হোম > বিশ্লেষণ

হিউম্যানয়েড রোবটের আড়ালে চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় চলছে নীরব বিপ্লব

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

হাংঝৌ টেকনিশিয়ান ইনস্টিটিউশনে রোবোটিক্স শিখছেন শিক্ষার্থীরা। ছবি: বিবিসি

‘আমি একটু সামান্য সময় ঘুমিয়ে থাকার মধ্যেই পৃথিবী বদলে যায়।’ চীনের ২৮ বছর বয়সী শিক্ষক চেন তিয়ানইউ এভাবেই তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তাঁর নিজের পৃথিবীও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সর্বশেষ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে তিনি অবসর সময়ে এমন সব কারখানায় যান, যেখানে দ্রুত অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি চালু করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং রোবোটিকস শেখানোর সময় শিক্ষার্থীদের কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

চেনের সামনে প্রায় ৩০ জন কলেজশিক্ষার্থী কোডিং শিখছেন। তাঁদের একজন দ্রুতগতিতে কম্পিউটারে টাইপ করছেন। কখনো তাঁর চোখ যাচ্ছে স্ক্রিনে, কখনো রোবটের দিকে। তিনি বলছেন, ‘পরিকল্পনাটা হলো, রোবটটি ওই নলাকার অংশটি ধরে এখানে নিয়ে আসবে।’

শ্রেণিকক্ষের এক পাশে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রোবট। অন্য অংশে শিক্ষার্থীরা রোবোটিক চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা দিতে গিয়ে চেন বলেন, ‘এআই ও রোবোটিকসের পৃথিবীতে যদি আপনাকে প্রয়োজন না হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আপনাকে বাদ পড়ে যাওয়া মানুষের দলে থাকতে হবে।’

এই শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শুধু একটি প্রশিক্ষণ নয়। বরং এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এক বড় পদক্ষেপ, কিংবা বলা যায় এক উল্লম্ফন, যা চীন পরিকল্পিতভাবে তৈরি করছে। চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো দেশটিকে উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষে নিয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় নামানো।

চীনের বিভিন্ন কারখানায় এরই মধ্যে ২০ লাখ রোবট মানুষের পাশাপাশি কাজ করছেন। ছবি: বিবিস

প্রযুক্তিনির্ভর কর্মশক্তি তৈরির প্রস্তুতি

এই পরিবর্তনের প্রমাণ চারপাশেই দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পড়ছে হাংঝৌ টেকনিশিয়ান ইনস্টিটিউটে। এটি চীনের কয়েকটি বিশাল ও বিশেষভাবে নির্মিত কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি। এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিতে দক্ষ নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলী তৈরি করা। ক্যাম্পাসটি হাংঝৌ শহরের প্রান্তে। একসময়কার এই সাম্রাজ্যিক রাজধানীর আধুনিক ও ভবিষ্যৎধর্মী অবকাঠামো এখন ইঙ্গিত দিচ্ছে, শহরটি কীভাবে একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তিকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

চীনের কারখানাগুলোতে এখন ২০ লাখেরও বেশি রোবট কাজ করছে। বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় এই সংখ্যা বেশি। আর রোবট ব্যবহারের পরিমাণও অভাবনীয় গতিতে বাড়ছে। চীনের এই অঙ্গীকার যে বিশ্বকে বিশালভাবে বদলে দেবে, সে বিষয়ে খুব বেশি সন্দেহ নেই। এর আগে চীনের অর্থনীতি যখন বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, তখনো বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়েছিল।

এবার চীন ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোবট পাঠাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি শিল্পকারখানার রোবট চীনেই তৈরি হচ্ছে। তবে এত বড় পরিসরে অটোমেশনের ফলে কী হবে, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

কারণ, চীন বৈশ্বিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি দেশ। সেখানে ব্যাপক অটোমেশন মানুষের কর্মসংস্থানে কী প্রভাব ফেলবে? চীনের শ্রমশক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে? আর চীনে যেখানে সরকার তথ্যপ্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখে, সেখানে এই বিশাল পরিবর্তনের প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য কীভাবে নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

শিল্প বিপ্লবের নতুন চেহারা

বিশ্বের চোখের সামনে চীনে যে নতুন শিল্প বিপ্লব তৈরি হচ্ছে, সেখানে দেশটির শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। দৃশ্যগুলো যেন ভবিষ্যতের কোনো চলচ্চিত্র থেকে উঠে এসেছে। চকচকে সৌরবিদ্যুৎ গ্রিড, বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে নীরব হয়ে যাওয়া ব্যস্ত সময়ের সড়ক এবং এমন সব যন্ত্র, যেগুলো বিশ্বের দ্রুততম দৌড়বিদ উসাইন বোল্টের চেয়েও দ্রুত কাজ করতে পারে।

একদল গবেষক এমন রোবট তৈরির চেষ্টা করছেন, যেগুলো আবার নিজেরাই রোবট তৈরি করতে পারবে। ছবি: বিবিবি

সপ্তাহান্তে চীন দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন করেছে ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড গেমস। সেখানে রোবট বক্সিং করেছে, দৌড়েছে এবং মার্চ করেছে। তবে এই দৃশ্যমান প্রদর্শনীর পেছনে আরও একটি কম দৃশ্যমান বিপ্লব চলছে। সেটি ঘটছে কারখানা ও শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি চীনের বিভিন্ন শিল্পকারখানা পরিদর্শন করেছে। সেখানে এমন রোবট দেখা গেছে, যেগুলো মানুষের মতো দেখতে নয়, মঞ্চে নাচে না কিংবা লাফিয়ে বেড়ায় না। বরং তারা ওয়েল্ডিং, রং করা, ভারী জিনিস তোলা, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানোসহ নানা কাজ করে।

তারা দিন-রাত বিরতিহীনভাবে কাজ করতে পারে। তাদের বেতন, ছুটি কিংবা অন্যান্য কর্মী-সুবিধারও প্রয়োজন নেই। কিছু রোবট আবার এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে আরও রোবট তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, চীন এমন সব প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলছে যেখানে মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যতের রোবট-নির্ভর কর্মশক্তির সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

এটাকেই সি চিন পিং চীনের ‘নতুন উৎপাদনশক্তি’ বা ‘new productive forces’ বলে অভিহিত করছেন। এই শক্তি কীভাবে চীনের অর্থনীতি ও সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে, তারই একেবারে সামনের সারির দৃশ্য এখন দেখা যাচ্ছে।

একই কারখানায় পুরোনো ও নতুন প্রজন্ম

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর চেংদুর একটি কারখানায় পুরোনো ও নতুন প্রযুক্তি পাশাপাশি কাজ করছে। প্রায় ৩০ জন মধ্যবয়সী নারী-পুরুষ একটি অ্যাসেম্বলি লাইনে কাজ করছেন। তারা স্ক্রু লাগাচ্ছেন, ড্রিল করছেন এবং পালিশ করছেন। তারা তৈরি করছেন সিআরপি টেকনোলজির প্রধান পণ্য, একটি রোবোটিক আর্ম বা বাহু, যা বিভিন্ন শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহার করা যায়। একই ঘরে চার তরুণ প্রকৌশলী একটি কনসোলের সামনে জড়ো হয়ে কাজ করছেন। তারা একটি নতুন প্রোটোটাইপ রোবটের কোড ঠিক করার চেষ্টা করছেন।

তাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি রোবট তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে অন্য রোবট তৈরিতেও সহায়তা করবে। রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা গবেষণা ও উন্নয়ন দলের ৩১ বছর বয়সী সদস্য পাং কাই সেই মসৃণ ধাতব কঙ্কালের মতো রোবটটিকে ঘরের এক পাশ থেকে অন্য পাশে ঠেলে নিয়ে যান। চীনের ভবিষ্যতের কর্মশক্তি অবশ্য এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। আপাতত এই রোবট কেবল সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করতে পারে। যেমন, একটি কিউআর কোড স্ক্যান করা।

পাং বলেন, ‘হয়তো আরও ছয় মাস পর এটি আরেকটি কাজ করতে পারবে।’ তাঁর মুখে ছিল কিছুটা বিষণ্ন হাসি। কারণ, এই প্রযুক্তি তৈরির পথ দীর্ঘ। তাই দলটি রোবটের প্রতিটি ছোট সাফল্যকেই উদযাপন করছে। সিআরপি টেকনোলজিতে প্রায় ৩০০ মানুষ কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি গত নয় বছর ধরে রোবোটিক বাহু তৈরি করছে। প্রতিটি রোবোটিক বাহুকে নির্দিষ্ট কারখানার প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা যায়। এগুলো গাড়ি, ইলেকট্রনিক পণ্য কিংবা বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের টারবাইন তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। কোম্পানিটির দাবি, একটি রোবোটিক বাহুকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা সম্ভব, যাতে সেটি কোনো কারখানার ৯০ শতাংশেরও বেশি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করতে পারে।

একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির কারখানায় রোবোটিক আর্মস। ছবি: বিবিসি

একদিন কি মানুষকেও প্রতিস্থাপন করবে রোবট?

এই প্রকৌশলীদের মনেও একটি বড় প্রশ্ন ঘুরছে—একদিন কি রোবট কোম্পানির মানুষের কর্মীদেরও প্রতিস্থাপন করতে পারবে? পাং কাই বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের নতুন রোবট মানুষের মতো হোক। আমরা আশা করি, এটি নিজে নিজে চিন্তা করতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এ ধরনের রোবট প্রয়োজন। কারণ হয়তো ১০ বছর পর চীনে পর্যাপ্ত কর্মী থাকবে না।’

চীনের জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং কর্মশক্তির বয়স বাড়তে থাকা দেশটির কারখানাগুলোকে দ্রুত বিপ্লব ঘটানোর আরেকটি বড় কারণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষের বয়স হবে ৬০ বছরের ওপরে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক দশকে চীন প্রায় ৬ কোটি মানুষ হারাবে। সংখ্যাটি প্রায় ফ্রান্সের বর্তমান জনসংখ্যার সমান।

এ কারণে চীনের আশা, অটোমেশন দ্রুত বাড়িয়ে ভবিষ্যতের শ্রমিক ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে। শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ার এই সমস্যা যেন ইতোমধ্যে ধীরগতিতে চলা অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ তৈরি না করে, সেটিই তাদের লক্ষ্য।

তবে ঝুঁকিও বিশাল

সমস্যা হলো, এই পরিবর্তন কত দ্রুত ঘটবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীনের উৎপাদন খাতে এখনো প্রায় ১২ কোটি মানুষ কাজ করেন। অটোমেশন যদি খুব দ্রুত এগিয়ে যায়, তাহলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে কারখানার মজুরির ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ চীন একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতার মুখোমুখি।

একদিকে, জনসংখ্যা কমছে, কর্মশক্তি বয়স্ক হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, বর্তমানে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ কারখানায় কাজ করছেন, তাদের খুব দ্রুত রোবট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে সেটিই আবার বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। চীনের সামনে তাই শুধু রোবট তৈরির প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, রোবটের যুগে মানুষ কোথায় থাকবে।

চীন যে ভবিষ্যৎ তৈরি করছে, সেখানে কারখানার মেশিন হয়তো কখনো ক্লান্ত হবে না। কিন্তু সেই মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি নতুন দক্ষতা, নতুন কর্মসংস্থান এবং ধীরে ধীরে রূপান্তরের পথও তৈরি করতে হবে। মানবসভ্যতা বরাবরই যন্ত্র বানাতে বেশ দক্ষ, যন্ত্র আসার পর মানুষের কী হবে সেই হিসাবটা করতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

চীন দ্রুত এমন এক শিল্পব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কারখানার বড় অংশের কাজ করবে রোবট। দেশটির বিশাল উৎপাদনভিত্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবট তৈরির যন্ত্রাংশ এবং দক্ষ কর্মী তৈরির পরিকল্পনা এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করছে। তবে এর সঙ্গে বড় প্রশ্নও উঠছে: রোবট কি মানুষের জন্য নতুন সমৃদ্ধি আনবে, নাকি মানুষের বহু চাকরি কেড়ে নেবে?

ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লিপমোটরের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাও লি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে একটি মেশিন দিনে ২৪ ঘণ্টাই কাজ করতে পারে। মানবকর্মীদের তুলনায় এটি অবশ্যই বড় সুবিধা। কিন্তু মেশিনেরও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। প্রতিদিন এর জন্য সময় দিতে হয়। আবার প্রতি মাসে উৎপাদন লাইন পরীক্ষা ও মেরামতও করতে হয়।

ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা লিপমোটরের তুলনামূলক কম দামের এবং প্রযুক্তিনির্ভর গাড়িগুলো চীনের হাংঝৌ কারখানায় তৈরি হয়। গাড়ি তৈরির প্রায় প্রতিটি ধাপেই রোবট কাজ করে। তবে উৎপাদন লাইনের শেষ প্রান্তে এখনো মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়।

লিপমোটরের কর্মী সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। তাদের মধ্যে শত শত কর্মী নতুন তৈরি গাড়িগুলো কারখানা থেকে বের হওয়ার সময় শেষবারের মতো পরীক্ষা করেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি দিন কি আসবে যখন এই কর্মীদের আর প্রয়োজন হবে না?

কাও লি মনে করেন, এমনটা পুরোপুরি সম্ভব এবং সেই সময় খুব দ্রুতই আসতে পারে। তার ভাষায়, স্ট্যাম্পিং, ওয়েল্ডিং ও পেইন্টিংয়ের মতো কারখানার বিভাগগুলোতে ইতোমধ্যেই প্রায় ১০০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

চীনে প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে উৎপাদনে রোবটের ব্যবহারের কাজ। ছবি: বিবিসি

রোবট তৈরিতেও চীনের বড় সুবিধা

রোবট শিল্পে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় একটি বড় সুবিধা ভোগ করছে তার বিশাল উৎপাদনভিত্তির কারণে। একটি রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মোটর, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, গিয়ার, সেন্সরসহ প্রায় সব উপাদানই চীনে সহজে পাওয়া যায়।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের মহাসচিব ড. সুসানে বিয়েলার বলেন, চীনের শুধু প্রযুক্তি নয়, একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশটি আগামী পাঁচ বছরে কোথায় যেতে চায়, সে বিষয়ে তাদের ধারণা পরিষ্কার। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা করা হলেও তা অঞ্চল ও পৌরসভা পর্যায়ে ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হয়।

এর একটি উদাহরণ শেনঝেন। সেখানে কেউ যদি একটি রোবট তৈরি করতে চান, তাহলে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহের জন্য পুরো একটি শিল্প-পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’ রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে এক ঘণ্টারও কম সময় লাগতে পারে। ইউরোপে একই কাজ করতে কখনো এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

তবে বিয়েলার মনে করেন, রোবটের ‘দেহ’ তৈরিতে চীন এগিয়ে থাকলেও রোবটের ‘মস্তিষ্ক’ তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে। এর মধ্যে রয়েছে রোবট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি ও প্রোগ্রামিং।

এআই দৌড়েও দ্রুত এগোচ্ছে চীন

তবে এখানেও ব্যবধান দ্রুত কমছে। ডিপসিক ও মুনশটের মতো চীনা প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন এআই মডেল তৈরি করছে। এসব প্রতিষ্ঠান দাবি করছে, তাদের মডেল শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মডেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

চীনা এআই শিল্পে ‘ওপেন সোর্স’ পদ্ধতির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ব্যবস্থায় এআই স্টার্টআপগুলো নিজেদের কোড অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। ফলে নতুন প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং উদ্ভাবনের গতি বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ চিপ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরও চীনের এআই শিল্প প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে গেছে।

এখন বিশ্লেষকদের ধারণা, এআই ও রোবটের প্রতিযোগিতার পরবর্তী পর্যায় নির্ধারিত হবে শুধু কার ভাষাভিত্তিক এআই মডেল সবচেয়ে শক্তিশালী, তা দিয়ে নয়। বরং কে সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কোটি কোটি যন্ত্রের মধ্যে বাস্তবে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই হবে বড় বিষয়।

ভবিষ্যতের কর্মী তৈরিতে বিনিয়োগ

এই কারণেই চীন এমন একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে বিনিয়োগ করছে, যারা ভবিষ্যতের প্রযুক্তি কল্পনা করতে এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারবে।

হাংঝৌ টেকনিশিয়ান ইনস্টিটিউটে ১৫ বছর বয়স থেকেই শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ শুরু করতে পারে। সেখানে যে ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়, তার ব্যাপ্তি বেশ বড়।

প্রতিষ্ঠানটির একটি পুরো ভবন ইঞ্জিন ও অ্যারোনটিক্স বা উড়োজাহাজ প্রযুক্তির জন্য নির্ধারিত। আবার এমন একটি নিয়ন্ত্রিত তলাও রয়েছে, যেখানে সেই শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ নেয় যারা চীনের বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে বিশ্বের শীর্ষে ধরে রাখার কাজে যুক্ত হবে।

রেয়ার আর্থ বর্তমানে চীন ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ।

তরুণদের বেকারত্ব কমানোর পথ?

চীনের এই কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনেকে দেশটির উচ্চ যুব বেকারত্বের সমস্যার সমাধানের একটি পথ হিসেবেও দেখছেন। দেশটিতে প্রায় প্রতি পাঁচজন তরুণের একজন কাজ খুঁজতে সমস্যায় পড়ছে।

তরুণ শিক্ষক চেন বলেন, তাদের শিক্ষার্থীদের চাহিদা এত বেশি যে বিভিন্ন কোম্পানি আগেই তাদের জন্য শিক্ষার্থীদের ‘বুক’ করে রাখতে পারে। ফলে তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

চেনের মতে, প্রযুক্তির ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রত্যেকের নিজের অবস্থান খুঁজে নেওয়া উচিত। উন্নতির প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পরিবর্তন অনিবার্য। আর এই পরিবর্তনের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে চীনের অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জও আছে

রোবট, এআই ও প্রযুক্তিগত শিল্পে দ্রুত অগ্রগতি হলেও চীনের অর্থনীতি এখনো বেশ কিছু গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি।

দেশটির দীর্ঘস্থায়ী আবাসন বা সম্পত্তি সংকট অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারগুলোর বিপুল ঋণ রয়েছে এবং মানুষের ভোগ বা অভ্যন্তরীণ ব্যয়ও দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল।

বেইজিং যে প্রযুক্তিনির্ভর বিপ্লবের কথা বলছে, তা এসব অর্থনৈতিক সমস্যা কীভাবে এবং আদৌ কতটা সমাধান করতে পারবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

আর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রয়েছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যাদের কাজ রোবটের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে, তারা এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন, সেটিও স্পষ্ট নয়।

রোবট কি তাদের জন্য নতুন সমৃদ্ধি তৈরি করবে, নাকি তাদের অনেকের চাকরিই নিয়ে নেবে?

সামনে এগোনো ছাড়া পথ নেই

হাংঝৌ টেকনিশিয়ান ইনস্টিটিউটের শিক্ষক চেন বলেন, তার শিক্ষার্থীরাও তাকে প্রায়ই প্রশ্ন করে, ভবিষ্যতে কী হবে।

তার উত্তরও খুব সোজা: তিনি জানেন না।

প্রযুক্তি এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে আগামী দিনের বাস্তবতা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কিন্তু তার মতে, শুধু বসে থাকা বা থেমে থাকা কোনো সমাধান নয়।

মানুষকে সামনে এগোতেই হবে, কারণ সামনে এগোলেই বোঝা যাবে তারা আসলে কতটা সক্ষম।

চীনের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের আসল পরীক্ষা তাই শুধু কত দ্রুত রোবট তৈরি করা যায়, কিংবা কত শক্তিশালী এআই বানানো যায়, তা নয়। আসল পরীক্ষা হবে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছায় এবং যাদের পুরোনো কাজ প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে, তাদের জন্য নতুন সুযোগ কতটা তৈরি করা যায়।