পরিবর্তিত ভূরাজনীতি, একের পর এক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংকট এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার এই যুগে প্রতিবেশী কূটনীতি ও গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা এক অতি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে। বিষয়টি বদলে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলকেও।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার শীর্ষ নেতাদের পরপর চীন সফর বিশ্বজুড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি যৌথ আকাঙ্ক্ষাকেই সামনে এনেছে। সেটি হলো—তারা এখন অবিচল সহযোগিতা আর কাঠামোগত উন্নয়ন অংশীদারত্বকে আরও গভীর করতে চায়। এই সফরগুলো প্রতিবেশী কূটনীতি, দক্ষিণ-দক্ষিণ সংহতি এবং পারস্পরিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অংশীদারত্বের গুরুত্বের প্রতি আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
উচ্চপর্যায়ের এই কূটনৈতিক বিনিময়ের ধারা কেবল দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বকে ঝালিয়ে নেওয়ার গল্প নয়। এরচেয়ে বড় কথা, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ঘটে চলা এক ব্যাপক কৌশলগত পুনর্বিন্যাসকে স্পষ্ট করে তোলে। এই পুনর্বিন্যাসে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মাঝেও দেশগুলো ক্রমশ নিজেদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, বহুমুখী উন্নয়ন সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিশ্চয়তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই সমস্ত কূটনৈতিক তৎপরতার মাঝে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক চীন সফর দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাবসম্পন্ন এক যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে আলাদাভাবে নজর কেড়েছে।
এই ঐতিহাসিক সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবং চীন ব্যাপক ঐকমত্যে পৌঁছেছে। দুই পক্ষই নতুন যুগে এক অভিন্ন ভবিষ্যতের ‘চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়ে তোলার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয়েছে। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে, বিশ্ব শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সমতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চীনের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশ পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এই সামগ্রিক সমর্থন মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক সুশাসন, আধুনিক উন্নয়নের পথরেখা ও পারস্পরিক কল্যাণের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে জাতীয় স্তরে এক গভীর উপলব্ধিরই প্রতিফলন। এটি ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক আস্থা, কৌশলগত ঐক্য ও পারস্পরিক আস্থার ইঙ্গিত দেয়।
আমি বিশেষভাবে লক্ষ করেছি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন—চীনের আধুনিকীকরণ বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিনিময় জোরদার করতে, বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা (বিআরআই) এগিয়ে নিতে এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্য, যোগাযোগ, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ শক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা এবং বিনিময় বাড়াতে আশাবাদী, যা বাংলাদেশকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে চীন সফরে আসা বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দুবার আলাপের সময়েও আমি এই প্রত্যাশা গভীরভাবে অনুভব করেছি।
সম্প্রতি বেইজিং, সাংহাইসহ চীনের একাধিক শহর সফরকারী দুটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আমার ভাব বিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল। তরুণ ও নারী প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় উন্নয়নের অংশীজনদের নিয়ে গঠিত এই দুটি দল বর্তমান বাংলাদেশি সমাজ চীন ও ভবিষ্যতের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে কীভাবে দেখছে, তার একটি অকৃত্রিম চিত্র তুলে ধরেছে।
তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আমি বুঝতে পেরেছি, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমানসংখ্যক তরুণ, পেশাজীবী এবং স্থানীয় নীতিনির্ধারকেরা এখন চীনকে একটি নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছেন, যা বাংলাদেশের আধুনিকায়নের রূপরেখাকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। চীনের বিভিন্ন শিল্পপার্ক, উদ্ভাবন কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও জনশাসন প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শনের সময় বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা কেবল চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখেই মুগ্ধ হননি, বরং দেশটির নিয়মতান্ত্রিক শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, নীতির ধারাবাহিকতা ও জাতীয় উন্নয়নের সুবিন্যস্ত কর্মপন্থা দেখেও গভীরভাবে অভিভূত হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে প্রথাগত সহযোগিতা মূলত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মৌলিক বিনিয়োগ প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের অংশীজনেরা এখন উদীয়মান ও ভবিষ্যৎমুখী খাতগুলোতে সহযোগিতার হাত বাড়াতে ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এর মধ্যে রয়েছে সবুজ উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর, ডিজিটাল অর্থনীতি, শিল্পের আধুনিকায়ন ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। এটি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন প্রকল্পভিত্তিক গণ্ডি পেরিয়ে এক সামগ্রিক, বহুমাত্রিক ও ভবিষ্যৎমুখী কৌশলগত সহযোগিতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখেই এই শক্তিশালী অংশীদারত্বের পথে হাঁটছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশকে এক জটিল আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে চলতে হয় এবং প্রায়শই নানামুখী বাহ্যিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। এই পটভূমিতে সাম্প্রতিক চীন সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের এক স্পষ্ট ঘোষণা। এটি আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে বহুমুখী করার, টেকসই উন্নয়ন সংস্থান নিশ্চিত করার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার আরও সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে দেশটির একটি সচেতন সিদ্ধান্ত।
পরিষ্কার করা দরকার যে, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার এই গভীরতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় কিংবা এটি অঞ্চলের অন্য কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুমাত্রিক সহযোগিতার প্রক্রিয়াকে বাদও দেয় না। উন্মুক্ত আঞ্চলিকতাবাদকে ধারণ করে চীন সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায় এবং দক্ষিণ এশিয়া নিশ্চিতভাবেই একটি পারস্পরিক কল্যাণমুখী বহুমাত্রিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ সক্ষম। মুষ্টিমেয় কিছু পশ্চিমা ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভূরাজনৈতিক সংঘাতের গল্প ছড়িয়ে দিচ্ছে, যেখানে চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বকে ব্লকের রাজনীতি বা জোটের খেলা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ধরনের বাগাড়ম্বর আসলে স্নায়ুযুদ্ধের আমলের পুরোনো ‘জিরো-সাম’ বা পরম প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা থেকে তৈরি, যা দুই দেশের মানুষের যৌথ উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।
বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি চীনের প্রতিবেশী ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে চলমান একটি সামগ্রিক প্রবণতারই প্রতিচ্ছবি। ধীরগতির বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বিপর্যস্ত শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খলের এই সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো একটি অনুমেয় অংশীদারত্ব, আন্তসীমান্ত যোগাযোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির উপায় খুঁজছে। নিরবচ্ছিন্ন উন্মুক্তকরণ, স্থিতিশীল শিল্পশৃঙ্খল ও পরিণত সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে চীন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতির ক্ষেত্রে এক অন্যতম প্রধান ভরসার স্থল হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের অগ্রগতি আন্তসীমান্ত যোগাযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য সংহতি ও বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। যদিও করিডরটি এখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা, শরণার্থী সমস্যা ও স্থানীয় সামাজিক পরিস্থিতির মতো বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তবু বাংলাদেশ ও চীন বহুমাত্রিক সংলাপ এবং ধারাবাহিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সমস্ত বাধা দূর করতে একই রকম সদিচ্ছা পোষণ করে।
বৈশ্বিক পরিবর্তনের এই যুগে উন্নয়নই হলো সব দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সাধারণ ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক চীন সফর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এক সম্পূর্ণ নতুন শুরুর বিন্দুতে নিয়ে গেছে, যা স্বাধীনভাবে এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। একদিকে যখন অভিন্ন ভবিষ্যতের ‘চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’র ভিত্তি মজবুত হচ্ছে, অন্যদিকে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরও ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। এর ফলে চীন ও বাংলাদেশ যৌথভাবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংহতিকে আরও গতিশীল করবে, এই চঞ্চল ও অস্থিতিশীল পৃথিবীতে উন্নয়ন আর নিশ্চয়তার নতুন হাওয়া বইয়ে দেবে এবং গ্লোবাল সাউথজুড়ে ঐক্য ও আত্মোন্নয়নের এক স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করবে।
লেখক: চেন ছিংছিং, গ্লোবাল টাইমসের নিউজ ডেস্কের ডেপুটি ডিরেক্টর।