ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শুক্রবার তিনি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কঠোর আঘাত করার কথা জানিয়েছেন। এর এক দিন আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও বলেছিলেন, আগামী সপ্তাহেই তেহরানের বিরুদ্ধে এমন কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের অভিযোগে ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশটির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের সম্পদ জব্দের মতো পদক্ষেপ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর সামুদ্রিক, জ্বালানি ও আর্থিকখাতে আরও কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পাশাপাশি শুরু করেছে নৌ অবরোধ। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ফরেন অ্যাসেট কন্ট্রোল অফিসের (ওএফএসি) তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরানসংশ্লিষ্ট ১ হাজারের বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও উড়োজাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক কিছু নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল ইরানের ছায়া তেলবহর, জাহাজের বিমাকারী প্রতিষ্ঠান, অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ। এর ফলে ইরানসংশ্লিষ্ট আনুমানিক ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সিও জব্দ করা হয়েছে।
চীনের স্বাধীন ছোট তেল শোধনাগারগুলোকে ‘টিপট’ বলা হয়। দেশটির মোট শোধন সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে। এগুলো খুব কম মুনাফায়, এমনকি কখনো কখনো লোকসানেও পরিচালিত হয়।
শিপিং তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপথে রপ্তানি করা ইরানের ৮০ শতাংশের বেশি তেল কেনে চীন। এই বাণিজ্যের বড় অংশই স্বাধীন শোধনাগারগুলোকে কেন্দ্র করে। ফলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’ দিতে পারে ওয়াশিংটন। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞায় মূল নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশের পাশাপাশি ওই দেশকে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানকেও শাস্তি দেওয়া হয়।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা চীনের বড় স্বাধীন শোধনাগারগুলোকে ইরানি তেল কেনা থেকে বিরত রাখতে পেরেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট শোধনাগারগুলোর মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ কম থাকায় তাদের ওপর এমন পদক্ষেপের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
ইরানের তেল বিক্রির অর্থ লেনদেন এবং অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগে চীন ও হংকংভিত্তিক কয়েকটি ছোট প্রতিষ্ঠানের ওপর ইতিমধ্যে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওএফএসি।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ দুটি বড় চীনা ব্যাংককেও সতর্ক করেছে। ইরানের অর্থ তাদের মাধ্যমে লেনদেন হলে এসব ব্যাংকও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত ব্যাংক দুটির নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় চীনা ব্যাংককে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও ইরানের সঙ্গে লেনদেন নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। তবে এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীনও ব্যবস্থা নিতে পারে।
এ কারণেই ওয়াশিংটন-বেইজিং উত্তেজনা বাড়াতে চাইছে না ট্রাম্প প্রশাসন। চলতি বছরের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো উন্নত প্রযুক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিজস্ব সরবরাহ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে চীন এসব খনিজের রপ্তানি কমিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
ইরানের পাশাপাশি চীন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ধারাবাহিকভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এ পদ্ধতিকে অনেকটা ‘হ্যাক-আ-মোল’ কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রেট এরিকসন বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ইরানের আচরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। কারণ একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে তেহরান দ্রুত নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে একই কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মিয়াদ মালেকির তথ্যমতে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের তেল পরিবহনকারী, ক্রেতা ও মুদ্রা বিনিময়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ইরানের বাণিজ্যিক সক্ষমতা কমাতে বিমান চলাচল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে কিছু মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তা স্থল অবরোধের সম্ভাবনাও সামনে এনেছেন। তবে এটি কার্যকর করতে ইরানের প্রতিবেশী ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমিনিস্তান, আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
এসব দেশের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তবে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যতিক্রম। আবার আফগানিস্তান দুর্গম পাহাড় থাকায় সেখানে কার্যকর নজরদারি ও অবরোধ করাও অত্যন্ত কঠিন।
পাকিস্তানের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের কিছুটা প্রভাব থাকতে পারে। দেশটি সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় সুবিধা চেয়েছে। তুরস্কও যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে ফেরার চেষ্টা করছে।
তবে স্থল অবরোধ কার্যকর হলে ইরানে খাদ্য, জ্বালানি ও বস্ত্রের আমদানি বাধাগ্রস্ত হবে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়লেও তা দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর পণ্যে শুল্ক আরোপের হুমকিও ট্রাম্প বারবার দিয়েছেন। তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এ ধরনের শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি বাতিল করেছে।
এদিকে গত সপ্তাহে মার্কিন সিনেট রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার একটি বিল পাস করেছে। এতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইরানের বাণিজ্য ও অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তাকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপে প্রেসিডেন্টকে নতুন ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে আইনটি প্রতিনিধি পরিষদে পাস হতে হবে। সেখানে শুল্ক আরোপের এসব পদক্ষেপ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকান সদস্যেরও উদ্বেগ রয়েছে। ফলে ইরানের ওপর ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক চাপ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স