হোম > বিশ্লেষণ

সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের জোট কি তবে ‘মুসলিম ন্যাটো’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

সৌদি আরবের মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। ছবি: এএফপি

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের নেতারা পবিত্র মক্কা নগরীতে বৈঠক করে একটি নতুন প্রতিরক্ষা জোট গঠনে সম্মত হয়েছেন। গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে জোটটির কার্যক্রমের বিস্তারিত কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে এটি আদৌ কতটা কার্যকর সামরিক জোটে পরিণত হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। এই জোটের বিষয়ে আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) পাঁচটি দিক পর্যালোচনা করেছে নিক্কেই এশিয়া।

কীভাবে কাজ করবে নতুন জোট

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক-সামরিক কমিটি গঠন করা হবে। সৌদি আরবে একটি সাধারণ সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পর জোটটি কার্যক্রম শুরু করবে।

প্রথমদিকে অগ্রাধিকার পাবে সামরিক বাহিনীগুলোর পারস্পরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ সরবরাহ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা। কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে কী ধরনের গোয়েন্দা সহায়তা, গোলাবারুদ বা সামরিক ইউনিট প্রয়োজন হতে পারে, তা আগেই নির্ধারণ করা হবে।

ফিদান বলেছেন, জোটটি প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি। এমনকি ভবিষ্যতে আরও মুসলিম দেশকে এতে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। মিসরকে সম্ভাব্য পরবর্তী সদস্য হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে—কাতার, আজারবাইজান, জর্ডান ও সিরিয়াও ভবিষ্যতে জোটে যুক্ত হতে পারে।

হামলা হলে কি তিন দেশ একসঙ্গে যুদ্ধে নামবে

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এটি। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের জাজান এলাকায় সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় হামলা চালালেও তুরস্ক বা পাকিস্তানকে সৌদি আরবের পাল্টা অভিযানে সরাসরি অংশ নিতে দেখা যায়নি।

তুরস্কের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও ইঙ্গিত মিলেছে, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই অন্য দুই দেশ দ্রুত সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ বলেছেন, দেশগুলোর মধ্যে সংহতি বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা সম্ভব; কোনো সংঘাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা দ্রুত সামরিকভাবে যুক্ত হওয়া তার একমাত্র রূপ নয়।

অর্থাৎ, চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে প্রতিক্রিয়ার ধরন পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হতে পারে।

তাহলে কি এটি ‘মুসলিম ন্যাটো’

চুক্তিতে কোনো সদস্যের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা থাকায় একে অনেকে ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা করছেন। হাকান ফিদানও বলেছেন, প্রযুক্তিগতভাবে এর অবস্থান ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো।

তবে বিশেষজ্ঞরা এখনই একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলতে নারাজ। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলি বাকিরের মতে, এটি আপাতত কঠোর সামরিক জোটের চেয়ে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে তিন দেশের পরামর্শ, সমন্বয় ও সহযোগিতার একটি কাঠামো।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ড্যানি সিত্রিনোভিচও মনে করেন, ‘মুসলিম ন্যাটো’ থেকে জোটটি এখনো অনেক দূরে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার বিভাজন, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতপার্থক্য, একটি বৃহৎ অভিন্ন সামরিক জোট গঠনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ।

তুরস্কের জন্যও এটি ন্যাটোর বিকল্প নয়। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইলমাজ স্পষ্ট করেছেন, মক্কা চুক্তি তুরস্কের ন্যাটো সদস্যপদের পরিপূরক, বিকল্প নয়।

সৌদি আরবের লাভ কোথায়

পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের আগে থেকেই একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। কিন্তু তুরস্ককে যুক্ত করে নতুন জোট গঠনের মাধ্যমে রিয়াদ আরও বিস্তৃত সামরিক ও কৌশলগত নিরাপত্তা কাঠামো পাচ্ছে।

তুরস্কের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে তুরস্কের তৈরি আধুনিক অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যৌথভাবে উন্নয়ন ও সংগ্রহের সুযোগও তৈরি হবে।

তুরস্ক ও পাকিস্তানের লাভ কী

তুরস্কের উচ্চাভিলাষী প্রতিরক্ষা শিল্প—বিশেষ করে পঞ্চম প্রজন্মের কেএএএন যুদ্ধবিমান ও ‘স্টিল ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্প—বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। সৌদি আরব বিনিয়োগকারী ও ক্রেতা হিসেবে যুক্ত হলে আঙ্কারার আর্থিক চাপ কমতে পারে।

পাকিস্তানের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনার মধ্যে তুরস্কের ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ইতিমধ্যে পাকিস্তানের হাতে রয়েছে। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

ফলে মক্কা জোট এখনই ‘মুসলিম ন্যাটো’ না হলেও, তিন দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে মিসর, কাতার, জর্ডান বা অন্য দেশগুলো এতে যোগ দিলে জোটটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।