পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় রেকর্ড পরিমাণ ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—বিজেপি কি ২০২১ সালের ৭৭ আসনের রেকর্ড ভেঙে এবার ১০০-র গণ্ডি পার করতে পারবে?
বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাসে এযাবৎ কোনো প্রধান বিরোধী দল পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে ১০০ আসন পায়নি। ক্ষমতাসীন দলগুলো সব সময় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শাসন করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে তিনটি বিশেষ দিক নজরে আসে। প্রথমত, ১৯৭৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো একটি একক দল নয়, বরং বিভিন্ন দলের ‘জোট’ শাসক দলকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট কংগ্রেসকে, এরপর ২০১১ সালে তৃণমূল-কংগ্রেস জোট ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটায়।
দ্বিতীয়ত, এই জোটগুলো বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগের লোকসভা নির্বাচনে এক নম্বর অবস্থানে ছিল। ১৯৭৭ সালের বিধানসভা জয়ের আগে বামফ্রন্ট জরুরি অবস্থা পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে বিশাল জয় পায়। একইভাবে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৪২টি আসনের মধ্যে ২৬টিতে জয় পাওয়ার পর ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হন।
তৃতীয়ত, ভোটাররা সাধারণত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখেই সিদ্ধান্ত নেন যে প্রধান বিরোধী দল রাজ্য সরকারকে হটানোর সক্ষমতা রাখে কি না। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে কেন্দ্র সরকারের চেয়ে রাজ্য সরকারের প্রভাব অনেক বেশি থাকে বলেই এমনটা ঘটে।
বিজেপির জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা তৃণমূলকে টপকাতে পারেনি। ২৯টি আসনের বিপরীতে তারা পেয়েছে মাত্র ১২টি আসন। ২০১৯ সালে যেখানে তারা ১৮টি আসন পেয়েছিল, সেখান থেকে ওইবার ৬টি আসন কমে। যদিও এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় বিজেপি ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু গত নির্বাচনের পরিসংখ্যান তাদের অনুকূলে নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে বিজেপি যে এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধনের ওপর জোর দিয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুসলিম ও নারী সমর্থকদের ভোট কমিয়ে দেওয়া। ১০ বছরের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতির অভিযোগে অভিযানের পরও বিজেপি তাদের ৩৮ শতাংশ হিন্দু ভোট বাড়াতে পারেনি। সে কারণেই হয়তো এসআইআরের মতো অস্ত্র ব্যবহার করে তৃণমূলের ৪৮ শতাংশ ভোটব্যাংকে আঘাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে বিজেপির এই ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়ায় শুধু মুসলিমরাই নয়; মতুয়া, রাজবংশী, অবাঙালি অভিবাসী এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের একটি অংশও তালিকাচ্যুত হয়েছে। এতে করে বিপুল ভোটার এবং তাঁদের আত্মীয়রা বিজেপির ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম মনে করেন, বিজেপির বড় সীমাবদ্ধতা হলো দীর্ঘদিনের গণ-আন্দোলন করা কোনো নেতার অভাব। তিনি বলেন, জ্যোতি বসু দুই দশকের আন্দোলনের পর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নব্বইয়ের দশক থেকে রাজপথে লড়াই করে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসেন। বিপরীতে বিজেপির প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারী মূলত একজন দলত্যাগী নেতা, যিনি ২০২০ সাল পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই ছিলেন। তাই জনগণের মধ্যে বড় মাপের আস্থা তৈরির মতো রাজনৈতিক পুঁজি তাঁর নেই।
২০১১ সালে ৪ শতাংশ থেকে শুরু করে ২০২১ সালে বিজেপির ভোট ৩৮ শতাংশে পৌঁছানোর মূল কারণ ছিল বাম ও কংগ্রেস ভোটারদের হিন্দুত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়া। কলকাতার প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জাদ মাহমুদ মনে করেন, তৃণমূলের দমনপীড়ন এবং ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সহিংসতার হাত থেকে বাঁচতে ভোটাররা বিজেপিকে একটি ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে বেছে নিয়েছিল। মোদির ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ইমেজ তাদের এই ধারণাকে আরও প্রবল করেছিল।
এবারের নির্বাচনে যদি বিজেপি ১০০ আসন না পায়, তবে তৃণমূল বিরোধী ভোটাররা আবারও বিকল্প কোনো শক্তির সন্ধান করবেন। এই নির্বাচনে বাম ও কংগ্রেস আলাদাভাবে লড়ছে এবং তারা যদি কিছু আসন পায়, তবে বিজেপি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। জাতীয় দল হিসেবে কংগ্রেসের দিকে মুসলিম ভোটাররা ফিরে গেলে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়ের স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধী সারা দেশে জয় পেলেও বাংলা বামদের পাশে ছিল। কিন্তু বাহাত্তরের নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। ২০২৬-এ বিজেপি যদি জয় পায়, তবে তার কৃতিত্ব যতটা না জনসমর্থনের হবে, তার চেয়ে বেশি হবে ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে করা এক নতুন ধরনের কারচুপির।
দ্য হিন্দুর ‘ফ্রন্টলাইন’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আজাজ আশরাফের কলাম অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা