হোম > বিশ্লেষণ

বিভক্ত হয়ে ইতিহাসের দুর্বলতম অবস্থায় মুসলিম ব্রাদারহুড

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্যদের ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল। ছবি: এএফপি

১৭ জুলাই, ২০২৬। তিউনিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত মর্নাগিয়া কারাগার। কমপ্লেক্সের ভেতরের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। হঠাৎ নিজ সেলে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান ৮৫ বছর বয়সী রশিদ ঘানুশি। তিনি তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার। মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শে অনুপ্রাণিত তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দল এন্নাহদার প্রতিষ্ঠাতা ঘানুশির পরিণতি যেন মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মুহাম্মদ মুরসির মতোই হতে চলেছে। ২০১২ সালে নির্বাচিত হয়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন মুরসি, কিন্তু ২০১৯ সালে কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘানুশির পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাঁর মতাদর্শিক সহযাত্রীদের ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু প্রভাবেরই প্রতিচ্ছবি। দেড় দশক আগে মুসলিম ব্রাদারহুড সংশ্লিষ্ট দলগুলো মিসরের প্রেসিডেন্টের পদে ছিল এবং তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি আসন। কাতারের জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরা আরব জনগণের কাছে তাদের বিজয়বার্তা জোরালোভাবে পৌঁছে দিত। ২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়ায় শুরু হয়ে ২০১১ সালের গোড়ায় আরব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আরব বসন্তের প্রাথমিক বিজয়ী বলেই মুসলিম ব্রাদারহুডকে মনে হচ্ছিল।

কিন্তু শিগগিরই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাগুলো নিজেদের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী বছরগুলোতে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতারা কারাবন্দি হন অথবা নির্বাসিত হয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। গত এক বছর ছিল বিশেষভাবে কঠিন। নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনকে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। ১৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র মিসর ও জর্ডানের শাখাগুলোকে ‘বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, কারণ তারা হামাসকে সহায়তা করেছে।

হামাস মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি শাখা থেকেই গড়ে উঠেছিল। লেবাননের শাখাকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মে মাসে নতুন মার্কিন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের আওতায় মুসলিম ব্রাদারহুডকে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের পাশাপাশি আধুনিক জিহাদবাদের অন্যতম উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জর্ডান ২০২৫ সালের এপ্রিলেই সংগঠনটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে এবং এরপর থেকে এর রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্টের ওপরও নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম ব্রাদারহুডের ঠিক কোন অংশকে লক্ষ্য করছে, তা পরিষ্কার নয়। ২০২১ সাল থেকে সংগঠনটির দুটি প্রধান গোষ্ঠী রয়েছে। ওই বছর লন্ডনে নির্বাসন থেকে মুসলিম ব্রাদারহুড পরিচালনাকারী ইব্রাহিম মুনির তুরস্কে সংগঠনটির কাঠামো ভেঙে দেন। অন্যদিকে সংগঠনটির মহাসচিব মাহমুদ হুসেইন দাবি করেন, মুনির নিজেই পদচ্যুত হয়েছিলেন। এখন প্রতিটি গোষ্ঠীর নিজস্ব নেতা, নিজস্ব শুরা কাউন্সিল এবং নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে। উভয় পক্ষই দাবি করে, তারাই প্রকৃত মুসলিম ব্রাদারহুড।

মুনিরের মৃত্যুর পর তাঁর নেতৃত্বাধীন অংশের দায়িত্ব গ্রহণকারী সালাহ আবদেল হক মার্কিন আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের ওই সন্ত্রাসী তকমার বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু ইস্তাম্বুলভিত্তিক শাখা জানিয়ে দিয়েছে, তারা মনে করে না তাদের মূল সংগঠন অন্য কারও হয়ে জবাব দেওয়ার যোগ্যতা রাখে। অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি হয়েও দুই অংশ এক কণ্ঠে কথা বলতে পারছে না।

তুরস্কভিত্তিক শাখার হুসেইনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তুরস্কের সম্পত্তি, বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো এবং অর্থ। অন্যদিকে আবদেল হক আন্তঃদেশীয় সংগঠনটি পরিচালনার দাবি করলেও তাঁর হাতে দেখানোর মতো সম্পদ খুবই কম। সংগঠনটির সাবেক সদস্যরা উভয় নেতাকেই রাজনীতি ছেড়ে আবার প্রচার ও ধর্মীয় দাওয়াতের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মিসরে সংগঠনটির ঐতিহাসিক জন্মভূমিতেও তাদের ক্ষমতায় থাকার সময়টিকেই সরকারি স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের সুপ্রিম গাইড মুহাম্মদ বাদি কারাগারে রয়েছেন। প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ক্ষমা ঘোষণা করেন, কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যদের ক্ষেত্রে তা খুব কমই প্রযোজ্য হয়। একসময় সংগঠনটির বিশাল কল্যাণমূলক কর্মসূচির অর্থ জোগাত যে অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সিসি সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদও সিসির পথ অনুসরণ করে ঘানুশিকে কারাগারে বন্দি করেছেন।

গাজায় ইসরায়েল হামাসকে ব্যাপকভাবে আঘাত করে কার্যত ভূমধ্যসাগরের বালিতে পিষে দিয়েছে। হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, আর ইসরায়েলি গুপ্তাঘাতকের দলগুলো গোটা অঞ্চলজুড়ে হামাসের নেতাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। হামাস এখনো টিকে আছে, কিন্তু ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। গাজার অনেকেই হামাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

সিরিয়াও মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্য আরেকটি অপমানের ক্ষেত্র। ২০২৪ সালে আসাদ সরকার পতনের পর দামেস্ক দখল করে সুন্নি জিহাদিরা, মুসলিম ব্রাদারহুড নয়। যুদ্ধের সময় সংগঠনটি সিদ্ধান্তহীনতায় সময় কাটিয়েছে এবং যারা বাস্তবে লড়াই করেছে, তাদের কাছে পেছনে পড়ে গেছে। সিরিয়ার নতুন পার্লামেন্টে তাদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার দীর্ঘদিনের মুসলিম ব্রাদারহুড-সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা আহমেদ জেইদান পরামর্শ দিয়েছেন, সংগঠনটির সিরীয় শাখার উচিত নিজেদের বিলুপ্ত করে দেওয়া। ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ওপর বিশেষজ্ঞ সিরীয় বিশ্লেষক আবদুররহমান আল-হাজ আল জাজিরায় লিখেছেন, নতুন সিরিয়ায় রাজনৈতিক ইসলাম আর আগের মতো প্রাসঙ্গিক নয়।

সম্ভবত তাই।

কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুডকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করা ঐতিহাসিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে মিসরের নেতা জামাল আবদেল নাসের গোষ্ঠীটিকে নির্মমভাবে দমন করেন। সংগঠনটির প্রধান তাত্ত্বিক সাইয়্যিদ কুতুবকে ১৯৬৬ সালে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। পরবর্তী চার দশকের অধিকাংশ সময় মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ অবস্থায় ছিল। তবু ২০০৫ সালে সংগঠনটির অনুসারীরা মিসরের পার্লামেন্টে ৮৮টি আসন জিতেছিলেন এবং ২০১২ সালে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট পদও দখল করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত এক পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘ঝড় সামলে টিকে থাকার ক্ষেত্রে তারা অসাধারণ দক্ষ।’

দমন-পীড়ন সরকারি নথিপত্রে সংগঠনটির অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ কেন এতে যোগ দেয়, সেই কারণগুলো মুছে দিতে পারে না। মিসরে সেই কারণগুলো এখনো আগের মতোই তীব্র। দেশটির দুর্বল অর্থনীতি টিকে আছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আমানতের ওপর। তরুণ স্নাতকদের বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকট ২০১০ সালের মতোই তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে। তিউনিসিয়ার অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। আরব বসন্তের সূচনা ঘটানোর সময় দেশটি যেমন অর্থনৈতিক দুরবস্থায় ছিল, এখনো অনেকটাই তেমনই আছে।

গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ আরব সরকারগুলোকে হয় অসহায়, নয়তো এই সংঘাতের সহযোগী হিসেবে প্রতীয়মান করেছে। গাজা যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তখন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাকালীন দাবি—আরব বিশ্বের অপমান বস্তুগত হওয়ার আগে আধ্যাত্মিক—এখনো অঞ্চলটির বহু ক্ষুব্ধ মানুষের কাছে অর্থবহ। সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং আরবদের মর্যাদাবোধের প্রতি শক্তিশালী আবেদনকে ভিত্তি করে মুসলিম ব্রাদারহুড নিজেদের শিকড় গেড়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্বের মধ্যে এই দুটিরই এখন মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।

২০২৮ সালের মার্চে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ হবে। নেতৃত্ব যতই বিভক্ত থাকুক, তখনও সংগঠনটিকে সক্রিয় ও প্রাণবন্ত অবস্থায় দেখা যাবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। মানব ইতিহাসে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে বারবার মৃত ঘোষণা করার এই অদ্ভুত অভ্যাসটি অবশ্য মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষেত্রেও খুব একটা কাজে লাগেনি।

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান