ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধ চার মাসে পদার্পণ করেছে। শান্তি আলোচনা নিয়ে দুই পক্ষ এখনো অচলাবস্থায়। এর মধ্যেই ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা কমানোর পক্ষে ভোট দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ।
গত বুধবারের (৩ জুন) এই ভোটকে ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের প্রথম সফল প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া—এই যুদ্ধের বহুমাত্রিক বিপর্যয় ঠেকাতেই আইনপ্রণেতারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে বিরোধ বেড়েছে। কারণ যুদ্ধটি খোদ মার্কিন নাগরিকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে দ্রুত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতেও ব্যর্থ হয়েছেন।
তবে এই ভোট আপাতত একটি ‘প্রতীকী’ জয় হিসেবেই থাকবে। কারণ, আইন পাসের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নিজের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এবং মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও, আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের নীতিমালার বিরুদ্ধে এটিকে একটি বড় ধরনের অনাস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত বুধবার ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি পরিষদের আইনপ্রণেতারা ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ বা যুদ্ধক্ষমতা কার্যকরের পক্ষে ভোট দেন। ১৯৭৩ সাল থেকে কার্যকর থাকা এই আইন অনুযায়ী, বিদেশে কোনো সশস্ত্র সংঘাত বা যুদ্ধ শুরু করার আগে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই আইনপ্রণেতাদের (কংগ্রেস) অনুমোদন নিতে হয়। কেবল আমেরিকার ওপর কোনো আসন্ন বা আকস্মিক হামলা হলে প্রেসিডেন্ট এককভাবে সেনা মোতায়েন করতে পারেন, তবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা কংগ্রেসকে জানাতে হয়। এরপর কংগ্রেস যদি যুদ্ধ ঘোষণা না করে, তবে যুদ্ধ শুরুর ৬০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হয়।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের যুক্তি হলো—আমেরিকার ওপর কোনো আসন্ন হুমকি ছিল না, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই প্রথমে আঘাত হেনেছিল। উপরন্তু, ৬০ দিনের সময়সীমা (যা গত ২৯ এপ্রিল পার হয়েছে) পেরিয়ে যাওয়ার পরও ট্রাম্প যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যালঘু ডেমোক্র্যাটরা এই আইন কার্যকরের জন্য তিনবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তবে চতুর্থবারের চেষ্টায় গত বুধবারের ভোটে তাঁরা সফল হন।
ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতাকে সংকুচিত করার এই প্রস্তাবের পক্ষে ২১৫টি ভোট পড়ে এবং বিপক্ষে পড়ে ২০৮টি ভোট। ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যের মূল কারণ ছিল ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির চারজন আইনপ্রণেতার দলবদল। যুদ্ধের শুরুতে রিপাবলিকানরা প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে সমর্থন দিলেও, মার্কিন অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগায় এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ায় দলের ভেতরের সুর বদলে গেছে।
দুই সপ্তাহ আগের ভোটে মিশিগানের টম ব্যারেট, ওহাইওর ওয়ারেন ডেভিডসন এবং কেনটাকির থমাস ম্যাসি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। গত বুধবার তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক।
না, এখনই নয়। প্রস্তাবটি কার্যকর হতে হলে উচ্চকক্ষ সিনেটেও এটি পাস হতে হবে, রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধ বন্ধের জন্য জোর দিলেও রিপাবলিকানরা এখন পর্যন্ত তা ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন। দুই সপ্তাহ আগে ১০০ সদস্যের সিনেটে এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ৫০-৪৭ ভোটে বাতিল হয়ে যায়। সেখানে চারজন রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিলেও পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন।
যদি কোনোভাবে সিনেটেও এটি পাস হয়ে যায়, তবুও ট্রাম্পের সামনে ভেটো দেওয়ার সুযোগ থাকবে। সেই ভেটো বাতিল করে আইন পাস করতে গেলে কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রায় অসম্ভব। কারণ রিপাবলিকানদের একটি অংশ অসন্তুষ্ট হলেও দলটির বড় অংশ এখনো প্রকাশ্যে ট্রাম্পকেই সমর্থন করছে।
প্রতিনিধি পরিষদের এই প্রস্তাব আদৌ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে আরেকটি আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি—যুদ্ধবিরতি চলায় আমেরিকা টেকনিক্যালি এখন কোনো যুদ্ধে লিপ্ত নেই। গত ১ মে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, যুদ্ধবিরতির অর্থ হলো শত্রুতার অবসান। তবে এরপরেও মার্কিন বাহিনী ইরানের বন্দরে নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে এবং ইরানি জাহাজে হামলাও করেছে। পাল্টা হামলায় তেহরানও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মঙ্গল ও বুধবার কংগ্রেসের শুনানিতে এই যুক্তিই তুলে ধরেন। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর অপহরণ করার ঘটনা এবং ইরানের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়ে শুনানিতে আইনপ্রণেতারা রুবিওকে তলব করেছিলেন। সেখানে ডেমোক্র্যাট সিনেটর কোরি বুকারের সঙ্গে এক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে রুবিও বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ শেষ।’
তবে সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য জেন শাহীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দাবিকে জবাবদিহি এড়ানোর চেষ্টা বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে হামলা চালাচ্ছিল এবং ইরান যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন দূতাবাস ও ঘাঁটিতে বোমা মারছিল, তখন আপনি কংগ্রেসকে বলেছিলেন আমরা কোনো সক্রিয় যুদ্ধে নেই। এটি কোনো আলোচনা ছিল না, এটি ছিল যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের কাছে জবাবদিহি এড়ানোর একটি অপচেষ্টা।’
ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করেন, যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার পূর্ণ আইনি অধিকার তাঁদের রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত ১২ মে সিনেটের এক কমিটিতে দাবি করেন, ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্টের অধীনে প্রেসিডেন্টকে যে ৬০ দিনের সুযোগ দেওয়া হয়, সেটি গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ‘রিসেট’ বা নতুন করে গণনা শুরু হয়েছে। ফলে কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রশাসন চাইলে ইরানে আবার নতুন করে হামলা শুরু করতে পারবে। হেগসেথ স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট যদি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি কর্তৃত্ব আমাদের হাতে রয়েছে।’
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা