পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে গত শনিবারের সমন্বিত হামলা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কেবল একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং দেশটির ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসিনি গোইতার সামরিক সরকার বর্তমানে এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যা গত ১৫ বছরে দেশটিতে দেখা যায়নি।
শনিবারের হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। একদিকে রাজধানী বামাকোর সন্নিকটে কাটি গ্যারিসনে হামলা চালিয়ে সামরিক কমান্ডকে ব্যতিব্যস্ত রাখা হয়েছে, অন্যদিকে উত্তরের কৌশলগত শহর কিদাল দখল করে নেওয়া হয়েছে। কিদাল শহরটি মালির উত্তরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য প্রতীকী ও সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পতন জান্তা সরকারের আঞ্চলিক কর্তৃত্বকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
মালির নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জেএনআইএম এবং তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদী এফএলএর মধ্যে অভূতপূর্ব সমন্বয়। আদর্শিক ভিন্নতা সত্ত্বে ঐক্য এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতার বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ঐতিহাসিকভাবে তারা একে অপরের বিরোধী হলেও বর্তমানে জান্তা সরকার ও রুশ বাহিনীকে হটাতে তারা সাধারণ প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে।
তাদের এই জোটবদ্ধ আক্রমণ প্রমাণ করে, বিদ্রোহীরা এখন কেবল গেরিলা যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা বড় আকারের সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
রাশিয়ার ভূমিকা
মালি সরকার ফরাসি ও জাতিসংঘ বাহিনীকে সরিয়ে রাশিয়ার ‘আফ্রিকা কোর’ (সাবেক ভাগনার)-এর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিল। তবে কিদাল থেকে লড়াই ছাড়াই রুশ বাহিনীর পশ্চাদপসরণ নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এটি রাশিয়ার কৌশলগত পিছু হটা নাকি সীমাবদ্ধতা? রুশ আধা সামরিক বাহিনীর কিদাল ত্যাগের ঘটনাটি স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। তারা এটিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন। এটি স্পষ্ট যে রুশ মার্সেনারিরা সরাসরি বড় ধরনের সংঘর্ষের চেয়ে তাদের লোকবল ও সরঞ্জাম রক্ষা করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে মস্কো দাবি করেছে, তারা গোইতাকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। এর মাধ্যমে তারা মালি সরকারের ওপর তাদের রাজনৈতিক প্রভাব আরও সুদৃঢ় করতে চাচ্ছে।
তবে মালিতে এখন অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকট ও প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংঘাতের সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারা নিহত হওয়া জান্তা সরকারের জন্য এক বড় ধাক্কা। তিনি ছিলেন মালি ও রাশিয়ার সামরিক সম্পর্কের প্রধান সমন্বয়কারী। তাঁর অনুপস্থিতিতে জান্তা সরকারের ভেতরে ক্ষমতা নিয়ে নতুন কোনো দ্বন্দ্ব শুরু হয় কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকেরা শঙ্কিত। এ ছাড়া জান্তা প্রধান গোইতার দীর্ঘ নীরবতা ও কেবল ছবির মাধ্যমে উপস্থিতি তাঁর নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করেছে।
মালির এই অস্থিতিশীলতা পার্শ্ববর্তী বুর্কিনা ফাসো ও নাইজারের ওপরও প্রভাব ফেলছে। সাহেল অ্যালায়েন্সের (এইএস) দেশগুলো পারস্পরিক সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান সংকটে মালির সমর্থনে তাদের দৃশ্যমান কোনো হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রাশিয়ার পিছু হটা এবং জোটসঙ্গীদের দূরত্ব বজায় রাখার কারণে কৌশল মালিতে গৃহযুদ্ধের শঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। কিদাল দখলের পর বিদ্রোহীরা এখন গাও বা দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হলে মালি এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে।
সাধারণ মানুষ এবং সেনাবাহিনীর নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে জান্তা সরকারের নিরাপত্তা কৌশলের ব্যর্থতা নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। এটি ভবিষ্যতে আরেকটি অভ্যুত্থান বা গণ-অসন্তোষের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, জান্তা সরকার এখন রাশিয়ার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ফলে মালি এখন মস্কোর দাবার দানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে দেশটির জাতীয় স্বার্থের চেয়ে রাশিয়ার কৌশলগত লাভ বেশি প্রাধান্য পেতে পারে।
মালির বর্তমান পরিস্থিতি একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহীদের নতুন রণকৌশল এবং রুশ বাহিনীর সীমাবদ্ধতা দেশটিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আসিনি গোইতার সরকার কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে, নাকি তাকে নতুন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে, তা এখন দেখার বিষয়।