হোম > বিশ্লেষণ

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ অভিযোগ ইউরোপের, নিজেদেরই নেই প্রস্তুতি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপ ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ অভিযোগ তুললেও নিজেদেরই কোনো প্রস্তুতি নেই। ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের দেশগুলো বেশ কিছুদিন ধরে অভিযোগ করছে, রাশিয়া তাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ চালাচ্ছে। রাশিয়া এই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে। কিন্তু, যে ইউরোপ এই অভিযোগ করছে তারাই রাশিয়ার এই তথাকথিত ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনটাই সতর্ক করেছেন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তাদের মতে, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বিরুদ্ধে মস্কোর চলমান অভিযান দমন করতে ইউরোপকে দ্রুত নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে হবে। তা না হলে ক্রেমলিনের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, গত আগস্টে জার্মানির লিপজিগ/হালে বিমানবন্দরে সামরিক মানের বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা রাশিয়ার এই আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের মাত্রা স্পষ্ট করেছে। ইউরোপ এই ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে। তবে রাশিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ন্যাটোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার এমন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে মস্কো কার্যত শাস্তির ভয় ছাড়াই এগোচ্ছে। বিদ্যমান প্রতিরোধব্যবস্থা যে যথেষ্ট নয়, এই ঘটনাও তা দেখিয়েছে। এর জবাবে ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীকে সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।

লিপজিগের এই ঘটনা ইউরোপের বিরুদ্ধে মস্কোর ক্রমবর্ধমান ‘হাইব্রিড’ অভিযানের বিপরীতে এক কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, ন্যাটো এমন হামলা ঠেকাতে পারছে না, যেগুলো জোটের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘আর্টিকেল–৫’ সক্রিয় করার মতো মাত্রায় পৌঁছায় না।

পশ্চিমা বিশ্বের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার যে, আর্টিকেল ৫-এর নিচের মাত্রার উসকানি ঠেকাতে আমরা যথেষ্ট কিছু করছি না।’ তিনি বলেন, প্রচলিত ও পারমাণবিক পর্যায়ে রাশিয়ার বড় ধরনের উত্তেজনা ঠেকানোর জন্য ন্যাটোর প্রতিরোধব্যবস্থা যথেষ্ট। তবে ‘হাইব্রিড যুদ্ধের ক্ষেত্রে আমাদের সত্যিই নতুন করে চিন্তা করতে হবে।’

রুশ সেনারা ইউক্রেনে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থার মধ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সময়, গত দুই বছর ধরে রাশিয়ার মদদপুষ্ট গোষ্ঠী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইউরোপের মাটিতে গোপনে আগ্রাসী যুদ্ধ চালাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই অভিযানের মধ্যে রয়েছে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছড়ানো, সাইবার হামলা, গুদামে অগ্নিসংযোগ, রাজনীতিকদের বাড়ি ও গাড়িকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং সমুদ্রের নিচে থাকা যোগাযোগের তার কেটে দেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত করা।

সামরিক তত্ত্বে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সাধারণত ‘হাইব্রিড’ সংঘাত বলা হয়। এতে এমন কর্মকাণ্ড চালানো হয়, যেগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করার সুযোগ থাকে। অনেক সময় গোয়েন্দা সদস্য বা অন্য পক্ষকে ব্যবহার করে কম খরচে এসব অভিযান চালানো হয়। উদ্দেশ্য থাকে সমাজে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা, কিন্তু একই সঙ্গে এমন পর্যায়ে না যাওয়া যাতে তা প্রচলিত সামরিক আগ্রাসন বা সরাসরি হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে গত সপ্তাহে বলেছেন, ‘রাশিয়া ক্রমেই আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।’

লিপজিগ বিমানবন্দরের হামলার চেষ্টাকে বার্লিন গত সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে এই ঘটনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দ্বিতীয় এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, এই ঘটনার ‘খুব, খুব গুরুতর প্রভাব’ পড়েছে ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে। তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই একটি প্রতিক্রিয়া তৈরির জন্য ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

রাশিয়ার কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় ন্যাটোর হিসাব আরও জটিল হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের কারণে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে রাশিয়ার প্রতি ওয়াশিংটনের নীতিতে পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা। এর আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন মস্কোকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছিল যে ন্যাটো জোটের সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো যাবে না। কিন্তু ট্রাম্প ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে আসা হুমকিকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

লিপজিগের হামলার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেন, পুতিন ‘ন্যাটো ভূখণ্ডে হামলা করতে চাইছেন না।’ এবং তিনি এই বিষয়ে ‘উদ্বিগ্নও’ নন।

ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাশিয়ার তথাকথিত ‘উপদ্রবমূলক’ হামলা আরও বাড়তে পারে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে থাকতে পারে ভাঙচুর, বিভিন্ন কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং এমনকি বেসামরিক স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ। তৃতীয় এক কর্মকর্তা বলেন, আগামী বছর ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার সময় এসব হামলা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো এবং রুশ সামরিক মতবাদ বিশেষজ্ঞ কিয়ার গাইলস বলেন, ‘আমি মনে করি না, ইউরোপে রাশিয়ার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বদলেছে। পরিবর্তনটা আমাদের মধ্যে, অর্থাৎ যারা হামলার শিকার হচ্ছে তাদের মধ্যে।’ তিনি বলেন, ‘সমস্যা হলো, কোন ঘটনাকে আর্টিকেল ৫-এর আওতায় পড়বে, তার সীমারেখা অস্পষ্ট। যতক্ষণ এই সীমা নির্ধারিত না হচ্ছে, রাশিয়া সেটিকে আরও প্রসারিত করতে থাকবে। আমরা যদি কোনো মূল্য দিতে বাধ্য না করি, তাহলে তারা আরও এগিয়ে যেতে থাকবে।’

বিশেষ করে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ন্যাটোকে ‘হাইব্রিড’ সংঘাত মোকাবিলার কৌশল নতুন করে ভাবার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য কোন মাত্রার হামলাকে যথেষ্ট হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সেই সীমাও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এর উদ্দেশ্য হলো, মস্কো যেন মনে না করে যে ইউরোপীয় সমাজগুলোর বিরুদ্ধে ইচ্ছেমতো ছোটখাটো হামলা চালিয়েও কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না।

ন্যাটোর একটি ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘রাশিয়ার ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা ও বেপরোয়া আচরণ যে বেড়েছে, আমরা তা স্পষ্টভাবেই দেখতে পাচ্ছি।’ তিনি রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের মাত্রাকে ‘নজিরবিহীন’ বলেও উল্লেখ করেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ন্যূনতম সীমার নিচে’ হামলার ধারণা মস্কোকে ধীরে ধীরে সেই সীমা আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা এটাকে নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিণত হতে দিতে পারি না।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিপজিগের হামলার ঘটনায় জার্মানি রাশিয়াকে দায়ী করতে চার সপ্তাহ সময় নিয়েছে। মস্কোর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের অনিচ্ছার এটি একটি উদাহরণ। তাদের মতে, এমন দেরি রাশিয়াকে আরও উৎসাহিত করে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের কৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো চার্লি এডওয়ার্ডস বলেন, ‘লিপজিগের ঘটনার পর জার্মানরা এটা (তাৎক্ষণিকভাবে) করেনি, বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর।’ এডওয়ার্ডস গত বছরের পোলিশ সরকারের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে বার্লিনের অবস্থানের তুলনা করেন।

গত বছর পোল্যান্ডে রেললাইনের দুটি অংশ বিস্ফোরণে উড়ে যায়। এতে একটি বেসামরিক ট্রেন প্রায় লাইনচ্যুত হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছিল। ওই ঘটনার দুই দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দায়ী করেন এবং ন্যাটোর সঙ্গে পরামর্শের আহ্বান জানান। এডওয়ার্ডস বলেন, ‘মনে হচ্ছে, জার্মানরা এখনো এসব ঘটনায় তাদের প্রতিক্রিয়া কতটা দেওয়া যাবে, তা হিসাব করছে রাশিয়াকে আরও উত্তেজিত না করার দিক থেকে। অথচ পুরো বিষয়টি এভাবেই দেখা ভুল।’