যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একাধিকবার অতিরঞ্জিতভাবে দাবি করেছিলেন, তাঁরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে ‘চূর্ণবিচূর্ণ’, ‘ধ্বংস’ কিংবা ‘সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক সংক্ষিপ্ত পাল্টাপাল্টি হামলা ঘটনাটি দুই দেশের বর্তমান শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে অনেক বেশি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
লেবাননের রাজধানী বৈরুদের দক্ষিণ উপশহর দাহিয়েতে নতুন করে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের জবাবে ইসরায়েলে প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। এই হামলার মাধ্যমে ইরান এমন এক কাঠামো ভেঙে দেয়, যা ইসরায়েল লেবানন ও গাজায় হওয়া আগের দুটি যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই কাঠামোর মূল কথা ছিল—তোমরা যুদ্ধ থামাবে, কিন্তু আমরা হামলা চালিয়ে যাব।
এর পাশাপাশি, ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে—লেবাননকে রক্ষা করার জন্য তারা উত্তর ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে প্রস্তুত। এটিও এক অর্থে নজিরবিহীন ঘটনা। পরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে গিয়ে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব জানায়, ইসরায়েল যদি আবারও লেবাননসহ অন্য কোথাও হামলা শুরু করে, তাহলে ‘আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও বিধ্বংসী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
গাজা, লেবানন এবং ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে একই যুদ্ধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে এবং করানোতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কিছুটা সময় লেগেছে। কিন্তু বাস্তবে এটি অভিন্ন যুদ্ধই ছিল এবং অবশেষে ইরানকে সে বাস্তবতা মেনে নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হতে হয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধের অংশ অন্য কেউই এই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না। বিশেষ করে সবচেয়ে কম জানাচ্ছে লেবানন সরকার।
ইরান ও হিজবুল্লাহ যদি সম্মিলিতভাবে লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের আংশিক হলেও পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে, তাহলে নিজেদের নাগরিকদের বাড়ি ফেরানোর ক্ষেত্রে তারা লেবাননের প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। হিজবুল্লাহবিষয়ক গবেষক আমাল সাদ বলেন, লেবাননের প্রতিনিধিরা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, তা রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের এমন এক শ্রেণিতে পড়ে যার নজির ইতিহাসে খুবই বিরল।
সাদ লিখেছিলেন, ‘আক্রমণের শিকার একটি রাষ্ট্র হিসেবে লেবানন এমন একটি নথিতে স্বাক্ষর করেছে, যেখানে যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে দখলদার শক্তির সেনা প্রত্যাহার নয়, বরং নিজেদের নাগরিকদেরই নিজ ভূমি থেকে সরে যাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’
এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, বন্দি বিনিময় কিংবা বাস্তুচ্যুত জনগণের প্রত্যাবর্তনের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং এর প্রধান শর্ত ছিল দক্ষিণাঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহর সরে যাওয়া। তাই নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ যে সব ফ্রন্টে বিজয়ের দাবি করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল প্রমাণ করেছে যে—তারা একই সময়ে তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিচালনা করতে সক্ষম। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি সীমারেখা পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার কথা বলেছেন, যা গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা দখলের সমতুল্য হবে।
কাৎজ গাজা উপত্যকার ব্যাপক জাতিগত নির্মূল অভিযানের প্রতি নিজের প্রতিশ্রুতির কথাও বলেছেন। তাঁর ভাষায়, বড় পরিসরের ‘স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন’ বা গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ কার্যক্রম ইসরায়েল ‘উপযুক্ত সময়ে এবং উপযুক্ত পদ্ধতিতে’ বাস্তবায়ন করবে। কাৎজ আরও বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সেই একই কৌশল ব্যবহার করছে, যা তারা গাজায় প্রয়োগ করেছে। সহজ ভাষায় তারা উভয় অঞ্চলে পুরো শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
নেতানিয়াহু ও কাৎজ দুজনেই এমনভাবে কথা বলছেন যেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান গণহত্যা মামলায় নিজেদের বিরুদ্ধে প্রমাণ তৈরি হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁদের কোনো ভয় নেই।
ইরানের এই প্রতিরোধ ও অবাধ্যতার প্রদর্শন নেতানিয়াহু–কাৎজ এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের সেই পরিকল্পনার গতিতে বাধা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে এটি নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সম্পর্ককেও উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো রানওয়েতে প্রস্তুত ছিল এবং ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার অপেক্ষায় ছিল। ঠিক তখনই ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করে হামলা বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
ট্রাম্প নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমস ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, তিনি কি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন? জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁর আর কোনো বিকল্প থাকবে না। সিদ্ধান্ত আমিই নিই। সব সিদ্ধান্ত আমিই নিই। সিদ্ধান্ত তিনি নেন না।’
ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ মূলত এই দুই নেতারই যৌথ পরিকল্পনার ফল ছিল। এর ভিত্তি ছিল মোসাদের এমন গোয়েন্দা তথ্য, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী ধারণা করা হয়েছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্র অনেক বেশি দুর্বল। কিন্তু বাস্তবে ইরান তেমন দুর্বল প্রমাণিত হয়নি। বরং পরাজিত না হওয়ার একগুঁয়ে সক্ষমতা এবং বারবার নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষমতা এখন এই জোটের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু—দুই নেতার সামনেই নির্বাচন। একই সঙ্গে তাঁরা নিজ নিজ দেশে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কারণ তাঁরা যে যুদ্ধ যৌথভাবে শুরু করেছিলেন, তার নিয়ন্ত্রণ কার্যত নিজেদের হাতছাড়া করে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
ইসরায়েলি সাংবাদিক বেন ক্যাসপিট দৈনিক মা’আরিভে লিখেছেন, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কার্যত ‘বেসরকারিকরণ’ করা হয়েছে এবং সেটি ট্রাম্পের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি সামরিক সিদ্ধান্তের জন্যও এখন ওয়াশিংটনের অনুমোদন প্রয়োজন হচ্ছে। তাঁর সহকর্মী আভি আশকেনাজি লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে চুপচাপ বসে থাকা এবং প্রতিক্রিয়া না জানানোর নীতি ইসরায়েলের গ্রহণ করা উচিত নয়।’ তাঁর মতে, এটি ইসরায়েলের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
গত সোমবার রাতে নেতানিয়াহুকে শেষ পর্যন্ত এমন একটি কঠোর সুরের বিবৃতিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন, আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ রাখা হবে। অন্যদিকে ট্রাম্পও গত সপ্তাহে একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যেখানে বলা হয়, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে।’
যদিও এই প্রস্তাবের আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই, তবু এটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ চারজন রিপাবলিকান সদস্য দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একযোগে এর পক্ষে ভোট দেন। এরপর, ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেন, ‘গতকাল এক অর্থহীন ভোটে প্রতিনিধি পরিষদ আমার যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এতে অংশ নিয়েছে চারজন খারাপ রিপাবলিকান এবং সব ডেমোক্র্যাট। অথচ আমি তখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার জন্য চূড়ান্ত আলোচনা চালাচ্ছিলাম। এমন দেশপ্রেমহীন কাজ কে করতে পারে?’
তবে এখন স্পষ্ট যে, যুদ্ধবিরোধী মনোভাব রিপাবলিকানদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে এবং ট্রাম্প জানেন, এটি তাঁর জন্য একটি হুমকি।
এখন এটাও ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য আর এক নয়। ট্রাম্প স্পষ্টতই বিশ্বাস করেন না যে, যুদ্ধ পুনরায় শুরু করা কিংবা হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ অব্যাহত রাখা সংঘাতের সমাপ্তি ঘটাবে। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলছেন যে আলোচনা এখনও চলছে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি আসলে তাঁর সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন যে, ইরানের সঙ্গে আলোচনাই একমাত্র পথ, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরকে সংঘাত থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছিলেন দ্রুত বিজয়ের স্বপ্ন নিয়ে। এখন তাঁকে যত দ্রুত সম্ভব সেই যুদ্ধের সমাপ্তিও ঘটাতে হবে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন এমন একটি সুযোগ, যা জীবনে একবারই আসে। আর সেই সুযোগটি ছিল—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি, যেখানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান টিকে থাকবে, কিন্তু দুর্বল ও প্রভাবিত করার মতো। আর সেই সুযোগে তিনি ইসরায়েলের সীমানা সম্প্রসারণ এবং দেশটিকে অঞ্চলের নতুন প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।
সেই সুযোগের জানালা খুলেছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। তখন ট্রাম্প ইসরায়েলিদের ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনপন্থী (সেটলারপন্থী) ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন এবং গোলান মালভূমি দখলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
এর বিনিময়ে কোনো সমঝোতা ছিল না। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে ইসরায়েলকে কোনো প্রতিশ্রুতিও দিতে হয়নি। এসব ছিল রুপার থালায় সাজিয়ে দেওয়া উপহার। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই ‘সোনালি জোট’ আবারও সক্রিয় হয়। এর চূড়ান্ত রূপ ছিল ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, যা অন্তত ৪০ বছর ধরে নেতানিয়াহুর অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য ছিল।
এই সময়ে নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর জীবদ্দশায় আর কখনোই তিনি এমন এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাবেন না, যিনি এত সহজে প্রভাবিত হবেন। তাই তিনি সর্বোচ্চ ভূখণ্ড দখলের নীতি অনুসরণ করেন। কিন্তু নেতানিয়াহু বা ইসরায়েলের ‘লেবেনসরাউম’ বা ভূখণ্ড বিস্তার নীতিই মূল লক্ষ্য নয়। প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো গাজা ও দক্ষিণ লেবাননকে তাদের স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকে খালি করে দেওয়া। গাজায় প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনির আর কোনো ঘরবাড়ি নেই, ধ্বংসস্তূপ হিসেবেও নয়। একইভাবে লেবাননেও আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে।
নেতানিয়াহু ও কাৎজ যে নতুন ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের পরিকল্পনা করছেন, তা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের ঘটানো বিপর্যয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বড় হবে। এর অর্থ হবে শুধু ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও স্কুল ধ্বংস করা নয়; বরং গাজা ও দক্ষিণ লেবাননের সমাজব্যবস্থা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া।
বিশ্লেষক ও সাংবাদিক গিদিওন লেভি লিখেছেন, ‘গাজার জনসংখ্যাকে যখন একটি বিচ্ছিন্ন, সংগঠনহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা হবে, যেখানে কোনো কার্যকর সমাজ, মৌলিক সেবা, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বা অবশ্যই নেতৃত্ব থাকবে না, তখন সামাজিক কাঠামোর সম্পূর্ণ ভাঙন ইসরায়েলের জন্য পরবর্তী ধাপে যাওয়া সহজ করে দেবে। আর সেই ধাপটি হলো বহিষ্কার। যে পরিকল্পনা থেকে তারা কখনো সরে আসেনি। কেবল এভাবেই গাজার সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব। শুধু এই পথেই।’
অস্ট্রেলিয়ান সেটলার-ঔপনিবেশিকতা গবেষক প্যাট্রিক উলফ বসতি স্থাপনকারীদের মনোভাবকে বর্ণনা করেছিলেন ‘নির্মূলের যুক্তি’ (logic of elimination) হিসেবে। ইতিহাসবিদ ইলান পাপে লিখেছেন, ‘ঔপনিবেশিকরা কীভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি নিজেদের আচরণের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করত? অন্যান্য ঔপনিবেশিক প্রকল্পের মতোই তারা তাদের অমানবিক করে তুলত এবং ‘বর্বর’ বা ‘আদিম’ হিসেবে উপস্থাপন করত।’
তবে তিনি আরও উল্লেখ করেন, সেটলার-ঔপনিবেশিকতা ও প্রচলিত ঔপনিবেশিকতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভারতে ব্রিটিশরা নিজেদের ‘বর্বরদের’ কাছে আধুনিকতা নিয়ে যাওয়ার বাহক হিসেবে দেখত। কিন্তু বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিকরা নিজেদের ভূমিকে আধুনিক করার শক্তি হিসেবে দেখে। সেই ভূমির মানুষদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
নেতানিয়াহু ও কাৎজ যুদ্ধকাল এবং শান্তিকাল উভয় সময়েই এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন, ফিলিস্তিনিরা যেখানেই থাকুক না কেন। হামাস সব জিম্মিকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর থেকে ইসরায়েল গাজা যুদ্ধবিরতি প্রায় ৩ হাজার বার লঙ্ঘন করেছে। এতে ৯ শতাধিক বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৯০০ জন আহত হয়েছেন। আরও বহু মানুষকে ইসরায়েলি বাহিনী অপহরণ করে নিয়ে গেছে।
যে ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সরে যাওয়ার কথা ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসেছে। ইসরায়েলের দখলে থাকা গাজার অংশ ৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। গত মাসের শেষ দিকে নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, এটিকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, যা হবে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে ‘শুরু’ মাত্র। তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে হামাসকে চেপে ধরছি। এখন গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশ এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আপনারা এটা জানেন। আমরা ৫০ শতাংশে ছিলাম, তারপর ৬০ শতাংশে এসেছি। আমার নির্দেশ হলো আমরা এগোবো...’ এ সময় জনতার ভেতর থেকে কেউ চিৎকার করে বলে ওঠে, “১০০ শতাংশ! ”
নেতানিয়াহু জবাব দেন, ‘ধাপে ধাপে এগোই। প্রথমে ৭০ শতাংশ। সেখান থেকেই শুরু করি। আমরা চারদিক থেকে তাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছি। বাকি যা থাকবে, সেটাও আমরা সামলে নেব।’
এদিকে যুদ্ধ শেষ করার বিনিময়ে জিম্মিদের মুক্তি দিতে সম্মত হওয়া হামাস নেতাদেরও একে একে হত্যা করছে ইসরায়েল। হামাসের সর্বশেষ সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ ওদেহ গত মাসে একটি লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় নিহত হন।
২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি দাভোসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার যে ‘মাস্টার প্ল্যান’ উপস্থাপন করেছিলেন, তা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। ১ লাখ আবাসন ইউনিট, ২০০টি শিক্ষা কেন্দ্র, ৭৫টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং ১৮০টি সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান নিয়ে যে ‘নিউ রাফাহ’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল, তার কোনো ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়নি। অথচ এই ভূখণ্ড পুরোপুরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন।
ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক সরকারের কোনো প্রতিনিধিও গাজায় পা রাখেননি। সেখানে কোনো আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী নেই, আর এসব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও নেই। ‘বোর্ড অব পিস’-এর তহবিল কার্যত শূন্য।
গাজার জন্য বোর্ডটির উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ সব দোষ চাপান হামাসের নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতির ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে হামাসকে নিরস্ত্র হতে হবে, এরপর আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স) মোতায়েন হবে, আর তারপরই ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে। কিন্তু এর কোনোটিই ঘটছে না।
প্রত্যেক ফিলিস্তিনি জানে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও কাৎজ ভূমধ্যসাগরের তীরে কোনো আবুধাবি গড়ার পরিকল্পনা করছেন না। তারা সক্রিয়ভাবে বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধ এবং বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর পারস্পরিক সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছেন। কারণ ফিলিস্তিনিদের সমুদ্রে ঠেলে দেওয়া এবং নির্বাসনে পাঠানোর সবচেয়ে নিশ্চিত উপায় এটাই।
তবে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতিই ইসরায়েলকে তার ব্যাপক জাতিগত নিধন ও উচ্ছেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে বিরত রাখছে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের এক বিশাল ঢল, যা সৌদি আরব, জর্ডান এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তার পথে তারাই একমাত্র বাধা।
২০২৪ সালে একাধিকবার ইসরায়েলি হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব হারানোর পরও হিজবুল্লাহ স্পষ্টতই তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পেরেছে। একটি নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তারা ইসরায়েলি সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে হামলার সংখ্যার চেয়ে হামলার গুণগত মানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তারা কিছু বাহিনী রিজার্ভে রাখে। স্থানীয় ইউনিটগুলোকে উল্লেখযোগ্য মাত্রার স্বায়ত্তশাসন দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণও বজায় রাখে। প্রতিদিনের ইসরায়েলি ড্রোন নজরদারি ও হামলার মধ্যেও এটি কোনো সাধারণ সামরিক সাফল্য নয়। এ পর্যন্ত ইসরায়েল যেসব যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং যেগুলোকে তার প্রতিবেশী দেশগুলো সমর্থন দিয়েছে, সেগুলো মূলত একই স্বপ্ন অনুসরণের আড়াল মাত্র। সেই স্বপ্ন হলো, ভিন্ন কাঠামোতে গাজা ও দক্ষিণ লেবাননকে জাতিগতভাবে শূন্য করে ফেলা।
এটাই সেই বাস্তবতা, যা উপলব্ধি করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এখনও বাকি রয়েছে। আলোচনার মূল বিষয় কোনো এমন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা নয়, যে এ ধরনের কাজ করে। বিষয়টি নিরস্ত্রীকরণ নয়। বরং পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত হওয়া। ইসরায়েলের এই কর্মসূচি থামানোর একমাত্র উপায় হলো, সেটি থামানোর মতো কঠোর সামরিক শক্তি থাকা। তুরস্ক, মিসর ও জর্ডানেরই ইসরায়েলের পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। কারণ, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, কৌশলগত লক্ষ্য একই থাকবে। নেতানিয়াহু যে ভূখণ্ড দখল করেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নাফতালি বেনেত এলেও তার কোনোটি ফেরত দেওয়া হবে না।
বর্তমান মানসিকতার ইসরায়েল—যেটিকে নেতানিয়াহু তাদের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন—অন্য কোনো দেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে না। তারা বাগদাদের কাছে কোনো পরিকল্পনা অনুমোদন না নিয়েই ইরাকের মরুভূমিতে বিমানঘাঁটি স্থাপন করবে। এর পাশাপাশি এসব দেশ জানে, ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় তারাও পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে। তারা এখন পর্যন্ত সংযম দেখিয়েছে, কারণ তারা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। তুর্কি সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করার মতো সক্ষমতা অর্জনে তাদের আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
এমন নয় যে তারা কিছুই করছে না। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ট্রাম্পকে কুর্দি বাহিনী ব্যবহার করে ইরানে হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে বিরত রেখেছেন। আর জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ ট্রাম্পকে আপাতত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনায় সমর্থন দেওয়া থেকে নিবৃত্ত করেছেন।
তবে এগুলো কৌশলগত নয়, বরং সাময়িক ও ট্যাকটিক্যাল দিক পরিবর্তন। কোনো নেতাই এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের নিজস্ব সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রকল্প থামাতে পারেননি। কিন্তু এখন সেটি একটি আঞ্চলিক অপরিহার্যতায় পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল তার পরিকল্পনায় সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশ তার পরিণতি অনুভব করবে।
ইসরায়েল কিংবা হোয়াইট হাউসের বর্তমান বাসিন্দা—কেউই যাতে উপেক্ষা করতে না পারে—এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো ও প্রতিরক্ষা জোট গড়ে তোলার সময় অনেক আগেই এসে গেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান যদি ঘটে—তবে সেটিই হওয়া উচিত এমন একটি আঞ্চলিক উদ্যোগের সূচনা, যা নিশ্চিত করবে যে এমন যুদ্ধ আর কখনও না ঘটে।
মিডল ইস্ট আইয়ে লিখিত সাংবাদিক ও গবেষক জোনাথন কুকের লিখিত নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান