খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারের অন্যতম প্রধান ভরসা। এটি তুলনামূলক সস্তা, সহজে স্থানান্তরযোগ্য, নির্ভুল এবং এর পাল্লা ন্যূনতম ৯০০ মাইল। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান জটিল ধরনের হামলায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের বিপরীতে এক অভিযোজনক্ষম (অ্যাডাপ্টিভ) প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছে।
চলতি মাসের শুরুতে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর দিকে খাইবার শেকান নিক্ষেপ করছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান বিভিন্ন ধরনের উড্ডয়নপথ, কৌশলগত গতিবিধি (ম্যানুভার) এবং ভিন্ন ভিন্ন গতি একসঙ্গে ব্যবহার করছে, যাতে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা পুরো যুদ্ধজুড়ে অধিকাংশ খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতেও সক্ষম হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মতো খাইবার শেকান উৎক্ষেপণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হয় না। এগুলো আগে থেকেই জ্বালানিপূর্ণ অবস্থায় রাখা যায় এবং খুব দ্রুত ট্রাক বা অন্য যানবাহনে তুলে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংসের উদ্দেশ্যে অভিযান চালানো মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের নজর এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটির কিছু সংস্করণে বিস্ফোরক ওয়ারহেড বহনকারী নাকের অংশটি চূড়ান্ত পর্যায়ে মূল ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই অংশে একটি ছোট ইঞ্জিন সংযুক্ত থাকে, যার ফলে এটি ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার মাইল বা প্রায় ৯ হাজার ৭০০ কিলোমিটার বেগে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধাবিত হওয়ার সময় নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বা মহাকাশসীমায় উঠে পরে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পুনরায় নেমে আসে। তবে সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা রাখে না। খাইবার শেকান নিয়ে গবেষণা করা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি অন্যান্য কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে, যাতে এটি শনাক্ত ও ধ্বংস করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান একই সঙ্গে উচ্চগতির আক্রমণাত্মক ড্রোন এবং অপেক্ষাকৃত কম উন্নতমানের ক্ষেপণাস্ত্রও একই লক্ষ্যবস্তুর দিকে নিক্ষেপ করছে, যেগুলোতে স্যাটেলাইট-নিয়ন্ত্রিত খাইবার শেকানও ব্যবহার করা হচ্ছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান ধারাবাহিকভাবে তাদের কৌশল পরিবর্তন ও উন্নত করেছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর সেই আবাসন এলাকাগুলোকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করেছে, যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করেন। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত রাডারগুলোতেও হামলা চালিয়েছে ইরান। কর্মকর্তাদের মতে, এই কৌশল মার্কিন সেনাসদস্যদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত আর্মি জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি আমাদের জানিয়ে দেয় যে—ইরান সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তারা শিখছে এবং আমাদের বিরুদ্ধে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে আঘাত হানা যায়, সেই পথ খুঁজছে। এটি এমন একটি সামরিক বাহিনী, যার অত্যন্ত উন্নত ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট কর্মসূচি চালু রয়েছে। এই ক্ষেত্রে তাদের বিপুল দক্ষতা রয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের হাতে খাইবার শেকানসহ অন্যান্য মাঝারি পাল্লার প্রায় ২ হাজার ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। স্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিনৎস বলেন, ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে সংরক্ষিত যন্ত্রাংশ থেকে ইরান হয়তো আরও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। তবে যেসব উৎপাদনকেন্দ্রে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন তৈরি হতো, সেগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো-তে ইরানের কৌশল নিয়ে গবেষক নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, ‘যুদ্ধ চলাকালে ইরানিরা বুঝে গেছে যে খাইবার শেকান দারুণ কার্যকর, কারণ এটি উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে সস্তা, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নমনীয় এবং কার্যকারিতাও বেশ ভালো।’
ইরান ইসরায়েলের দিকেও খাইবার শেকান নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলের দাবি, তারা এর অধিকাংশই ভূপাতিত করেছে। ইরান আরও দাবি করেছে, তারা খাইবার শেকান ব্যবহার করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এবং ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর প্রধানের সদরদপ্তরকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। গত মাসে ইরান জেটচালিত ড্রোনের সঙ্গে খাইবার শেকান ব্যবহার করে আরও একটি হামলার ঘোষণাও দেয়। তবে ওই হামলাগুলোর প্রকৃত ফলাফল নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের নামকরণ করা হয়েছে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের খাইবারের যুদ্ধের নামে। ওই অভিযানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাহিনী আরবের ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণাধীন সুরক্ষিত খাইবার মরূদ্যান দখল করেছিল।
ইরান খাইবার শেকানের উৎপাদন ব্যয় প্রকাশ করেনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র (ইন্টারসেপ্টর) ব্যবহার করে, তার তুলনায় খাইবার শেকান অনেক সস্তা। ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে একটি ইন্টারসেপ্টরের মূল্য প্রায় ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে।
ফ্যাবিয়ান হিনৎসের মতে, ইরান সম্ভবত আগের হামলাগুলো বিশ্লেষণ করে বুঝতে পেরেছে কীভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ করার সম্ভাবনা আরও বাড়ানো যায়। এ কারণেই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কার্যকারিতা উন্নত হয়েছে। হিনৎস বলেন, ‘ইরান বুঝে গেছে কোন ধরনের ম্যানুভার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর। প্রতিটি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার থেকে কিছু না কিছু তথ্য পাওয়া যায়, আর সেই তথ্য ইরানিদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।’
তিনি আরও বলেন, ইরান বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে খাইবার শেকান উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে, যাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।