হোম > বিশ্লেষণ

নৌ-অবরোধ কী, হরমুজ প্রণালিতে কীভাবে কাজ করবে এই মার্কিন রণকৌশল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সোমবার (১৩ এপ্রিল) থেকে হরমুজ প্রণালিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ-অবরোধ শুরু করতে যাচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনী। মূলত ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে চাপে ফেলতেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন।

নৌ-অবরোধ আসলে কী

মার্কিন নৌবাহিনীর ২০২২ সালের ‘কমান্ডারস হ্যান্ডবুক’ অনুযায়ী, নৌ-অবরোধ হলো একটি যুদ্ধকালীন অভিযান, যার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের নির্দিষ্ট বন্দর বা উপকূলীয় এলাকায় শত্রু বা নিরপেক্ষ—যেকোনো দেশের জাহাজ ও বিমানের প্রবেশ বা প্রস্থান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হরমুজ প্রণালিতে এই অবরোধ যেভাবে কাজ করবে

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার (বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা) থেকে এই অবরোধ কার্যকর হবে। এর কার্যপদ্ধতি হবে নিম্নরূপ—

ইরানি বন্দর লক্ষ্য করে অবরোধ: পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে অবস্থিত ইরানের সব বন্দরে যাতায়াতকারী যেকোনো দেশের জাহাজের ওপর এই অবরোধ প্রয়োগ করা হবে।

তল্লাশি ও জব্দ: সেন্ট্রাল কমান্ডের নির্দেশ অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া অবরোধ এলাকায় কোনো জাহাজ প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করলে মার্কিন বাহিনী বাধা দেবে এবং প্রয়োজনে জব্দ করবে।

নিরপেক্ষ জাহাজ চলাচল: ইরান বাদে অন্য কোনো গন্তব্যে যাতায়াতকারী নিরপেক্ষ জাহাজগুলোর চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। তবে সন্দেহভাজন জাহাজে তল্লাশি চালানো হতে পারে।

মাইন ধ্বংস: ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রণালিতে ইরান যেসব মাইন পেতে রেখেছে বলে অভিযোগ আছে, মার্কিন নৌবাহিনী সেগুলো ধ্বংস করবে।

অবরোধের নেপথ্যে কারণ ও উদ্দেশ্য

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ। যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান এই জলপথকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ ‘টোল’ বা মাশুল আদায় করছে বলে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের।

ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো—ইরানের আয়ের এই পথ বন্ধ করে দেওয়া। তিনি বলেছেন, ইরানকে তাদের পছন্দমতো দেশের কাছে তেল বিক্রি করে লাভবান হতে দেওয়া হবে না।

রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক টার্নার মনে করেন, এই অবরোধ মূলত ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করার একটি কৌশল।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মিত্রদের অবস্থান

ট্রাম্প দাবি করেছেন, ন্যাটোর মিত্ররা এই জলপথ ‘নিরাপদ’ করতে সহায়তা করবে। তবে ব্রিটেন সরাসরি এই অবরোধে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, ব্রিটিশ নৌবাহিনী নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করবে, কিন্তু তারা মার্কিন ব্লকেডে যোগ দিচ্ছে না। ফ্রান্স এবং অন্যান্য অংশীদারদের নিয়ে তারা একটি আলাদা জোট গঠনের চেষ্টা করছে।

আইনি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই অবরোধ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে। এ ছাড়া সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই অবরোধ কার্যকর করায় বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিও হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিপিং বিশেষজ্ঞ লার্স জেনসেনের মতে, এই অবরোধের ফলে খুব সামান্য সংখ্যক জাহাজই আসলে প্রভাবিত হবে, কারণ বর্তমানে এই জলপথ দিয়ে এমনিতেই জাহাজ চলাচল তলানিতে ঠেকেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে দৈনিক গড়ে ১৩৮টি জাহাজ চলত, গত কয়েক দিনে তা নেমে এসেছে হাতেগোনা কয়েকটিতে।

এ ছাড়া অধিকাংশ শিপিং কোম্পানি এখনই কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। জেনসেন বলেন, সবাই একটি স্থায়ী বা টেকসই শান্তিচুক্তির অপেক্ষায় আছে। যদি পরিস্থিতি শান্ত হয়, তবেই খুব ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে।

কখন এই জলপথ পুনরায় নিরাপদ হবে—বিবিসির এমন প্রশ্নের জবাবে জেনসেন বলেন, শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছেও এর কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে বিশ্বাসের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কোনো চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সেই বিশ্বাস অর্জন করা জরুরি।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং মূল্যের দিক থেকে ৭০ শতাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশই একটি পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। আর সেটি হলে ‘হরমুজ প্রণালি’।

পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনি হিসেবে পরিচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবাহিত হয়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশেরই ভোক্তা দক্ষিণ এশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাও সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের প্রভাবের প্রতিক্রিয়া এসব দেশের জ্বালানি তেলের বাজারেও পড়েছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স

ট্রাম্পের ‘ফাইনাল ডিল’ কখনোই ফাইনাল হয় না, ব্যর্থতার নজির শতভাগ

হরমুজে নৌ অবরোধের অর্থ কী, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কি ন্যাটো টিকবে

আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী দুই পক্ষই, নজর ট্রাম্পের দিকে

ট্রাম্প চান ইসরায়েল ও আরব মিত্রদের জয়, ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্রের মুখোশ উন্মোচন

কেন ব্যর্থ হলো ইসলামাবাদ সংলাপ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কে কী চায়

পছন্দের আলোচক ভ্যান্সকেই পেল ইরান, কতটা ফায়দা নিতে পারবে

পুতিনের প্রোপাগান্ডা মেশিন যেভাবে কাজ করে

ইরান যুদ্ধে ‘শান্তির পায়রা’ পাকিস্তান হয়ে উঠল যেভাবে

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া থেকে বেরোতে চায় মধ্যপ্রাচ্য, আলোচনায় নতুন নিরাপত্তা মডেল