ইরান যুদ্ধের শুরুতেই প্রায় চার দশক আগে নির্মিত তেলের একটি পুরোনো পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছিল। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ করে দেওয়া ওই পাইপলাইন সৌদি তেলের সরবরাহ সচল রাখতে সহায়তা করেছে। কিন্তু ইয়েমেনের হুতিরা এখন সেই বিকল্প পথের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি দেওয়ায় সৌদি আরবকে হয়তো ‘বিকল্প’ পথ খুঁজতে হবে।
তবে ইকোনমিক টাইমসের মতে, সৌদি আরবের জন্য নতুন ওই ব্যবস্থা চালু করা মোটেও সহজ বা সস্তা হবে না। বাব আল-মান্দেব এড়িয়ে সৌদি তেল ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে পাঠাতে হলে অতিরিক্ত পাইপলাইন, বিপুলসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ ও জটিল কূটনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি তো রয়েছেই।
সৌদি আরব বর্তমানে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিতসাগর হয়ে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করে। এবার দক্ষিণে বাব আল-মান্দেবের দিকে না গিয়ে তেল উত্তরে পাঠিয়ে মিসরের সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোই হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান। কিন্তু এখানেও রয়েছে বড় সীমাবদ্ধতা। সুয়েজ খালের গভীরতা বড় আকারের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এসব জাহাজ একসঙ্গে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করতে পারে এবং সৌদি তেল পরিবহনে এগুলোই প্রধান বাহন।
এই কারণে সৌদি আরবকে ব্যবহার করতে হতে পারে প্রায় ৫০ বছর পুরোনো সুয়েজ-মেডিটেরেনিয়ান বা ‘সুমেড’ পাইপলাইন। প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন মিসরের লোহিতসাগর উপকূলের আইন সুখনা থেকে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সিদি কেরির পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলো আইন সুখনা থেকে তেল নামিয়ে সুমেড পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে পাঠাতে পারে। এরপর অন্য জাহাজ সেই তেল নিয়ে গন্তব্যে যেতে পারবে।
আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো ইসরায়েলের মালিকানাধীন ‘ইলাত-টু-আশকেলন’ পাইপলাইন। ১৯৬০-এর দশকে ইসরায়েল ও ইরানের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই পাইপলাইনও লোহিতসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরব ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় এমন সহযোগিতা একসময় অকল্পনীয় ছিল। তবে বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে গোপন কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাইপলাইনটির কার্যক্রম আজও অত্যন্ত গোপনীয় বলে বিবেচিত হয়।
হুতিদের বাব আল-মান্দেব ঘিরে হুমকি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় উদ্বেগের। লোহিতসাগর দিয়ে প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি সৌদি অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। এই সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে সৌদি আরব একই সঙ্গে দুটি ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রথমত, ছোট ও মাঝারি আকারের ট্যাংকার ব্যবহার করে লোহিতসাগরের সৌদি তেলবন্দর থেকে তেল সুমেড পাইপলাইনের প্রবেশমুখে নেওয়া হতে পারে। তবে সুমেডের দৈনিক পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল—যা সৌদি তেলের বর্তমান প্রবাহের প্রায় অর্ধেক। ইসরায়েলি পাইপলাইন যুক্ত হলে আরও প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল পরিবহনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ভিএলসিসি জাহাজগুলো পাইপলাইনে তেলের একটি অংশ নামিয়ে তুলনামূলক কম ভারে সুয়েজ খাল পার হতে পারে। ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর পর পাইপলাইনের অপর প্রান্ত থেকে বাকি তেল তুলে নিতে পারবে তারা। এ ছাড়া সুয়েজম্যাক্স শ্রেণির জাহাজও ব্যবহার করা হতে পারে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সৌদি আরব থেকে জাপানে তেল পৌঁছাতে সময় প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে বিপুলসংখ্যক ট্যাংকার দীর্ঘ সময় আটকে থাকবে এবং বিশ্ববাজারে জাহাজভাড়া ও সরবরাহ ব্যয় বাড়তে পারে।
সবকিছুই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে হুতিদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। বাব আল-মান্দেব প্রণালিটি ইয়েমেন ও আফ্রিকার জিবুতি-ইরিত্রিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এবং এর প্রস্থ মাত্র প্রায় ১৪ নটিক্যাল মাইল। এর নামের অর্থই ‘অশ্রুর দরজা’। সংকীর্ণ এই জলপথে পূর্ণাঙ্গ অবরোধ সৃষ্টি করা তুলনামূলক সহজ। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হুতিরা এর আগেও বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল এবং কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল। তবে সে সময় তাদের এই অবরোধের প্রভাব বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল, কারণ, হরমুজ প্রণালি তখন উন্মুক্ত ছিল।
এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি সপ্তাহের শুরুতে হুতিরা এক বিবৃতিতে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। গত ১০০ দিনের বেশি সময় ধরে সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে এই পথে তেল রপ্তানি করে আসছিল। কিন্তু হুতিদের হুমকিতে সেই বিকল্প পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তাদের নতুন রুটের সন্ধান করতে হচ্ছে।
ফলে সৌদি আরবের জন্য এখন প্রশ্ন শুধু তেল কীভাবে রপ্তানি করবে, তা নয়—বরং কত বেশি খরচে ও কতটা জটিল পথ পেরিয়ে সেই তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছাবে, সেই প্রশ্নই মুখ্য হয়ে উঠেছে।