ভারতের উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের প্রস্তুতি নেওয়ার মুখে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে উন্মুক্ত স্থানে বা সড়কে বড় জামাত আয়োজনের ওপর কঠোর সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দিল্লির অদূরে উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি মসজিদের ভেতরের দৃশ্যটি বর্তমান এই থমথমে পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। সেখানে একটি ছোট মসজিদে সমবেত মুসল্লিদের নিয়ে আলোচনায় কোরবানির পশু কিংবা দান-খয়রাতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—বৃহস্পতিবার কোথায় এবং কীভাবে ঈদের নামাজ আদায় করা হবে, রাস্তা বা ব্যারিকেড কোথায় থাকবে এবং পুলিশের অনুমতি কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে।
সম্প্রতি মসজিদ কমিটির এক কর্মকর্তা মুসল্লিদের উদ্দেশে কড়া নির্দেশনা দিয়ে বলছিলেন, ‘অনুগ্রহ করে কেউ মসজিদের গেটের বাইরে ভিড় করবেন না। ভেতরে জায়গা না হলে পরের শিফটের নামাজের জন্য অপেক্ষা করুন। কোনো বিতর্ক বা তর্কে জড়াবেন না। কোনো ভিডিও করবেন না এবং কোনো উসকানিতে সাড়া দেবেন না।’
উপস্থিত মুসল্লিরা নীরবে সেই নির্দেশনা শুনছিলেন। তাঁদের অনেকের ফোনেই স্থানীয় পুলিশের দেওয়া নির্দেশনাবলি ঘুরছিল, যেখানে স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে বা উন্মুক্ত স্থানে নামাজ না পড়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
মিরাটের মালিয়ানা গ্রামটির একটি নিজস্ব সংবেদনশীল ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৭ সালের মে মাসে এখানে এক রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় উগ্রপন্থী হিন্দু দাঙ্গাকারী ও প্রাদেশিক সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (পিএসি) হাতে ৭২ জন মুসলিম নিহত হন। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে শুনানির পর ২০২৩ সালে স্থানীয় একটি জেলা আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের খালাস দেয়।
তবে বর্তমান উদ্বেগের কারণগুলো আরও সাম্প্রতিক। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলো সড়ক, পার্ক বা ফাঁকা জায়গায় জুমা ও ঈদের মতো বড় ধর্মীয় জমায়েতের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে। ট্রাফিক সমস্যা এবং নিরাপত্তার অজুহাতে তারা প্রায়শই নামাজে বাধা সৃষ্টি করছে।
সম্প্রতি বিজেপির আদর্শিক মিত্র উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ (ভিএইচপি) দেশজুড়ে সড়ক বা উন্মুক্ত স্থানে নামাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, এই ধরনের গণজমায়েত মূলত ‘শক্তি প্রদর্শন’।
তবে মুসলিম প্রতিনিধিদের যুক্তি, জনবহুল শহরগুলোতে সব মুসল্লিকে ধারণ করার মতো জায়গা স্থানীয় মসজিদ বা ঈদগাহগুলোতে নেই। ফলে বছরের বিশেষ কিছুদিনে নামাজের পরিধি কিছুটা বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, যা মাত্র কয়েক মিনিটের বিষয়।
উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু এখন উত্তরপ্রদেশ। প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মুসলিম অধ্যুষিত এই রাজ্যটি জনসংখ্যার দিক থেকে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের প্রায় কাছাকাছি এবং সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
২০১৭ সাল থেকে রাজ্যটিতে ক্ষমতায় রয়েছেন কট্টরপন্থী হিন্দু সন্ন্যাসী ও বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথ। তাঁর সরকার উন্মুক্ত স্থানে নামাজের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা জারি করেছে। গত ১৮ মে এক বিবৃতিতে আদিত্যনাথ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, প্রয়োজনে একাধিক শিফটে নামাজ পড়তে হবে, কিন্তু সড়কে নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন: ‘যদি তারা শান্তিতে কথা মেনে নেয় তবে ভালো, আর যদি না মানে তবে আমরা অন্য পথ অবলম্বন করব।’
উত্তরপ্রদেশের মুসলিমদের কাছে এই ‘অন্য পথ’-এর অর্থ বেশ পরিচিত। মিরাটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, বিগত বছরগুলোতে উন্মুক্ত স্থানে নামাজ পড়ার দায়ে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন বাতিল করার খবর পাওয়া গেছে। ফলে এবার মানুষের মধ্যে এক স্বাভাবিক ভীতি কাজ করছে।
আলিগড় জেলার এক দোকানদার আরিফ মালিক জানান, গত বছর ঈদে কয়েক মিনিটের জন্য একটি খোলা মাঠে নামাজ পড়ার পর পুলিশ মুসল্লিদের ধাওয়া করেছিল। তাই এবার প্রতিটি পরিবারই যেকোনো ধরনের জমায়েত বা ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ির কারণে উৎসবের আনন্দ এখন রূপ নিয়েছে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাপনায়। বহু শহরের মসজিদ কমিটিগুলো পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক করছে। নামাজের জামাতের আকার ছোট করা হচ্ছে এবং স্বেচ্ছাসেবীদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে যেন কেউ অসতর্কতাবশতও রাস্তায় জায়নামাজ না পাতেন।
মিরাটের ৪২ বছর বয়সী বাসিন্দা মোহাম্মদ আরিফ, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে ঈদের জামাত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত, বলেন, ‘এখন আমরা নামাজ কোথায় পড়ব শুধু তা নিয়ে ভাবি না, বরং ধর্মীয় জমায়েতকে যেভাবে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তা আমাদের বেশি ভাবিয়ে তুলছে। জায়নামাজটি কোথায় পাতব, সেটিও এখন খুব সাবধানে চিন্তা করতে হচ্ছে।’
অন্য একজন তরুণ আরশাদ (৩৩) বলেন, ‘আগে ঈদের সকালটা আনন্দের অনুভূতি নিয়ে আসত। এখন আগের রাত থেকেই মনে চাপা উত্তেজনা ও ভয় কাজ করে। সারাক্ষণ মনে হয় এই বুঝি পুলিশ চলে এল, কিংবা কেউ ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিল।’
সমাজবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, হিজাব বিতর্ক, হালাল খাবার বয়কট ও লাউডস্পিকারে আজান দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধের পর নামাজের এই বিতর্ক ভারতের মুসলিমদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
সরকার এই কড়াকড়িকে ট্রাফিক এবং আইন-শৃঙ্খলার স্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে দাবি করলেও, সমালোচক ও মানবাধিকার কর্মীরা দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ তুলছেন।
দিল্লির একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সবচেয়ে বড় অসঙ্গতিটি চোখে পড়ে যখন দেখা যায় বিভিন্ন বড় হিন্দু ধর্মীয় শোভাযাত্রা ও উৎসবের সময় ট্রাফিক ডাইভারশন, পুলিশি পাহারা এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অন্য একটি সম্প্রদায়ের কয়েক মিনিটের প্রার্থনার সময় কড়া নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
তবুও শঙ্কা ও ভীতির সমান্তরালেই ঈদের প্রস্তুতি চলছে ভারতের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে। গভীর রাত পর্যন্ত বাজারে মানুষের ভিড়, নতুন পোশাক কেনা এবং সেমাই-মিষ্টির প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু চিরচেনা সেই উৎসবের আমেজকে এবার গ্রাস করেছে এক চাপা রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা।