১১ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে স্বাগত জানান এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত করেন। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর প্রথমবার সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই আলোচনা হয়।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একদম ভিন্নধর্মী এক ঘোষণা দেয়। রাষ্ট্র পরিচালিত সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) মাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে রিয়াদ নিশ্চিত করে, গত বছর স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির (এসএমডিএ) অধীনে পাকিস্তানের একটি সামরিক কন্টিনজেন্ট কিং আবদুল আজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই ঘাঁটিতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান এবং সহায়ক বিমান পাঠানো হয়েছে। রিয়াদের পক্ষ থেকে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে সামরিক সমন্বয় জোরদার এবং কার্যক্ষমতা বাড়ানোই এই মোতায়েনের উদ্দেশ্য।
পাকিস্তান সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর, তথ্য মন্ত্রণালয় কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—কেউই আল জাজিরার প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।
সৌদি আরবের এ ঘোষণাটি মূলত পাকিস্তানের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এল। এমন একসময়ে এ ঘটনা ঘটছে, যখন চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, বিভিন্ন দেশে প্রাণহানি ঘটিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। একদিকে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। গত শনিবার তারা দুই দেশের প্রতিনিধিদলের আতিথেয়তা করেছে এবং আলোচনা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলেও তা চালিয়ে নিতে চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, এসএমডিএ চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান তার পুরোনো মিত্র সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতির আগে ইরান বারবার সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছিল এবং তেহরান এখনো এমন কোনো গ্যারান্টি দেয়নি যে—তারা ভবিষ্যতে সৌদি বা অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে আর হামলা করবে না।
আপাতত পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তাঁরা উভয় ভূমিকা সফলভাবে পালন করতে পারবেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, ইসলামাবাদ যত রাউন্ড প্রয়োজন ততবারই আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সব পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখতে শাহবাজ শরিফ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সৌদি আরব সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া তুরস্কসহ অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোতেও তার যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ এবং ওয়াশিংটন-তেহরান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হতে যাওয়ায় পাকিস্তানের এই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
রিয়াদ-ইসলামাবাদ গভীর সম্পর্ক
এই জটিল পরিস্থিতির মূলে রয়েছে এসএমডিএ চুক্তি। ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হওয়ার ঠিক এক দিন আগে সৌদি অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-জাদান সংক্ষিপ্ত সফরে পাকিস্তানে আসেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি এক বিবৃতিতে বলা হয়, শাহবাজ শরিফ পাকিস্তানের অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে রিয়াদের ‘দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহায়তার’ ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এই সফর পাকিস্তান ও সৌদির মধ্যকার প্রতিরক্ষা, কূটনীতি ও অর্থনীতির গভীর সম্পর্ককে আবারও প্রমাণ করেছে। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রিয়াদের আল-ইয়ামামা প্রাসাদে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে এসএমডিএ চুক্তি সই হয়। সেই অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও ছিলেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এক দেশের ওপর আক্রমণ হলে তা অন্য দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
এই চুক্তির বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান সব সময়ই স্পষ্ট ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন দিন পর, গত ৩ মার্চ সিনেটে ভাষণ দেওয়ার সময় ইসহাক দার সোজাসুজি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে এবং ‘সারা বিশ্বই তা জানে।’ তিনি আরও জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই চুক্তির দায়বদ্ধতা ও বাধ্যবাধকতার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। শাহবাজ শরিফও একইভাবে অঙ্গীকার করেছেন, পাকিস্তান সব সময় সৌদি আরব এবং দেশটির জনগণের পাশে থাকবে।
এখনো যা অস্পষ্ট রয়ে গেছে তা হলো—কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পাকিস্তান অথবা সৌদি আরব একে অপরের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে। তাদের কি কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে? সামরিক হস্তক্ষেপে অংশ নেওয়ার জন্য কি একে অপরকে নির্দিষ্টভাবে অনুরোধ করতে হবে? সৌদি আরব কি এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের কাছে কোনো প্রতিরক্ষা সহায়তা চাওয়া থেকে বিরত রয়েছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এসএমডিএ কার্যকর রয়েছে তা বোঝাতে সৌদি আরব ও পাকিস্তান এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার উদ্দেশ্য হলো অন্য দেশগুলোকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া। অন্যদিকে, চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে যে অস্পষ্টতা রয়েছে, তা মূলত একটি প্রতিবন্ধক (ডিটারেন্ট) হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবের কোনো শত্রু দেশই নিশ্চিতভাবে জানতে পারবে না যে ঠিক কখন তাদের পাকিস্তানের সামরিক শক্তির মোকাবিলা করতে হবে।
পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, আরব বিশ্বে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে পাকিস্তানি বৈমানিকেরা আরব বিমানবাহিনীর হয়ে বিমান চালিয়েছিলেন। এ ছাড়া ১৯৬০-এর দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানি বাহিনী নানা ভূমিকায় মোতায়েন রয়েছে। সৌদি আরবে ১৯৬৭ সাল থেকে হাজার হাজার সামরিক সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে পাকিস্তান। ১৯৮২ সালের একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়।
সত্তর ও আশির দশকে সৌদি আরবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন ছিল। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের তেল অবকাঠামো রক্ষায় তারা নিয়োজিত ছিল—ঠিক যে অঞ্চলে বর্তমান বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও, এসএমডিএই প্রথম চুক্তি যা আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে এই প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করেছে যে একজনের ওপর হামলা হলে তা অন্যজনের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে।
কঠিন ভারসাম্য রক্ষা
ইসলামাবাদভিত্তিক ভার্সো কনসালটিংয়ে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আজিমা চিমা বলেন, এই চুক্তির প্রয়োগ একটি সুনির্দিষ্ট হিসাব-নিকাশের প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘এসএমডিএর প্রয়োগ মূলত এই দ্বন্দ্বে সৌদিদের দেখানো উল্লেখযোগ্য সংযমেরই একটি মূল্য। সম্ভবত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার আগে এটি সৌদিদের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত ছিল, যখন পাকিস্তান ইরানের প্রতি তাদের সর্বোচ্চ ক্ষোভের ইঙ্গিত দিয়েছিল।’
তাঁর মতে, সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে এই নিরাপত্তা অংশীদারত্বকে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো হুমকি—তা ইরান বা ইসরায়েল যে পক্ষ থেকেই আসুক না কেন—তারা এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। একই সময়ে পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কও নেই। চিমার মতে, এই বিষয়গুলো তেহরানের কাছে পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
তিনি বলেন, ‘ইরানিরা জানে যে পাকিস্তান তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। তারা এটাও বুঝবে যে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে পাকিস্তান নিরপেক্ষ থাকবে না, তবে তারা এ-ও জানে যে পাকিস্তান প্রথমে মধ্যস্থতার পথই খুঁজবে।’
রিয়াদভিত্তিক কিং ফয়সাল সেন্টার ফর ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজের সহযোগী ফেলো উমর করিম বলেন, পাকিস্তানের এই কৌশলে যুক্তি ও ঝুঁকি—দুই-ই রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান একই সঙ্গে মধ্যস্থতার দায়িত্ব এবং সৌদি আরবের প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি—এই দুইয়ের মধ্যে এক কঠিন ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে।’ তিনি মনে করেন, ইসলামাবাদ হয়তো হিসাব করেছে যে তারা এই উভয় ভূমিকা পালন করতে পারবে। এসএমডিএর প্রতিশ্রুতিকে তারা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সৌদি আরবের স্থাপনাগুলোতে হামলা রোধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চলবে ততক্ষণ এই কৌশল কাজ করতে পারে। কিন্তু যদি বৈরিতা আবার শুরু হয়, তবে এই কৌশল ভেঙে পড়তে পারে এবং পাকিস্তানকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে।’ মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ আরও যোগ করেন, সম্ভবত এই কারণেই পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বর্তমান ব্যবস্থাকে যত দিন সম্ভব অক্ষুণ্ন রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। করিম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ধারাবাহিকতা পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি অবশ্য কিছুটা আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় সম্পর্ক এবং জাতিগত ও ভাষাগত মিলের কারণে পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বিপন্ন করবে বলে আমি মনে করি না।’ তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, এই সামরিক মোতায়েনের লক্ষ্য হয়তো অন্য কেউ। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্বের এই সৌদি পদক্ষেপটি ইরানের চেয়ে ইসরায়েলের দিকেই বেশি লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে।’
ভারসাম্যের সীমাবদ্ধতা
পাকিস্তানের সাবেক এক থ্রি-স্টার জেনারেল অবশ্য সতর্ক করে দিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারী এবং সৌদি আরবের সামরিক মিত্র—এই উভয় ভূমিকা পালন করার সুযোগ ইসলামাবাদের জন্য খুবই সীমিত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান উভয় ভূমিকা ধরে রাখতে পারবে কেবল তখনই, যদি যেকোনো সামরিক মোতায়েন কঠোরভাবে আত্মরক্ষামূলক, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে। যে মুহূর্তে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট আক্রমণাত্মক অভিযানে মোড় নেবে অথবা আক্রমণাত্মক সমন্বয়ের ধারণা তৈরি হবে, অমনি এই দ্বৈত ভূমিকার পতন ঘটবে।’
তিনি সৌদি আরবে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সেনা মোতায়েনের ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এ বিষয়টিই ইরানের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে—তা নির্ধারণ করে দিতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আস্থা টিকে থাকবে কি না, তা পাকিস্তানের উদ্দেশ্যের চেয়ে ইরানের উপলব্ধির ওপর বেশি নির্ভর করবে। তবে এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যের পেছনে অতীত উদাহরণ রয়েছে।’
রিয়াদে এই মোতায়েনকে একটি ডিটারেন্ট ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত সৌদি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সামরিক বিশ্লেষক ফয়সাল আলহামাদ ইনডিপেনডেন্ট অ্যারাবিয়াকে বলেছেন, এই পদক্ষেপটি ‘কারও ওপর হামলার প্রস্তুতির চেয়ে বরং একটি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ’। তিনি বলেন, পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে বিমান মোতায়েন এই বার্তাই দেয়, সৌদি আরবের সবচেয়ে অরক্ষিত এলাকাগুলোকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। এই প্রদেশটি সৌদি আরবের বেশির ভাগ তেল অবকাঠামোর কেন্দ্রস্থল, যা যুদ্ধের সময় দেশটিতে ইরানের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল।
রয়্যাল সৌদি এয়ার ফোর্স এখনো এই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী বিমানবাহিনী। তারা ২০০-এর বেশি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান পরিচালনা করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বহর। এর পাশাপাশি তাদের ৭২টি ইউরোফাইটার টাইফুন রয়েছে। কিছু বিশ্লেষক ধারণা করছেন, পাকিস্তানের এই মোতায়েনে পাইলট, বিমানসেনা এবং গ্রাউন্ড টেকনিশিয়ান অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন; যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক সত্যতা পাওয়া যায়নি।
পাকিস্তানি বাহিনী তাদের নিজস্ব কমান্ডের অধীনে কাজ করছে নাকি তাদের সৌদি অপারেশনাল কমান্ডের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে, সে বিষয়টিও এখনো অস্পষ্ট।
ভঙ্গুর কূটনীতি
এদিকে, ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদল কোনো চুক্তি ছাড়াই চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। ১৪ এপ্রিল থেকে ইরানি বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর হয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী একে ‘জলদস্যুতা’ আখ্যা দিয়ে ঘোষণা করেছে, দেশটির বন্দরগুলো ‘হয় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো কারও জন্যই নয়।’
ব্যর্থতা সত্ত্বেও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। কর্মকর্তারা জানান, ইসলামাবাদ আবারও পরবর্তী দফার আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে এবং ২২ এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বলবৎ থাকবে। রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক পথও এখনো খোলা রয়েছে।
৯ এপ্রিল সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেন। প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের হামলা শুরুর পর উত্তেজনা হ্রাস ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়ে এটিই ছিল তাদের প্রথম আলোচনা। ১৩ এপ্রিল দ্বিতীয়বার আবারও তাদের কথা হয়, যেখানে আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং ইসলামাবাদ আলোচনার ফলাফল নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, এই ধারাবাহিক যোগাযোগ এটাই ইঙ্গিত দেয় যে উভয় পক্ষই আলোচনার পথ খোলা রাখতে আগ্রহী। চিমা বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রতি ইরানের যদি কোনো সংশয় থেকেও থাকে, তবে সেটি অন্তত এই নিশ্চয়তা দিয়ে দূর করা সম্ভব যে পাকিস্তান অন্য যেকোনো স্বার্থের চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই বেশি প্রাধান্য দেবে।’
আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান