হোম > বিশ্লেষণ

সুপার স্পার্টা: আমেরিকার ওপর ইসরায়েলের নতুন সামরিক নির্ভরতা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

লেবাননে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর ট্যাংক বহর। ছবি: আনাদোলু

ইসরায়েল কি সত্যিই সামরিক ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আরও গভীর ও ঘনিষ্ঠ সামরিক অংশীদারত্বে রূপ নিচ্ছে? ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির ‘সুপার স্পার্টা’ হয়ে ওঠার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট। এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর যদি ইসরায়েল আর নির্ভর করতে না পারে, যে ব্যবস্থা তাকে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র দেবে, অর্থায়ন করবে এবং তার নীতিকে রক্ষা করবে, তাহলে দেশটিকে এতটাই সামরিকভাবে শক্তিশালী ও অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভর হতে হবে, যাতে সেই চাপ মোকাবিলা করা যায়।

নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলকে নিজের প্রয়োজনীয় পণ্যের আরও বেশি অংশ নিজেকেই উৎপাদন করতে হবে এবং বিদেশি সরকারগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। কারণ, ভবিষ্যতে কোনো কোনো সরকার ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বা অন্য ধরনের চাপ আরোপ করতে পারে।

কিন্তু এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক বিরোধাভাস। ইসরায়েল অত্যাধুনিক অস্ত্র, নজরদারি ব্যবস্থা, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার প্রযুক্তি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতে অসাধারণ সক্ষমতা দেখিয়েছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র রপ্তানিকারকও। তবু ইসরায়েল পুরোপুরি সামরিক স্বনির্ভরতা অর্জন করে বিদেশি সহায়তা ছাড়াই বর্তমান মাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, এই ধারণা অনেকটাই কম বিশ্বাসযোগ্য।

বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হলো, ‘সুপার স্পার্টা’ বলতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াকে বোঝানো হচ্ছে না। এর অর্থ হতে পারে প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু। অর্থাৎ, পুরোনো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক, যা মূলত সামরিক সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেটিকে আরও গভীরভাবে একীভূত সামরিক-শিল্প অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া।

ইসরায়েল আরও বেশি অস্ত্র নিজে তৈরি করবে। কিন্তু সেই উৎপাদন হবে এমন একটি প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থার অংশ হিসেবে, যা ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে জড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ নির্ভরতা শেষ হবে না। বরং সেটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দশকের পর দশক ধরে মার্কিন সামরিক সহায়তা ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার গুণগত শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। বর্তমানে কার্যকর ১০ বছরের মার্কিন সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রতি বছর ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সামরিক অর্থায়ন দেয়। এর পাশাপাশি যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য আরও ৫০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা, সাঁজোয়া যান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। সর্বশেষ স্টকহোম ইন্টারনাশ্যনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য এই কাঠামোগত নির্ভরতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েল যে পরিমাণ প্রধান সামরিক অস্ত্র আমদানি করেছে, তার ৬৮ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাকি অস্ত্রের বেশিরভাগ এসেছে জার্মানি থেকে।

এই চিত্র এমন কোনো দেশের নয়, যে দেশ বিদেশি সামরিক সহায়তা পুরোপুরি ছাড়াই অনির্দিষ্টকাল ধরে আঞ্চলিক যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ, রাফাল এবং এলবিট সিস্টেমসের মতো ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি গ্রিস ইসরায়েলি প্রযুক্তি-নির্ভর একটি ৩ বিলিয়ন ইউরোর আকাশ প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে সম্মত হয়েছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে একটি বড় বৈপরীত্য। ইসরায়েল একই সঙ্গে বড় অস্ত্র রপ্তানিকারক এবং বড় অস্ত্র আমদানিকারক। আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি বুঝলে অবশ্য এই দুই বিষয়কে পরস্পরবিরোধী মনে হয় না। অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরি করতে পারার অর্থ এই নয় যে একটি দেশের কাছে আধুনিক সামরিক শক্তি টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি উপাদান, কাঁচামাল, ইঞ্জিন, বিমান প্ল্যাটফর্ম, সেমিকন্ডাক্টর, নির্দেশনা প্রযুক্তি, উৎপাদন ব্যবস্থা বা অর্থায়নের সবকিছুই রয়েছে।

ইসরায়েল অসাধারণ সব সামরিক ব্যবস্থা নকশা ও উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থাগুলো যেসব আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোর সঙ্গে ইসরায়েল নিজেও গভীরভাবে যুক্ত। এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইসরায়েল নিজস্বভাবে এ-৩৫ এর সমতুল্য একটি যুদ্ধবিমান তৈরি করতে পারে না। দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প থাকলেও তা মার্কিন যুদ্ধবিমান, মার্কিন অস্ত্র, মার্কিন উপাদান কিংবা মার্কিন সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তা দূর করে না।

সিপ্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালেও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, নির্ভুলভাবে পরিচালিত বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে।

একই নীতি আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

আধুনিক যুদ্ধ শুধু একটি রাষ্ট্র নিজে একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে কি না, তার ওপর নির্ভর করে না। প্রশ্ন হলো, একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহু-মুখী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পুরো ব্যবস্থা সেই রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে পারে কি না। এর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক্স, নির্ভুল নির্দেশনা ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, খুচরা যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, যোগাযোগব্যবস্থা, রসদ, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, অস্ত্র ও সরঞ্জামের পুনঃসরবরাহ এবং অর্থায়ন। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কও প্রয়োজন।

ইসরায়েলের যুদ্ধ অর্থনীতি যথেষ্ট স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। দেশটির উন্নত প্রযুক্তি খাত, উচ্চ সঞ্চয়, প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্পদ এবং সামরিক-শিল্পভিত্তি তাকে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিপুল অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বাধা সামাল দিতে সক্ষম করেছে। তবে ইসরায়েলের অর্থনীতিকে অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক হিসেবে বর্ণনা করা বিভিন্ন বিশ্লেষণেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিপুল আর্থিক ব্যয় এবং মার্কিন সামরিক সহায়তার কেন্দ্রীয় গুরুত্ব স্বীকার করা হয়েছে।

এখানেই ‘আত্মনির্ভরতা’র চেয়ে ‘একীভূতকরণ’ ধারণাটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন শুধু ইসরায়েলের অস্ত্র কেনার জন্য অর্থ দেবে, এমন ব্যবস্থার পরিবর্তে ইসরায়েলি কোম্পানিগুলোকে আরও গভীরভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা-শিল্প ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে।

এর মধ্যে থাকতে পারে যৌথ উৎপাদন, যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে মার্কিন বিনিয়োগ, অস্ত্রের যৌথ উৎপাদন, অভিন্ন সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি ভাগাভাগির ব্যবস্থা এবং ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থাগুলোকে বৃহত্তর মার্কিন ও মিত্র সামরিক কাঠামোর অংশে পরিণত করা।

এতে রাজনৈতিক সমীকরণও বদলে যাবে।

পুরোনো ব্যবস্থায় মার্কিন সহায়তার ওপর ইসরায়েলের নির্ভরতা তাত্ত্বিকভাবে ওয়াশিংটনকে কিছুটা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিত। কোনো মার্কিন প্রশাসন যদি মনে করত ইসরায়েলের কোনো কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক বা কৌশলগতভাবে আর গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে নীতিগতভাবে সামরিক সহায়তার ওপর শর্ত আরোপ করা বা তা বন্ধ করা সম্ভব ছিল।

অর্থাৎ, এই সম্পর্কের মধ্যে অন্তত কিছুটা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প যদি গভীরভাবে একীভূত হয়ে যায়, তাহলে এই সম্পর্ককে আলাদা করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো মার্কিন সামরিক কর্মসূচির সরবরাহকারী হয়ে উঠবে। মার্কিন কোম্পানিগুলো ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থার সরবরাহকারী হবে। উৎপাদন লাইন দুই দেশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। গবেষণা হবে যৌথভাবে। প্রযুক্তিগুলো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুই দেশের অর্থনীতিতেই ছড়িয়ে থাকবে।

ফলে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যও বেড়ে যাবে।

‘সামরিক সহায়তা’ থেকে ‘একীভূতকরণে’ যাওয়ার প্রস্তাবের গভীর অর্থ এখানেই। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে যে ধরনের রাজনৈতিক চাপ বর্তমানে বাড়ছে, তার বিরুদ্ধে আরও বেশি প্রতিরোধী করে তুলতে পারে। বিশেষ করে গাজা এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ যখন বাড়ছে, তখন এই পরিবর্তন সেই চাপের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

এখানে একটি অসাধারণ পরিহাস রয়েছে।

‘সুপার স্পার্টা’ ধারণাটি এমন একটি ইসরায়েলের কথা বলে, যে দেশ ক্রমবর্ধমান বৈরী বিশ্বের কাছ থেকে স্বাধীন হয়ে উঠছে। কিন্তু বাস্তব বিকল্পটি হতে পারে আরও গভীরভাবে সেই মার্কিন সামরিক-শিল্প ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া, যে ব্যবস্থা বহু দশক ধরে ইসরায়েলের সামরিক শক্তিকে টিকিয়ে রেখেছে। ইসরায়েলের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও এতে ব্যাখ্যা করা যায়। লক্ষ্য হয়তো আমেরিকাকে প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং লক্ষ্য হতে পারে ইসরায়েলকে আমেরিকার কাছে আরও অপরিহার্য করে তোলা।

আত্মনির্ভরতার এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা।

ইসরায়েল নিজেদের আরও বেশি অস্ত্র তৈরি করবে, দেশের ভেতরে উৎপাদন বাড়াবে এবং নির্দিষ্ট কিছু সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কমাবে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটি বৃহত্তর মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত অংশীদার, উপ-ঠিকাদার, পরীক্ষাগার এবং অস্ত্র উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবেও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে নির্ভরতা কমার পরিবর্তে তৈরি হতে পারে আরও গভীর পারস্পরিক নির্ভরতা। অর্থাৎ, সম্পর্কটি দুর্বল হওয়ার বদলে আরও গভীর সহাবস্থানে রূপ নিতে পারে।

সাম্প্রতিক ফিলিস্তিনি নীতিগত আলোচনায় ইসরায়েলের জন্য ভবিষ্যৎ মার্কিন সহায়তার যে সম্ভাব্য রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনটি তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এখানে আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করা উচিত নয়।

ইসরায়েলের যুদ্ধগুলো অস্ত্র ও নজরদারি প্রযুক্তির পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যেসব প্রযুক্তি তৈরি ও আরও উন্নত করা হয়, পরে সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত’ প্রযুক্তি হিসেবে বিক্রি করা যায়। ফলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা রপ্তানির ব্যাপক বৃদ্ধি একটি পারস্পরিক শক্তিবর্ধক চক্র তৈরি করে।

যুদ্ধ নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে। যুদ্ধ সেই প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখিয়ে দেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রমাণিত প্রযুক্তি নতুন রপ্তানি তৈরি করে। রপ্তানি প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করে। আর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প ভবিষ্যতে আরও যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা বাড়ায়। এটি শুধু একটি সামরিক চক্র নয়। এটি স্থায়ী সংঘাতের একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি। তাই বিপদটি এই নয় যে ইসরায়েল এমন একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যে বিশ্বের সাহায্য ছাড়া টিকে থাকতে পারবে না।

বরং বড় বিপদ হলো, ইসরায়েল এমন একটি ব্যাপকভাবে সামরিকীকৃত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার প্রভাব পুষিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা বাজারের সঙ্গে ক্রমবর্ধমানভাবে একীভূত সামরিক সম্পর্কের মাধ্যমে।

এবং এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে।

আন্তর্জাতিক চাপের লক্ষ্য যদি হয় ইসরায়েলকে দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে, ফিলিস্তিনি মানুষের জীবন ধ্বংস বন্ধ করতে এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি মেনে নিতে বাধ্য করা, তাহলে কী হবে যদি ইসরায়েল তার সামরিক-শিল্প অবকাঠামোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করে, যাতে সেই আন্তর্জাতিক চাপের কার্যকারিতা কমে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রশংসা করা কিংবা তারা নিজেরাই পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আসল রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো, দখলদারিত্বের এই সামরিক কাঠামোর জন্য অর্থ কে দেয়, অস্ত্র ও প্রযুক্তি কে সরবরাহ করে, কে এখান থেকে লাভবান হয়, কে কূটনৈতিকভাবে এই ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবছে কি না, যেখানে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িয়ে যাবে যে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করা কাঠামোগতভাবেই আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

তাহলে ‘সুপার স্পার্টা’ আর শুধু নেতানিয়াহুর অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলার বক্তব্য থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে এমন একটি ইসরায়েলি যুদ্ধযন্ত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা, যা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সামরিক-শিল্প ব্যবস্থার কাছে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলে আন্তর্জাতিক নিন্দা ও চাপ সহ্য করতে সক্ষম হবে।

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান