হোম > বিশ্লেষণ

হুতি ও সৌদি আরবের লড়াইয়ে কেন বেকায়দায় ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ছয় মাসের যুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চারটি শহর লক্ষ্য করে চালানো এই হামলার পর আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে রিয়াদ ও হুতিরা। এর পাল্টা জবাবে সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালায়।

চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে আজ লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এর মধ্যবর্তী পেরিম দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী স্থানটি থেকে পিছু হটার পর এখন হুতি যোদ্ধারা প্রণালির উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপে অবস্থান করছেন।

নতুন এই সংঘাত শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তাকেই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য কৌশলকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কারণ, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতে জড়িত, অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ আবারও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

কেন সৌদি আরবে হামলা করছে হুতিরা

হুতি বা আনসারুল্লাহ ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। এরা রাজধানী সানাসহ দেশের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে এলেও হুতিদের ক্ষমতা পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি।

সাম্প্রতিক হামলার দায় স্বীকার করে হুতিরা জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সীমান্তবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। একই সঙ্গে তারা সৌদি সীমান্তের কাছে ট্রাক বিস্ফোরণের ভিডিওও প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা শুধু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নয়; এটি মূলত ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ইরান হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করছে, আর হুতিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মাধ্যমে সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ট্রাম্প কেন বেকায়দায়

ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ওপর ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং মার্কিন নৌবাহিনী নিরাপদে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিম প্রান্তে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা সেই দাবিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সর্বশেষ হুতি কর্তৃক বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ প্রমাণ করছে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে এখন বেশ বেকায়দায়।

একদিকে হরমুজ, অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব—এই দুটি সামুদ্রিক পথ বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি হরমুজে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও থাকে, কিন্তু লোহিত সাগরে হুতিরা জাহাজে হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেলের বাজার অস্থিরই থেকে যাবে।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক লিন্ডসে নিউম্যানের মতে, ২০২৩ সালের পর থেকে হুতিদের হামলায় লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে হরমুজ ও লোহিত সাগরের সংকট এখন একই আঞ্চলিক যুদ্ধের দুটি পরস্পর-সংযুক্ত ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে।

তেলের বাজারে কী প্রভাব পড়ছে

গত মঙ্গলবারেই হুতিদের হামলার পর সৌদি আরবের পাল্টা বিমান হামলায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলারে পৌঁছায়।

এর কারণ, সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ। তাদের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা হলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথই ঝুঁকিতে থাকায় বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।

লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাব আল-মান্দেব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে, বিশ্বের অন্যতম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের জন্য এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজ বাব আল-মান্দেব দখলের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের দাম (ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই) ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে।

ইরানের ‘প্রক্সি’ নেটওয়ার্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্লেষকদের মতে, হামাস ও হিজবুল্লাহ গত কয়েক বছরে বেশ দুর্বল হয়েছে। কিন্তু হুতিরা এখনো কার্যকর সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে এবং ইরানের সবচেয়ে সক্রিয় আঞ্চলিক মিত্রে পরিণত হয়েছে।

সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এডমন্ড ফিটন-ব্রাউন বলেন, হুতিরা মনে করছে সৌদি আরব দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে ক্লান্ত। এই সুযোগে তারা হামলা জোরদার করেছে। তবে তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া এত বড় আকারের হামলা চালানো সম্ভব নয়।

এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরও জটিল, কারণ জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তী সমঝোতায় আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিষয়টি কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প এখন হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি সামলাবেন নাকি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের নিরাপত্তা দেবেন?

সামনে কী হতে পারে

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ঘোষণা দিয়েছে, তারা হুতিদের ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের কঠোর জবাব’ দেবে। তবে একই সঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেছেন, কূটনীতির পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

অন্যদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নৌজোটে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার আলোচনা চলছে। যদিও এখনো তারা সরাসরি সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। তবে যেহেতু তাদের মধ্যে মক্কা চুক্তি নামে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে, সেহেতু সৌদি আরবের প্রয়োজনে তারা অন্যান্য সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে পারে।

তবে সবকিছু মিলিয়ে বেকায়দায় আছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র যদি শুধু হরমুজে মনোযোগ দেয় এবং লোহিত সাগরের সংকটকে উপেক্ষা করে, তাহলে ইরান-সমর্থিত হুতিরা বৈশ্বিক নৌপথে অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই থাকবে। ইতিমধ্যে হুতিরা বাব আল-মান্দেব দখল করে নিয়েছে। এরপরেই অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ফলে ট্রাম্পের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ কেবল ইরান নয়, ইরানের সঙ্গে যুক্ত সব আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ককে মোকাবিলা করা।

দি ইন্ডিপেনডেন্ট থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা