রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কীভাবে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে একটি বিশাল রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন—এ নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে মস্কোতে কাজ করা সাংবাদিক মার্ক বেনেটস তাঁর বই ‘দ্য ডিসেন্ট’-এ দেখিয়েছেন, কীভাবে ধারাবাহিক মিথ্যাচার ও তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে রাশিয়ায় মানুষের যুক্তিবোধ দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে এক প্রতিবেদনে ইকোনমিস্ট জানায়, রাশিয়ার বিরোধী রাজনীতিক ইলিয়া ইয়াশিন কারাগারে থাকার সময় এক সহবন্দির কাছ থেকে শুনেছিলেন, ইউক্রেন হিটলারপন্থী নাজিতে ভরে গেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো—সেই বন্দি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন মিথ্যা বলে। তারপরও সেই তথ্য তাঁর বিশ্বাসকে প্রভাবিত করেছিল।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই পুতিনের প্রোপাগান্ডার মূল শক্তি। মানুষ জানে তথ্য মিথ্যা হতে পারে, কিন্তু বিকল্প কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস না থাকায় তারা শেষ পর্যন্ত সেটাকেই আঁকড়ে ধরে।
পুতিনের উত্থানের শুরুতে তাঁর ভাবমূর্তি গঠনে বড় ভূমিকা রাখেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ গ্লেব পাভলোভস্কি। তিনি খুঁজে বের করেন, রুশ জনগণ কেমন নেতাকে চায়। আশ্চর্যজনকভাবে রাশিয়ার মানুষেরা পছন্দ করেন কাল্পনিক সোভিয়েত গুপ্তচর চরিত্র ম্যাক্স অটো ভন স্টিয়ারলিটজ-এর মতো এক শক্তিশালী ও রহস্যময় ব্যক্তিত্ব। পুতিন সেই চরিত্রের ছায়া ধারণ করে নিজেকে তুলে ধরেন—একজন দৃঢ় কিন্তু জনগণের পক্ষের নেতা হিসেবে।
এই ভাবমূর্তি রক্ষায় তাঁকে কখনোই ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত হতে দেওয়া হয়নি। ২০০০ সালের কুরস্ক সাবমেরিন দুর্ঘটনায় ১১৮ নাবিক নিহত হলেও পুতিন ঘটনাস্থলে যাননি, যাতে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ধীরে ধীরে তাঁকে এমন এক সর্বশক্তিমান সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যিনি সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
প্রোপাগান্ডার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—‘ভালো জার, খারাপ কর্মকর্তা’ তত্ত্ব। অর্থাৎ, রাষ্ট্রে কোনো অন্যায় হলে তা পুতিনের নয়, বরং অধস্তন কর্মকর্তাদের দোষ। এর বাস্তব উদাহরণ আলেক্সান্ডার শেসতুন। তিনি একটি বিষাক্ত ল্যান্ডফিল প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় হুমকি পেয়েছিলেন। এমনকি তিনি দুর্নীতির প্রমাণ প্রকাশ করার পরও ১৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুতিন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে নিজের প্রচারণার যন্ত্রে পরিণত করেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এসব মাধ্যমে অবাস্তব ও চাঞ্চল্যকর গল্প ছড়ানো হয়। ২০১৪ সালে মস্কোতে ৫০ হাজার মানুষের যুদ্ধবিরোধী সমাবেশকে একটি টিভি চ্যানেল প্রায় ফাঁকা বলে দেখায়। এটি ছিল বাস্তবতা আড়াল করার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
এই প্রচারণার লক্ষ্য শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করা নয়, বরং তাদের মধ্যে অসহায়ত্ব তৈরি করা। গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ বিশ্বাস করে, তাদের জীবনের সিদ্ধান্ত মস্কোতেই নেওয়া হয়, তাই প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে জনগণের মধ্যে গর্বের অনুভূতি তৈরি করা হয়—যেমন, দূরবর্তী ক্রিমিয়া দখল নিয়ে আনন্দ করা। যদিও এই অর্জনের সঙ্গে গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে এই প্রোপাগান্ডার ফলও ভয়াবহ। এভাবে রাশিয়ার অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, মানুষের জীবনমান কমেছে, এমনকি অনেক স্কুলে এখনো মৌলিক সুবিধার অভাব রয়েছে। তবুও রাষ্ট্রীয় প্রচারণা এই বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই গণপ্রভাব তৈরির কৌশল শুধু রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে যে কোনো দেশেই একই ধরনের প্রোপাগান্ডা কার্যকর হতে পারে।