স্পাইং বা গুপ্তচরবৃত্তির কাহিনিগুলোতে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল, গোপন নম্বরের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আর ঝলমলে হীরার গল্পই বেশি শোনা যায়। কিন্তু বিদেশিদের তথ্যদাতা বা গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বাস্তবে যে কৌশল ব্যবহার করে, তা অনেক বেশি অদ্ভুত, অনেক বেশি মানবিক।
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে জানিয়েছেন, কোনো বিদেশি এজেন্টকে নিজের দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে অর্থ খুব কম ক্ষেত্রেই প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তবে অর্থ পারস্পরিক সম্পর্কটিকে সহজ ও কার্যকর করে তুলতে নির্ভরযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
আদালতের অপ্রকাশিত (ডিক্লাসিফায়েড) নথি এবং কয়েক দশকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে চিত্র উঠে আসে, তাতে দেখা যায় সিআইএ–এর কেস অফিসাররা মানুষের অন্তর্নিহিত চাহিদাকেই টার্গেট করেন। কারও প্রয়োজন চিকিৎসা, কারও সন্তানের স্কুল ফি প্রয়োজন! কিন্তু অন্তত একটি নথিভুক্ত ঘটনায় একজনের প্রয়োজন ছিল ভায়াগ্রা। বাস্তবতা খুব কম সময়ই সিনেমার কাহিনীর মতো।
মানব গোয়েন্দা (হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স বা HUMINT) কার্যক্রমে জড়িত কর্মকর্তারা সাধারণত মানুষের প্রেরণাকে চারটি শব্দে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেন—অর্থ, আদর্শ, জবরদস্তি এবং অহমিকা বা ইগো। মানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই চারটি জায়গা থেকেই মানুষ গুপ্তচরবৃত্তিতে যুক্ত হয়।
সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা জেমস ললার কয়েক দশক বিদেশি গুপ্তচর নিয়োগের কাজ করেছেন। তিনি গোয়েন্দাবিষয়ক ওয়েবসাইট স্পাইসকেপকে (SPYSCAPE) বলেন, তাঁর অভিজ্ঞতা বলে—গুপ্তচর নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ প্রায় কখনোই একমাত্র প্রেরণা ছিল না। বরং, অর্থ ছিল একটি লক্ষ্য পূরণের উপায়। যেমন কোনো তথ্যদাতার সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করা, চিকিৎসার বিল পরিশোধ করা বা জুয়ার ঋণ শোধ করা।
এ ক্ষেত্রের অর্থের পরিমাণও কল্পকাহিনির তুলনায় অনেক কম। সিআইএ–এর গোপন অভিযান শাখার সাবেক কর্মকর্তা ব্যারি ব্রোম্যান বলেন, কোটিপতি গুপ্তচর খুবই বিরল। অধিকাংশ বিদেশি তথ্যদাতা নির্দিষ্ট মাসিক ভাতা পেতেন, যার সঙ্গে কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে অতিরিক্ত বোনাস যোগ হতো। বরং বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন বেশি দেখা যায় উল্টো পরিস্থিতিতে, যখন শত্রু গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মার্কিন নাগরিকদের নিজেদের হয়ে কাজ করতে নিয়োগ দেয়।
এই বৈপরীত্য আদালতের নথিতেও স্পষ্ট। ঋণের ভারে জর্জরিত সাবেক সিআইএ কেস অফিসার কেভিন ম্যালরি চীনা গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৭০০ পাউন্ড বা ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পেয়েছিলেন। পরে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। অন্যদিকে, সিআইএ এখন প্রকাশ্যেই সম্ভাব্য তথ্যদাতাদের আহ্বান জানায়। সংস্থাটি মান্দারিন, ফারসি এবং কোরিয়ান ভাষায় নির্দেশনা প্রকাশ করে চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার হতাশ সরকারি কর্মকর্তাদের নিরাপদে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করছে।
সিআইএ–এর সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় প্রণোদনার ঘটনাটি ঘটেছিল আফগানিস্তানে। ২০০৮ সালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, এক সিআইএ কর্মকর্তা বয়স্ক এক আফগান গোত্রপ্রধানকে উপহার হিসেবে চারটি ভায়াগ্রা বড়ি দেন।
কয়েক দিন পর সেই কর্মকর্তা ফিরে এলে তাঁকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। ওই গোত্রপ্রধান তালেবানের চলাচল ও সরবরাহ পথ সম্পর্কে বিপুল তথ্য দেন। এরপর তিনি আরও ভায়াগ্রা চেয়েছিলেন। অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা অবশ্য সতর্ক করে বলেন, ভায়াগ্রা খুবই বিরল ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো এবং কেবল বয়স্ক উপজাতীয় প্রধানদের ক্ষেত্রেই, যাঁদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল।
এটি ছিল ব্যবহারিক উপহারের দীর্ঘ তালিকার একটি মাত্র অংশ। সেই তালিকায় ছিল পকেট ছুরি, ওষুধ, অসুস্থ আত্মীয়ের অস্ত্রোপচার, স্কুলের সরঞ্জাম, দাঁত তোলা এবং ভ্রমণ ভিসার ব্যবস্থা। অবসরপ্রাপ্ত সিআইএ কর্মকর্তা রবার্ট বেয়ার বলেন, সবচেয়ে সাধারণ প্রণোদনা ছিল স্বাস্থ্যসেবা। তিনি এমন একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন, যেখানে সিআইএ এক সম্ভাব্য তথ্যদাতাকে হার্ট বাইপাস অস্ত্রোপচারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।
যেসব কর্মকর্তা এসব ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, তাঁদের মতে এগুলোকে কখনোই জবরদস্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতো না। যুক্তিটি সহজ। কোনো তথ্যদাতার ব্যক্তিগত প্রয়োজন এমনভাবে পূরণ করা, যাতে তার কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না থাকে। কারণ হঠাৎ করে বিপুল সম্পদের প্রদর্শন একজন তথ্যদাতার পরিচয় ফাঁস করে দিতে পারে, এমনকি তাঁর মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাঁদের মতে, আসল দক্ষতা ছিল কেবল অর্থের থলি খুলে বসা নয়, বরং মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন বুঝে নেওয়া।
গুপ্তচরবৃত্তির গল্পে হীরার যে রোমান্টিক চিত্রটি প্রচলিত, তার মূল উৎস রবার্ট হ্যানসেন। তবে বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝা জরুরি। হ্যানসেন ছিলেন এফবিআই–এর কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা। তিনি মস্কোর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন। তিনি সিআইএর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কোনো বিদেশি তথ্যদাতা ছিলেন না।
এফবিআই-এর হলফনামা অনুযায়ী, সোভিয়েত আমলের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি—পরে যা এসভিআর নাম ধারণ করে—তাঁকে ৬ লাখ মার্কিন ডলার নগদ অর্থ ও হীরা দিয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের হীরা ছিল। পাশাপাশি মস্কোর একটি ব্যাংকে তাঁর নামে আরও ৮ লাখ মার্কিন ডলার সংরক্ষিত ছিল।
হ্যানসেন নিজেই হীরা চেয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে কেজিবির সঙ্গে প্রথম যোগাযোগের সময় তিনি অর্থের পাশাপাশি, তাঁর সন্তানদের জন্য ‘কয়েকটি হীরা’ চেয়েছিলেন। অতএব, হীরা আসলে রাশিয়ার হাতে একজন মার্কিন বিশ্বাসঘাতককে কেনার গল্পের অংশ, যা সিআইএ কোনো বিদেশি কর্মকর্তাকে তথ্য দিতে রাজি করানোর প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নথিভুক্ত তথ্যের আলোকে দেখা যায়, সিআইএর ব্যবহৃত প্রণোদনাগুলো ছিল ঝলমলে নয়, বরং বাস্তবমুখী ও ব্যবহারিক। সব ধরনের চাকচিক্য সরিয়ে দিলে দেখা যায়, সিআইএর গুপ্তচর নিয়োগের প্রকৃত শিল্প হলো ধৈর্যের সঙ্গে একজন মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন বোঝা। সেই প্রয়োজন কখনও একটি অস্ত্রোপচার, কখনও সন্তানের স্কুলের ফি, আবার কখনও মাত্র চারটি ছোট্ট নীল বড়ি।