সম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ভারতের এক মন্ত্রীর বিরল পদত্যাগ আদায় করে নিয়েছে ভারতের জেন-জি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে এই সাফল্যের পরও দলটি আপাতত নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশের কোনো পরিকল্পনা করছে না। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে গতকাল মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন।
অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে দিল্লি থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হন। একই সঙ্গে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরও দেশে উচ্চ বেকারত্বের হার নিয়ে তরুণদের উদ্বেগও এই আন্দোলনের মাধ্যমে সামনে আসে।
মহারাষ্ট্রে নিজের বাড়িতে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দীপকে বলেন, ‘আমরা জেন-জির সঙ্গে পরামর্শ করতে চাই, তারা কোন কোন বিষয়কে আমাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করে।’ তিনি জানান, আজ বুধবার থেকে সমর্থকেরা দুই দিনের বৈঠকে বসবেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ধারণ করবেন। দীপকে বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হবে ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচি বা এজেন্ডা নির্ধারণ করা এবং আমরা কীভাবে এই সামাজিক আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিতে পারি, তা নিয়ে আলোচনা করা।’
তবে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচনী রাজনীতিতে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন দীপকে। তবে তিনি বলেছেন, ‘অধিকাংশ মানুষ’ চাইলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং জনদাবির ভিত্তিতে পরে নির্বাচনে অংশ নেবেন। দীপকে আরও বলেন, ‘ভারতে এখনই রাজনৈতিক দল গঠন করাকে আমি কোনো সমাধান বলে মনে করি না। ভারতের যা প্রয়োজন, তা হলো এমন একটি জনআন্দোলন, যা সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনার জন্য লড়াই করবে।’
তিনি জানান, আপাতত সিজেপির মূল লক্ষ্য হবে তরুণ ভারতীয়দের উদ্বেগগুলোকে আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে আসা। তাঁর ভাষ্য, তরুণদের একটি বড় অংশ দেশের রাজনীতিক, আদালত এবং গণমাধ্যমের ওপর আস্থা হারিয়েছে। দীপকে বলেন, ‘এই তরুণদের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং তারা আসলে কী চায়, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষে জুনে দেশে ফেরার পর দীপকে ব্যাপক পরিচিতি পান। মে মাসে মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পর তিনি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। পরের মাসে তাঁর আহ্বানে দিল্লির রাস্তায় নেমে আসেন কয়েক লাখ তরুণ।
জুলাইয়ের ২৫ তারিখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এর আগে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করেও আন্দোলন থামাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এরপর সরকার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আরও কঠোর আইনি শাস্তির পক্ষে অবস্থান নেয় এবং দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার পর্যালোচনার জন্য একটি প্যানেল গঠন করে।
দীপকে বলেন, তিনি এখনই রাজনৈতিক দল গঠন করতে চান না। কারণ, তাঁর আশঙ্কা, সরকার দলটিকে হেয় বা বিতর্কিত করার চেষ্টা করতে পারে এবং এর নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারে। ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো মোদি সরকারের বিরুদ্ধে এই বিরল রাজনৈতিক সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেও দীপকে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন।
প্রতিবেশী বাংলাদেশে ২০২৪ সালে তরুণদের নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একটি জেন-জি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের নির্বাচনে দলটির দুর্বল ফলাফলও হয়তো দীপকের সতর্ক অবস্থানের একটি কারণ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছর ভারতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন তরুণ ভারতীয়দের ক্ষোভের প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে। এসব নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে জনবহুল উত্তর প্রদেশের পাশাপাশি শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত পাঞ্জাব এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটও রয়েছে।
তবে ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচন মোদি সরকারের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যদি ততদিনে সিজেপি নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করে, বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিতাভ তিওয়ারি বলেন, ‘এই ইস্যু রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির জন্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করবে, এমনটা সম্ভাবনা কম। তবে ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে এটি আরও বড় একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘যদি সিজেপি একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে, তরুণদের ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে কাজ চালিয়ে যায় এবং তাদের গতি ধরে রাখতে পারে, একই সঙ্গে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখে, তাহলে তারা সমর্থন পেতে পারে।’
মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছায়। এরপর দীপকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি আসতে থাকায় তার বাড়িতে এক ডজনেরও বেশি পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে মোতায়েন ছিলেন। তবে নিজের নিরাপত্তার চেয়ে দীপকের উদ্বেগ ছিল তার বাবা-মাকে নিয়ে। দীপকে বলেন, ‘আমি আমার বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ কারণেই আমি বাড়িতে থাকতে পেরে খুব স্বস্তি বোধ করছি। আমি আশাবাদী, কিছুই ঘটবে না, কারণ সরকার আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছে।’