লন্ডনের একটি উপশহরে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে কিছু দিন আগে দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে। রাজধানী ঢাকার একটি অভিজাত এলাকায় ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি ভোট দেন। ২০০৮ সালের পর এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন।
নির্বাচনের পরদিনই তারেক রহমান কার্যত প্রধানমন্ত্রী-প্রত্যাশী হয়ে উঠেছেন। সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। সরকারি ফল প্রকাশিত হয়েছে। ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
তবে এটি শুধু নিয়মিত সরকার পরিবর্তন নয়। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার একটি সাংবিধানিক সংস্কার সম্পর্কিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ থেকে শুরু করে নতুন একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব সমর্থন করেছেন। এই উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পাবে। পুরো প্যাকেজটির লক্ষ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়া।
গত ১৫ বছর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ছিল। বিরোধীদের কারাবন্দী করা হয়েছে বা হত্যা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভরে গেছে অনুগত লোকজন দিয়ে। এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে ঘটে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান। ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে সেই আন্দোলন সরকারের পতন ঘটায়। শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে রয়েছে।
পুরোনো মিত্র ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে বিক্ষোভ দমনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সহিংস দমন–পীড়নের দায়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। গত ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকার দেশ চালিয়েছে। এই সরকারে ছিলেন টেকনোক্র্যাট ও শিক্ষাবিদেরা। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রবীণ অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস।
তবে এই নির্বাচন উদার গণতন্ত্রের জন্য নিখুঁত জয় নয়। নতুন যাত্রার কথা বলা হলেও ভোটাররা বেছে নিয়েছেন পুরোনো নেতৃত্বের দলকে। ২০০০ দশকের শুরুতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। যদিও সে সময় প্রতিবছরই দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের রেটিং ক্রমেই বেড়েছে, অর্থাৎ দুর্নীতির পরিমাণ কমেছে। ২০২৪ সালের বিপ্লবের পর দেশের কিছু এলাকায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হাত থাকা চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক এখন বিএনপির অনুগতদের নিয়ন্ত্রণে গেছে।
রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। আদালতও তাঁকে খালাস দিয়েছে এসব অভিযোগ থেকে। এখন বিএনপির নির্বাচনী কার্যালয় বিদেশফেরত নেতা-কর্মীতে ভরা। তিনি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা জোর দিয়ে বলছেন। কিন্তু তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি সত্যিই তা করবেন।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট প্রায় ৮০টি আসন পেয়েছে। এতে তারা প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে। এটি বিস্ময়কর! কারণ, অতীতে তারা কখনো ১৮টির বেশি আসন পায়নি। তারা কোনো নারী প্রার্থীও দেয় না। অনেক বাংলাদেশির মনে এখনো ১৯৭১ সালের স্মৃতি, যখন তারা দেশের স্বাধীনতা ঠেকাতে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল।
তবে জামায়াতকে অনেক ভোটার কঠোর ইসলামপন্থার জন্য ভোট দেননি। তাঁরা দলটির প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থান ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে সমর্থন করেছেন। এখন দেখার বিষয়, দলটির নেতারা সংস্কারমুখী অবস্থানে থাকবেন কি না। নাকি দলীয় গঠনতন্ত্রে থাকা পুরোনো অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘আল্লাহর নির্দেশনা’ অনুসারেই নীতি নির্ধারণের পথে হাঁটবেন।
২০২৪ সালের বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া জেন-জি তরুণরা হতাশ হতে পারেন। তাঁদের জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপি মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সমর্থককে হতাশ করেছে। ফলে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন।
নতুন সরকারের সামনে বড় সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক সংস্কার কমিটির প্রধান আলী রীয়াজ বলেছেন, বিএনপি বারবার গণভোটে পাস হওয়া সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। তিনি আশা করেন, তারা সত্যিই তা করবে। তবে ইতিমধ্যে বিএনপির কিছু উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপকারী কিছু ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এসব ব্যবস্থা সরকারে দলীয় ক্ষমতা সীমিত করতে পারে।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। অনেকেই ভোট দিতে আসেননি। এখনও অনেক বাংলাদেশি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন। তাঁদের প্রিয় দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় অনেকে ঘরেই থেকেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি বলছে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে কি না বা ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না, তা কেবল আদালতই ঠিক করবে। তবে এই অবস্থান খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন সরকার বড় সিদ্ধান্তগুলো ভুলভাবে নিলে দেশ আবার ২০০০ দশকের পথে ফিরে যেতে পারে। সেই সঙ্গে সমস্যার তালিকায় যুক্ত হতে পারে আরও একটি ইস্যু— প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামপন্থা।