মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাভোসে তথাকথিত বোর্ড অব পিস বা শান্তি পরিষদের সনদে স্বাক্ষর করার পর এক সপ্তাহও পেরোয়নি। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের বাস্তব আশঙ্কায় একেবারে উত্তপ্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
এই অনুভূতি নতুন নয়। গত রোববার মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ইরানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছে জর্ডানে, আর বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়েছে কাতারে।
ইসরায়েলের চ্যানেল-১৩ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজেদের স্থলভিত্তিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একটি থাড (টিএইচএএডি) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল হায়োম, যা দেশটির সরকারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ দৈনিক হিসেবে পরিচিত, জানিয়েছে, হামলার ঘটনা ঘটলে জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দেবে। এরপরই ইউএই প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়, তারা ‘ইরানের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক সামরিক কর্মকাণ্ডে তাদের আকাশসীমা, ভূখণ্ড বা জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না...এবং কোনো ধরনের লজিস্টিক সহায়তাও দেবে না।’
তবে ইরান এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দেবে না বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আগেই সতর্ক করেছেন, ইউএই ইতিমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আরেকটি হামলা হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কেবল ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতেই পাল্টা আঘাত সীমাবদ্ধ রাখবে না।
গত বছর এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছিলেন, ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে তাদের নোংরা যুদ্ধে আজারবাইজান ও ইউএইকে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই এই যুদ্ধের আরেকটি পর্বের অপেক্ষায় আছি। এবার ইরান আর হঠাৎ আঘাতে ধরা পড়বে না কিংবা আত্মরক্ষামূলক অবস্থায় থাকবে না। আমরা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় যাব।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউএইকে এর বড় মূল্য দিতে হবে। পরবর্তীবার যখন আমাদের ওপর হামলা হবে, তা উপসাগরীয় অঞ্চল এবং পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।’
গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন সেই যুদ্ধ চলে ১২ দিন। তেহরান তখন বিভ্রান্ত ছিল। কারণ, ওমানে সম্ভাব্য আলোচনার আশ্বাসে তারা বিশ্বাস করেছিল, তার আগেই ইসরায়েল হামলা চালাবে না। সে সময় হোয়াইট হাউস দাবি করেছিল, এই হামলার লক্ষ্য সরকার পরিবর্তন নয়। হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত গভীর বাংকারগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছিল।
কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে সরকার পরিবর্তন চাইছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করলে ‘সংঘাত বাড়বে না, বরং সংঘাতের অবসান ঘটবে।’ তবে হোয়াইট হাউস এই অবস্থান থেকে সরে আসে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর চেয়ে বেশি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনি যাকে চেনেন সেই আয়াতুল্লাহ বনাম যাকে চেনেন না সেই আয়াতুল্লাহ—এটাই আসল বিষয়।’ কিন্তু এবার সেই দ্বিধা আর নেই। এবার সর্বোচ্চ নেতা নিজেই প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
সম্প্রতি ইরানে বিক্ষোভ দমনের সময় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। কতজন নিহত হয়েছে, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। ইরান সরকার গত সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১০০-এর কিছু বেশি বলে জানায়। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব উদ্ধৃত করে বলেছে, প্রকৃত সংখ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি।
এই আন্দোলন শুরু হয় ডিসেম্বরে। সে সময় তেহরানের ব্যবসায়ীরা ইরানি রিয়ালের ধস এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। দ্রুতই তা অন্যান্য শহর ও দরিদ্র শ্রমজীবী এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্পষ্ট হয়—দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায় সারা দেশে ক্ষোভ ও হতাশা জমে উঠেছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি কয়েক বছর আগে দেখা গিয়েছিল, যখন মাশা আমিনি নামে ২২ বছর বয়সী এক ইরানি কুর্দি তরুণী পুলিশের হেফাজতে মারা যান। তাঁকে ইসলামি পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে তথাকথিত ‘নৈতিকতা পুলিশ’ আটক করেছিল। তবে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষোভ যে বাস্তব এবং গভীর, তা স্বীকার করলেও এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে পশ্চিমা ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই আগুনে ঘি ঢেলেছে। এই দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়।
ইরানের গভীর অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং ট্রাম্পের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করেন, যা পরবর্তী ডেমোক্র্যাট বাইডেন প্রশাসনও বজায় রাখে। গাজার গণহত্যার মতোই, ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার নীতি যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলেরই সমর্থিত। অথচ এই নীতির প্রধান ভুক্তভোগী সেই ইরানি জনগণ, যাদের কল্যাণের কথা পশ্চিমা দেশগুলো বলে থাকে।
মানুষকে হতাশার মধ্যে ঠেলে দিয়ে, তারপর সেই হতাশাকে গোটা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা—মোসাদ, সিআইএ বা এমআই৬-এর জন্য নতুন কিছু নয়। অর্থনৈতিক আন্দোলনকে সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ দেওয়ার চেষ্টাও নতুন নয়। তবে এবার যা ভিন্ন, তা হলো, তারা তাদের উপস্থিতি লুকানোর প্রায় কোনো চেষ্টাই করেনি।
মোসাদ তাদের সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবেই প্রকাশ করে। ২৯ ডিসেম্বর ফারসি ভাষায় এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তারা ইরানিদের বিক্ষোভে নামার আহ্বান জানায় এবং এমনকি বলে, তারা শারীরিকভাবেও বিক্ষোভে উপস্থিত আছে। মোসাদ লিখেছে, ‘একসঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে আসুন। সময় এসে গেছে। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। শুধু দূর থেকে বা কথায় নয়। আমরা মাঠে আপনাদের সঙ্গে আছি।’
এটি একাই পুলিশের হাতে ব্যাপক প্রাণহানির সংখ্যা ব্যাখ্যা করতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল-ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কগুলো বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ করে, নাশকতা ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালিয়ে সংঘর্ষ ও প্রাণহানি বাড়িয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের এই কৌশল ব্যর্থ হয়, যখন কয়েক লাখ মানুষ সরকারপন্থী সমাবেশে অংশ নেয়, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তার আগেই পশ্চিমা গণমাধ্যমে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে ইরানের সরকার পতন এখন একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যু। একই সঙ্গে দাবি তোলা হয়, বিরোধীদের সম্ভাব্য নেতা হতে পারেন ইরানের শেষ শাহের ৬৫ বছর বয়সী ছেলে রেজা পাহলভি।
ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানান। পডকাস্ট উপস্থাপক হিউ হিউইট তাঁকে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাঁকে দেখেছি, তিনি ভালো মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সঙ্গে দেখা করা ঠিক হবে কি না, আমি নিশ্চিত নই।’ এটিকে ভেনেজুয়েলার মতো একটি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অর্থাৎ যদি ট্রাম্প খামেনিকে সরিয়ে দিতে পারেন, তবে তিনি বিদ্যমান প্রশাসনের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও বহুবার এই পথ ধরে হেঁটেছে। কিন্তু এবার ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে দুর্বল করার আগের সব প্রচেষ্টার সঙ্গে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সুন্নি আরব বিশ্ব মনে করত, তারা ইরানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিস্তৃত নেটওয়ার্কের প্রধান লক্ষ্য। এই নেটওয়ার্ক ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় বিভিন্ন সময় ভয়াবহ প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়েছে। কিন্তু এখন সেই সুন্নি আরব বিশ্বই ধীরে ধীরে ইরানের দিকে ঝুঁকছে। এটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি কোনো আবেগময় সমর্থনের কারণে নয়, কিংবা হঠাৎ করে ধর্মীয় সহনশীলতার জোয়ারও নয়। বিষয়টি মূলত তেলসম্পদ রক্ষার প্রশ্নও নয়, যদিও সেগুলো প্রতিশোধমূলক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এই মনোভাবের পরিবর্তন আসলে আরব জাতীয় স্বার্থ—সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উপলব্ধির ফল। ক্রমেই ইরানকে এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যে একই লড়াই লড়ছে, যেটি আরব রাষ্ট্রগুলো আধিপত্য ও দখলদারির বিরুদ্ধে লড়ছে। আরব দেশগুলোর মধ্যেও এই আশঙ্কা রয়েছে, ইসরায়েল ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের সামরিক আধিপত্যকারী শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে হাঁটছে। আর প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে খণ্ডিত করাই সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে দ্রুত উপায়।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে নাটকীয় অবস্থান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে সৌদি আরবে। এক দশক ধরে সৌদি আরব ছিল ইরানবিরোধী কৌশলের প্রধান ঘাঁটি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার ঠিক আগের দিন সৌদি আরব প্রায় আব্রাহাম চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছিল, যার মাধ্যমে দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করত। কিন্তু আজ সেই উদ্যোগ পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, সৌদি গণমাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র ও আক্রমণাত্মক প্রচারণা শুরু হয়েছে।
একটি বিশেষ নিবন্ধ এমন ছিল, যা শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া প্রকাশ ও পুনঃপ্রকাশ হওয়া সম্ভব নয়। সাধারণ পরিস্থিতিতে সৌদি শিক্ষাবিদ আহমেদ বিন ওসমান আল-তুয়াইজরির লেখা আল জাজিরা পত্রিকার কলাম বিভাগে প্রকাশিত হওয়াই বিস্ময়কর হতো। কারণ, আল জাজিরা সরকারি মুখপত্র এবং তুয়াইজরি নিজে নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত। যে সরকার রাজনৈতিক ইসলামের সঙ্গে যুক্ত সৌদি শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একাধিক শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছে, সেই সরকারের আমলে তুয়াইজরির লেখা প্রকাশ পাওয়াটাই তাৎপর্যপূর্ণ।
ওই কলামে তুয়াইজরি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) অভিযুক্ত করেন ‘জায়নবাদের কোলে উঠে পড়ার’ জন্য এবং বলেন, ইউএই ‘আরব বিশ্বে ইসরায়েলের ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করছে—এই আশায় যে একে সৌদি আরব ও বড় আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। তিনি একে আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সা.) এবং পুরো জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলেও আখ্যা দেন।
তুয়াইজরি আরও বলেন, ইউএই লিবিয়াকে খণ্ডিত করেছে, সুদানে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে ‘অরাজকতা ছড়িয়েছে’ এবং তিউনিসিয়ায় ‘পোকামাকড়ের মতো অনুপ্রবেশ করেছে।’ তিনি দাবি করেন, ইউএই ইচ্ছাকৃতভাবে ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড রেনেসাঁ ড্যাম প্রকল্পকে সমর্থন দিচ্ছে, যদিও এটি নীল নদের নিম্নপ্রবাহে পানির স্তর কমিয়ে মিসরের কৌশলগত স্বার্থে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে।
এসব অভিযোগ সত্য হলেও সৌদি আরবের মতো দেশ থেকে—যে দেশটি ইউএইয়ের সঙ্গে মিলে আরব বসন্ত দমনে পাল্টা বিপ্লব চালিয়েছিল—এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত শক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ। আবুধাবি এর জবাবে ওয়াশিংটনে নিজেদের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে। অ্যাক্সিওসের সাংবাদিক বারাক রাভিদ এক্সে লেখেন, নিবন্ধটি শুধু ইসরায়েলবিরোধী নয়, বরং ইহুদিবিদ্বেষী।
এরপর অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ (এডিএল) জানায়, তারা উদ্বিগ্ন যে ‘সৌদি আরবের বিশিষ্ট কণ্ঠগুলো—বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও ধর্মীয় বক্তারা ক্রমবর্ধমানভাবে প্রকাশ্য ইহুদিবিদ্বেষী ইঙ্গিত ব্যবহার করছে এবং আগ্রাসীভাবে আব্রাহাম চুক্তিবিরোধী বক্তব্য ছড়াচ্ছে, একই সঙ্গে ‘জায়নিস্ট ষড়যন্ত্র’ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করছে।’
এই বিতর্ক যখন চরমে পৌঁছায়, ঠিক তখনই নিবন্ধটি ইন্টারনেট থেকে উধাও হয়ে যায়। এডিএল দাবি করে, তাদের পোস্টের পরপরই এটি সরানো হয়েছে। তবে এখানেই ঘটনার শেষ হয়নি। কিছু সময়ের মধ্যেই নিবন্ধটি আবার আল জাজিরার ওয়েবসাইটে ফিরে আসে। ‘কলম্বাস’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট, যাকে সাধারণভাবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মিডিয়া উপদেষ্টা সৌদ আল-কাহতানির কণ্ঠ হিসেবে ধরা হয়—এক্সে লেখে, ‘সমঝোতাকারী আমিরাতের কিছু মানুষ (আল্লাহ তাদের সংশোধন করুন) মিথ্যা প্রচার করছে যে আল-তুয়াইজরির সৌদি নিবন্ধটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভয়ে আল জাজিরা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এটি সত্য নয়; নিবন্ধটি এখনো আছে।’ এই পুরো ঘটনার একমাত্র যুক্তিসংগত উপসংহার হলো, তুয়াইজরির বক্তব্য আসলে সৌদি রাষ্ট্রেরই আনুষ্ঠানিক অবস্থান প্রতিফলিত করে।
গাজার প্রভাব পুরো অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে। গাজায় হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের জন্য এটি ছিল সামরিক পরাজয়। কিন্তু ‘গাজা ইফেক্ট’ মোটেও পরাজয়ের গল্প নয়। গাজাকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু বারবার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে গড়ে তুলবেন। তিনি বহুবার বলেছেন, তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছেন’ এবং এই সংঘাত হলো ‘পুনর্জন্মের যুদ্ধ।’
ইসরায়েলের খণ্ডিতকরণ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল—সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর যেন সিরিয়া আর কখনো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পুনরুত্থিত হতে না পারে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিরিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বোমা হামলা চালান নেতানিয়াহু। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিরিয়ার বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এরপর দ্রুজদের জন্য একটি ‘রক্ষিত অঞ্চল’ তৈরির অজুহাতে ইসরায়েলি ট্যাংক দক্ষিণ সিরিয়ায় প্রবেশ করে, যা শুরুতে দ্রুজ নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিল। ইসরায়েল উত্তর সিরিয়ায় কুর্দিদের ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার প্রস্তাবও দেয়। কিন্তু গত সপ্তাহেই সেই প্রস্তাব যে কতটা ফাঁপা ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হলে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) নাটকীয়ভাবে ভেঙে পড়ে এবং দামেস্ক আবারও সিরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এসডিএফের একসময়ের পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্র এই বিপর্যয় ঠেকাতে একটি আঙুলও নাড়ায়নি, আর কুর্দিদের সাহায্যের আবেদনেও কোনো সাড়া দেয়নি ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের আগে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম বারাক অভিযোগ করেন, এসডিএফ কমান্ডার মাজলুম আবদি ইচ্ছাকৃতভাবে ইসরায়েলকে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িয়ে নিতে চাইছেন।
অঞ্চলটি যে বদলাচ্ছে, তা সত্য। তবে এই পরিবর্তন ঠিক সেভাবে নয়, যেমনটি একসময় কল্পনা করেছিলেন নেতানিয়াহু। এক দশকের গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়ায় আসাদ শাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা তখন স্পষ্ট বার্তা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চান না। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সিরিয়ার জনমত আমূল বদলে গেছে। কারণ, ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর আগ্রাসন ও ঔদ্ধত্য। তারা শুধু দখল করা গোলান মালভূমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে না, বরং তাদের সেনারা এখন দামেস্ক থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে।
এখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই সিরিয়ায় জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে, যেমনটি পুরো অঞ্চলজুড়েই দেখা যাচ্ছে। আসাদকে উৎখাত করার সময় যে সতর্কতা ও কৌশলগত দূরদর্শিতা শারা দেখিয়েছিলেন, তিনি এখনো সেই পথেই এগোচ্ছেন। উত্তর সিরিয়ায় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে শারা একটি ফরমান জারি করেন। সেখানে কুর্দি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সব কুর্দি সিরিয়ানের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল করা হয়।
নতুন সামরিক চুক্তির আভাসও মিলছে। ইসরায়েল এগুলোর একটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলে অভিহিত করছে। কিন্তু বাস্তবে এটি তেমন কিছু নয়। এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে অঞ্চলের মুসলিম মধ্যম শক্তিগুলোর একটি উপলব্ধি—ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একমাত্র উপায় হলো পারস্পরিক প্রতিরক্ষার মাধ্যমে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। কারণ তারা দেখেছে, ইসরায়েল কীভাবে একে একে শত্রুদের আলাদা করে আঘাত হানছে, এটাই তাদের শেখা শিক্ষা।
অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীর অধিকারী তুরস্ক বর্তমানে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসর এখন প্রকাশ্যেই সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানকে সমর্থন দিচ্ছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বিভাজন আরও গভীর করতে সৌদি আরব শিগগির সুদানের স্বর্ণ কিনতে যাচ্ছে। এতে আফ্রিকায় আবুধাবির স্বর্ণ-বাণিজ্য সীমিত হবে, যদিও পুরোপুরি বন্ধ হবে না। এসবই প্রমাণ করে, অঞ্চলটি সত্যিই বদলাচ্ছে—কিন্তু নেতানিয়াহু যেভাবে ভেবেছিলেন, সেভাবে নয়। তিনি একাধিক ফ্রন্টে ব্যর্থতার মুখে পড়েছেন। গাজা বা অধিকৃত পশ্চিম তীর, কোথাও তিনি ব্যাপক জনসংখ্যা স্থানান্তর ঘটাতে পারেননি। অথচ বোমাবর্ষণ থেকে শুরু করে অনাহার, তার সব নীতির লক্ষ্যই ছিল সেই স্থানান্তর ঘটানো।
তিনি সিরিয়াকে খণ্ডিত করতেও ব্যর্থ হয়েছেন। বরং উল্টো ফল হয়েছে, ইসরায়েল সিরিয়াকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছে। তিনি বিচ্ছিন্ন সোমালিল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি গড়তে পারেননি, এবং এখন সোমালি সরকারের প্রকাশ্য বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। গাজা ইস্যুতে তিনি মিসরের সমর্থন হারিয়েছেন, আর পশ্চিম তীর নিয়ে হারিয়েছেন জর্ডানের সমর্থন। কারণ, এই দুই দেশই ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ঢলকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।
নেতানিয়াহুর শেষ বড় জুয়া হতে পারে আবারও ইরানে হামলা। তবে তার প্রধান মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত অনেকটাই প্রভাব হারিয়েছে, বিশেষ করে ইয়েমেন থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর।
ইরানে হামলা হলে তিনটি সম্ভাব্য পথ সামনে আসতে পারে। প্রথমটি হলো, ইরানি নেতৃত্বকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করা এবং বেঁচে যাওয়া অভিজাতদের ভয় দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আনা। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হবে না। খামেনির উত্তরসূরি কোনো আয়াতুল্লাহ হলে, তিনি নিশ্চয়ই আরও দৃঢ়ভাবে ইরানের হাতে একমাত্র প্রতিরোধক্ষম অস্ত্র (পারমাণবিক বোমা) তোলার চেষ্টা করবেন।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, রাষ্ট্র ভেঙে পড়লে পাহলাভির অধীনে একটি ইসরায়েলি আশ্রিত রাষ্ট্র গঠন। এটিও বাস্তবসম্মত নয়। ইরানে পাহলভির প্রায় কোনো জনসমর্থন নেই। আর যদি তাকে ক্ষমতায় বসানো হয়, তিনি তার বাবার চেয়েও বেশি ইসরায়েলের ক্রীড়নকে পরিণত হবেন। কিন্তু তৃতীয় এবং সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো, রাষ্ট্র ভেঙে পড়লে ইরানে গৃহযুদ্ধ ও খণ্ডিত অবস্থা সৃষ্টি হবে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক ইরানি উত্তর ও পশ্চিম দিকে, বিশেষ করে সৌদি আরব ও তুরস্কে আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে। এতে পুরো অঞ্চল ভয়াবহভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
সৌদি আরবের আধুনিকায়নের স্বপ্ন এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়বে। এমন ধসের পর কোনো প্রতিবেশী দেশই শান্তিতে থাকতে পারবে না। তুরস্ক ইতিমধ্যে সীমান্ত রক্ষার পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে লাখ লাখ ইরানি দেশটিতে ঢুকে পড়তে না পারে। এই বাস্তবতায় ইরান সরকার এসব ঘটনাকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে—এটাই স্বাভাবিক। আর অঞ্চলজুড়ে যারা অতীতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছে, তাদের সবাইকেই ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও দেশটিকে টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত।
নেতানিয়াহু ইরানে হামলার পরিকল্পনা করছেন, কারণ তাঁর নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের টিকে থাকার লড়াই আসলে পুরো অঞ্চলের টিকে থাকার লড়াই। এই সত্য কোনো আরব শাসকেরই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
লেখক: ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের এডিটর ইন চিফ ও সহপ্রতিষ্ঠাতা
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান