দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও বৈরিতা কাটিয়ে অবশেষে সম্ভবত স্বাভাবিকতার পথে ফিরছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক। গতকাল সোমবার নয়াদিল্লিতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত দোভালের সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে আজ মঙ্গলবার জানানো হয়েছে, দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় চীন-ভারত সম্পর্ক অবশেষে এক দীর্ঘস্থায়ী নিম্নবিন্দু থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে পুনরুদ্ধার ও অগ্রগতির ট্র্যাকে ফিরে এসেছে।
বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই জোর দিয়ে বলেন, বেইজিং ও নয়াদিল্লির শীর্ষ নেতারা একমত হয়েছেন যে চীন ও ভারত একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী ও অংশীদার। এটিই দুই দেশের মধ্যকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সুস্থ ও স্থিতিশীল উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
বিশ্বের বৃহত্তম দুই উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ককে কেবল দ্বিপক্ষীয় সীমানায় আটকে না রেখে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন ওয়াং ই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, ‘উভয় পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও বিনিময় পুনরায় চালু হয়েছে। সীমান্ত এলাকাগুলোতেও সামগ্রিকভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। এই অর্জন সহজে আসেনি এবং একে অত্যন্ত যত্ন সহকারে রক্ষা করা উচিত।’
বৈঠকে দুই পক্ষই বিতর্কিত সীমান্ত সমস্যা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলার ওপর জোর দেয়।
ওয়াং ই আহ্বান জানান যেন সীমান্ত ইস্যুটিকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক অগ্রগতির পথে বাধা হতে না দেওয়া হয়। তিনি বাণিজ্য, অর্থসংস্থান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গণমাধ্যমের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থগিত থাকা সংলাপ প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত গতিতে পুনরায় চালুর আহ্বান জানান।
অন্য দিকে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল চীনের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাগত জানান। তিনি উল্লেখ করেন, কাজান ও তিয়ানজিন শীর্ষ সম্মেলনে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ যে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন, ভারত সেই অনুযায়ীই এগোতে চায়।
দোভাল স্পষ্ট করে বলেন, ভারত পিপলস রিপাবলিক অব চায়নাকে (পিআরসি) স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর একটি এবং তাইওয়ান ইস্যুতে ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি আরও জানান, ভারত চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে এবং পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ‘উইন-উইন’ বা সবার জন্য লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে আগ্রহী।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বৈঠকটিকে অত্যন্ত ‘গঠনমূলক এবং দূরদর্শী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছে এবং ক্রমান্বয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের দিকে অগ্রগতির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর এটিই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের প্রথম ভারত সফর। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি হিসেবেই এই সফর ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা দক্ষিণের উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত উত্থানের প্রশংসা করেন ওয়াং ই।
তিনি বলেন, গ্লোবাল সাউথের অগ্রবর্তী দল হিসেবে ব্রিকস জোটের উচিত বৈশ্বিক বহুপাক্ষিকতাকে এগিয়ে নেওয়া এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা। ব্রিকসের বর্তমান সভাপতি হিসেবে ভারতের দায়িত্ব পালনে চীন পূর্ণ সমর্থন দেবে এবং এই জোটের শক্তি বাড়াতে ভারতের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে বলে বেইজিং আশ্বস্ত করেছে।