন্ত্রী কিথ আর হল অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘মহাকাশে আধিপত্যের বিষয়টি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, আমরা এটি পছন্দ করি এবং আমরা এটি ধরে রাখব।’
পেন্টাগনের মতে, মহাকাশভিত্তিক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাণিজ্যিক ও সামরিক স্বার্থে আঘাত হানার আশঙ্কাও তত বাড়ছে।
পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এই অস্ত্রের গঠন বা পরিচালনার প্রক্রিয়া নিয়ে নীরবতা বজায় রাখলেও, নিরাপত্তা ও মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা এর প্রযুক্তিগত ধরন নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ শুরু করেছেন।
মহাকাশ প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’ (আরইউএসআই)-এর বিশেষজ্ঞ ড. ব্লেডিন বোয়েন বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, কক্ষপথে মোতায়েন করা প্রযুক্তি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানা-শোনার সুযোগ খুবই সীমিত।
ড. বোয়েন ধারণা থেকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা রেডিও জ্যামিং প্ল্যাটফর্মের কথা বলছে।’ এই ধরনের অ-ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থা পৃথিবীতে বা মহাকাশে অবস্থানরত শত্রু বাহিনীর স্যাটেলাইট সংকেত ও রেডিও যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো ‘কাইনেটিক কিল ভেহিকল’—যেটি উচ্চ গতিতে সরাসরি কোনো বস্তুর ওপর আঘাত করে স্যাটেলাইট চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। তবে ড. বোয়েনের মতে, মহাকাশে সরাসরি আঘাতের সম্ভাবনা কিছুটা কম। কারণ এ ধরনের সরাসরি আঘাতে হাজার হাজার বিপজ্জনক সামরিক বর্জ্য বা ‘স্পেস ডেব্রি’ তৈরি হয়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্যাটেলাইটের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় বেশ কয়েক ধরনের উন্নত লেজার প্রযুক্তির গবেষণা ও পরীক্ষা চলছে। পেন্টাগন প্রধানত তিন ধরনের রাসায়নিক লেজার নিয়ে কাজ করছে, যা মহাকাশভিত্তিক বা ভূ-পৃষ্ঠভিত্তিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে:
১. হাইড্রোজেন ফ্লোরাইড লেজার (এইচএফ): পারমাণবিক ফ্লোরিন ও আণবিক হাইড্রোজেনের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন এই লেজারের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ২.৭ থেকে ২.৯ মাইক্রন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে নেয়। ফলে এটি কেবল মহাকাশ থেকে মহাকাশে যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থা ইতিমধ্যেই সিমুলেটেড মহাকাশ পরিবেশে মেগাওয়াট ক্ষমতার এইচএফ লেজারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছে।
২. ডিউটেরিয়াম ফ্লোরাইড লেজার (ডিএফ): হাইড্রোজেনের স্থলে ডিউটেরিয়াম ব্যবহারের ফলে এই লেজারের তরঙ্গদৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ৩.৫ মাইক্রন, যা বায়ুমণ্ডল ভেদ করতে সক্ষম। ১৯৮০ সালে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি টিআরডব্লিউ ‘মিড-ইনফ্রারেড অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল লেজার’ (মিরাকল) নামের এক মেগাওয়াটেরও বেশি ক্ষমতার একটি ডিএফ লেজার প্রদর্শন করে, যা ১৯৯৬ সালে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের পরীক্ষায় সাফল্য দেখায়।
৩. কেমিক্যাল অক্সিজেন আয়োডিন লেজার (কয়েল): ১৯৭৮ সালে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তিতে ক্লোরিন ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের বিক্রিয়ায় আয়োডিন পরমাণুকে উত্তেজিত করে ১.৩ মাইক্রন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শক্তিশালী লেজার রশ্মি তৈরি করা হয়। ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কারণে এর জন্য ছোট আকৃতির অপটিক্যাল সিস্টেম প্রয়োজন, যা মহাকাশে মোতায়েনের জন্য সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল। ১৯৯৬ সালে এটি শত শত কিলোওয়াট শক্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়।
মহাকাশে লেজার অস্ত্রের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, ঘণ্টায় হাজার হাজার মাইল বেগে ধাবমান কোনো গতিশীল লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁতভাবে আঘাত করা অত্যন্ত কঠিন। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে পেন্টাগন ‘পার্টিকেল বিম’ বা কণা-রশ্মি অস্ত্রের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
পার্টিকেল বিম প্রযুক্তিতে সাব-অ্যাটমিক কণা (যেমন ইলেকট্রন, প্রোটন বা হাইড্রোজেন পরমাণু) আলোর কাছাকাছি বেগে নিক্ষেপ করা হয়। এই শক্তির প্রভাবে লক্ষ্যবস্তুর পরমাণুগুলো মুহূর্তের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিস্ফোরিত হয়।
তবে মহাকাশে পার্টিকেল বিম বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হলো এর শক্তির উৎস। এই ধরনের অস্ত্রের জন্য লাখ লাখ ইলেকট্রন ভোল্ট এবং মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ প্রয়োজন। পৃথিবীতে বিদ্যমান পাওয়ার স্টেশনগুলো এত বড় যে তা মহাকাশে পাঠানো সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত মহাকাশে পাঠানোর উপযোগী হালকা ও শক্তিশালী শক্তির উৎস তৈরি করা বৈজ্ঞানিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
পাশাপাশি সামরিক ব্যবহারের জন্য নাসা ও মার্কিন বিমানবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘এক্স-৩৩’ স্পেস প্লেনের মতো দ্রুতগতির মহাকাশযানের মহাকাশ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েও কাজ চলছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মহাকাশে সম্ভাব্য অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনা মুখপাত্র মার্কিন পক্ষকে মহাকাশে সামরিক শক্তির বিস্তার বন্ধ এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। ইউএস স্পেস ফোর্সের দাবি, চীন ও রাশিয়া উভয় দেশই মহাকাশকে নতুন যুদ্ধের ময়দান হিসেবে গড়ে তুলছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে অন্তত এক ডজন ইউরোপীয় যোগাযোগ স্যাটেলাইটের তথ্য রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দারা হ্যাক ও পর্যবেক্ষণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালে রাশিয়া এমন একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে যা অন্য স্যাটেলাইটে আক্রমণ চালাতে সক্ষম বলে মার্কিন গোয়েন্দারা দাবি করেন।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক ও বর্তমান প্রতিরক্ষা কৌশলে মহাকাশভিত্তিক প্রতিরোধক অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। ট্রাম্প ঘোষিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মহাকাশে ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক অস্ত্র স্থাপন করা। ২০১৯ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে গঠিত ‘ইউএস স্পেস ফোর্স’-কে সরাসরি আক্রমণের কাজে ব্যবহারের স্পষ্ট নির্বাহী আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ মহাকাশে বা পৃথিবীর কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র কিংবা গণবিধ্বংসী অন্য কোনো অস্ত্র মোতায়েন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
তবে এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে একটি বড় আইনি ফাঁক রয়েছে। চুক্তিতে পারমাণবিক ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কথা বলা হলেও লেজার, পার্টিকেল বিম, রেডিও জ্যামার কিংবা কাইনেটিক কিল ভেহিকলের মতো আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির ওপর স্পষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৩৮টি দেশ সর্বসম্মতভাবে মহাকাশে অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি পুনঃঅনুমোদন করে। তবে সেই প্রস্তাবের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভোটদানে বিরত ছিল।
মহাকাশে মার্কিন আক্রমণাত্মক অস্ত্রের এই আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির স্বীকৃতি প্রমাণ করে, সায়েন্স-ফিকশন বা কল্পকাহিনির ‘স্টার ওয়ার্স’ এখন আর কল্পনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা বাস্তবে বিশ্বনিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।