আল জাজিরার বিশ্লেষণ
ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাব-আল মান্দেব প্রণালি অবরোধের ঘোষণা দিলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলমান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হতে পারে এমন আশঙ্কার তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে, এবার কী ইরান যুদ্ধ লোহিত সাগরের গণ্ডি ছাপিয়ে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে?
ইরান জানিয়েছে, গত শনিবার জাহাজে হামলায় তাদের একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর তেহরান ইউক্রেনের কূটনীতিকদের তলব করে এবং কিয়েভের বিরুদ্ধে ‘শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক’ কাজের অভিযোগ আনে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, দূরপাল্লার হামলায় ইরানের সামরিক পণ্যবাহী জাহাজ এবং একটি রুশ যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক অভিযানে সহায়তা করছে রাশিয়া।
এসব ঘটনা যখন ঘটছে তখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হামলা বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের জন্য অন্যতম নিরাপদ সামুদ্রিক পথ হিসেবে পরিচিত কাস্পিয়ান সাগরও কি এখন সংঘাতের নতুন ময়দান হয়ে উঠবে?
পরিস্থিতি অনেকটা স্পর্শকাতর। কারণ ইরান ইতিমধ্যে তার দক্ষিণ উপকূল নিয়ে চাপের মুখে আছে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির চারপাশে নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে বাণিজ্যে কোনো হুমকি এলে ইরানের অবশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোরগুলোও চাপে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে সতর্ক করে বলেছে, তেহরান তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে। ইউক্রেনের হামলা জাতিসংঘের আইনের লঙ্ঘন। এতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি দায়ীদের জবাবদিহি এবং ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর জবাবদিহিও দাবি করেন।
এই হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক্সে লিখেছেন, দূরপাল্লার হামলায় কাস্পিয়ান সাগরে ‘খুবই ভালো ফলাফল’ পাওয়া গেছে। সেখানে ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক পণ্যবাহী জাহাজ ও একটি যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক অভিযানে সহায়তা করতে স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে। জেলেনস্কি বলেন, ‘জুলাইয়ের শুরু থেকে আমরা উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর রাশিয়ার সক্রিয় স্যাটেলাইট নজরদারি লক্ষ্য করেছি। এসব ছবি পরে ইরানের কাছে যায়।’ তিনি জানান, রুশ স্যাটেলাইট চিত্র ও পরবর্তী ইরানি হামলার মধ্যে ‘স্পষ্ট সম্পর্ক’ দেখা গেছে। এই ছবিগুলো হামলার আগে প্রস্তুতির জন্য এবং পরে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য ব্যবহার করা হয়।
ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ শুরু করলে ২০২২ সাল থেকে তেহরান-কিয়েভ সম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়। কিয়েভের দাবি, মস্কো তখন থেকে ইরানি-নকশার এই ড্রোন নিজেদের মতো করে বদলে ইউক্রেনের শহরগুলোতে হাজার হাজার হামলা চালিয়েছে। তাদের হিসাবে, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনী ৪৪ হাজারের বেশি ইরানি-নকশার ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে ইউক্রেন। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোকে ড্রোনবিধ্বংসী প্রযুক্তি দিয়ে দিয়ে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি জানান, ইরানিরা এই ইউক্রেনীয় হামলায় খুব একটা খুশি নয়, একই সঙ্গে তারা দক্ষিণ উপকূলে মার্কিন অবরোধেরও মোকাবিলা করছে। তিনি বলেন, উত্তর উপকূলে চাপ বাড়ায় দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। ইরান এখনো জানায়নি, তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে কি না। যদিও ইরানি বিশ্লেষকেরা বলেছেন, কিয়েভ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থার সীমার মধ্যে রয়েছে, ফলে তেহরান চাইলে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে গত রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, আরও সংঘাত এড়াতে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চলছে। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনের এই হামলা তেহরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করে তাদের কিছু ছাড় দিতে বাধ্য করার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রেসুল সেরদার আতাস বলেন, ইরান ইতিমধ্যে দক্ষিণ উপকূলীয় প্রদেশগুলোতে, হরমুজ প্রণালিতে, ওমান সাগরে, এমনকি ভারত মহাসাগরেও সংঘাতের মুখোমুখি হচ্ছে, যেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এখন কাস্পিয়ান সাগরও যদি ইরানের জন্য বাণিজ্যিক দিক থেকে অনিরাপদ হয়ে ওঠে সেটা হবে উদ্বেগের।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অন্যান্য সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ ব্যাহত করার চেষ্টা তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। এর মধ্যে যদি কাস্পিয়ান সাগরে ইরান-সংশ্লিষ্ট জ্বালানি ও সামরিক রসদের জাহাজে হামলা হয় তবে জটিল হবে। আর এটা ভবিষ্যৎ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব মাইকেল মালরয় আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করায়, ওয়াশিংটনের বিকল্প ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে এবং এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘একটি বিকল্প হলো—প্রণালি বন্ধ রেখেই যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটতে পারে। পরমাণু কর্মসূচি এখনো অমীমাংসিত থাকায় আমি মনে করি না এমনটা ঘটবে; সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হবে।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে হয় অচলাবস্থা, নয়তো হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেই কার্যত নৌ-অবরোধ বজায় রাখার পথ খোলা আছে—তবে এতে সারা বিশ্বে সমস্যা তৈরি হবে।
আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন রাফসান জানি