ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ঘোষণার পর ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং এ বছরের নির্বাচনে আবারও ক্ষমতায় ফেরার প্রত্যাশী নাফতালি বেনেত বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। তেহরান ও ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক চুক্তি ঘোষণার পর তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এমন একটি সুযোগ নষ্ট করেছেন, যা ইসরায়েলের বড় অর্জন হতে পারত।
বেনেত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে সামনের সারিতে থাকা দখলদার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর ‘অসাধারণ পারফরম্যান্স’ এবং দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ ইসরায়েলিদের তথাকথিত ব্যাপক ‘সাহসিকতার’ প্রশংসা করেন। তবে তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত সরকার আবারও ব্যর্থ হয়েছে। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যকে তারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অর্জনে রূপ দিতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সময়কাল ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ। অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজাকে ঘিরে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা দমন করা এবং তাঁদেরকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণির অবস্থানে ঠেলে দেওয়া।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর ইচ্ছাও তাঁর বহুদিনের। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, তেহরানের প্রভাব কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে সাজানো এবং তেল আবিবকে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ভাবনায় নেতানিয়াহু বহু দশক ধরে আচ্ছন্ন ছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে দেশটির প্রতি সমর্থনও অনেক কমে গেছে। গাজায় লাখো মানুষের সামনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক গণহত্যার দৃশ্য দেখার পর বন্ধু জোটানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যখন সমর্থন সীমিত হয়ে যায় ফ্যাসিস্ট ও উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠীর মধ্যে।
ইসরায়েলপন্থী কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করবে। তাঁদের একজন হাভিভ রেটিগ গুর লিখেছেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র আবার প্রস্তুত করুন। হয়তো দূরে কোথাও পরীক্ষা চালান। ইন্টারসেপ্টর তৈরির সক্ষমতা চার গুণ বাড়ান। মোসাদ ও বিমানবাহিনীকে দ্বিগুণ করুন। আর হিজবুল্লাহকে এক মুহূর্তের জন্যও শক্তি ফিরে পেতে দেবেন না। আবার যেন ১৯৬০-এর দশক ফিরে এসেছে। শান্তির আরেকটা সময় পেতে হলে ইসরায়েলকে আরও কয়েকজন শত্রুকে পরাজিত করতে হবে।’
হাভিভ রেটিগ গুর মূলত ১৯৬০–এর দশকে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের একাধিক যুদ্ধের কথা স্মরণ করে এই কথা বলেছেন। আরেকজন আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে লিখেছেন, ‘আমার মনে হয়, ইসরায়েলের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় নয়, প্রযুক্তি ভাগাভাগি নয়, কিছুই নয়। সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ।’
এসব দেখে মনে হতে পারে, নেতানিয়াহুর পর যিনি আসবেন তিনি হয়তো ভিন্ন কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা করবেন। কিন্তু বাস্তবতা তেমন নয়। আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনের ফল নিয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক অবস্থান বদল, কৌশলগত বক্তব্য এবং অবস্থান তৈরির কাজ এখনো চলছে। তবে মূলধারার রাজনীতিতে খুব কম মানুষই বর্তমান নীতির বাইরে অন্য কোনো পথের কথা বলছেন। ফলে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালেও ভবিষ্যতের ইসরায়েল অনেকটাই আজকের মতোই থাকতে পারে।
কথিত বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও দেশের জন্য আলাদা কোনো ভবিষ্যতের কথা বলছেন না। বরং তিনি নেতানিয়াহুকে সমালোচনা করছেন হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে না পারার জন্য।
অন্যদিকে বেনেত সম্প্রতি ইসরায়েলি গণমাধ্যম জমান ইসরায়েলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন এক অবস্থান তুলে ধরেছেন, যা অনেকের কাছে নেতানিয়াহুর নীতিরই নতুন সংস্করণ বলে মনে হয়। ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তাঁর ধারণাকে ‘সংঘাত ব্যবস্থাপনা’ বলা যায়। অর্থাৎ, দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের বাস্তবতা বদল নয়, বরং সেটিকে নিয়েই চলা।
উগ্র বসতি স্থাপনকারী সংগঠন ইয়েশা কাউন্সিলের সাবেক পরিচালক হিসেবে তিনি ইসরায়েলি বসতি আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল। সর্বোচ্চ যা হতে পারে, তা হলো সবচেয়ে সহিংস কিছু কর্মকাণ্ড সামান্য নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা বা রাষ্ট্রীয় অধিকার নিয়ে কোনো বাস্তব পথ সেখানে নেই।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের সাংবাদিক আমিরা হাসের ভাষায়, তেল আবিবের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনিদের জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ায় ঠেলে দেওয়া। তিনি এটিকে ‘ইহুদি কু ক্লাক্স ক্ল্যান’-এর প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বেনেতও মূলত সেই ধারণার সঙ্গেই আছেন, যদিও মাঝে মাঝে সবচেয়ে উগ্র অংশগুলোর সমালোচনা করেন।
রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেও ফিলিস্তিনিদের বাস্তব অবস্থা ভুলে গেলে চলবে না। এই নিবন্ধের লেখক অ্যান্টনি লোয়েনস্টেইন সম্প্রতি তাঁর পরবর্তী বইয়ের গবেষণার জন্য অধিকৃত পশ্চিম তীর ও ইসরায়েল সফর করেন। সেখানে তিনি দেখেছেন, অনেক ফিলিস্তিনি আতঙ্কের মধ্যে বাস করছেন। তাঁদের কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই। অনেকে উচ্ছেদ কিংবা আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কায় আছেন।
একদিন তিনি দক্ষিণ পশ্চিম তীরের মাখমারি পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। সঙ্গে ছিলেন ইসরায়েলি সাংবাদিক গিদিয়ন লেভি ও আলোকচিত্রী অ্যালেক্স লেভাক। মাসাফের ইয়াত্তা অঞ্চলের আত-তুয়ানি এলাকা থেকে পাথুরে ও পাহাড়ি পথে প্রায় এক ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে তাঁরা পৌঁছান আল-মিরকাজে। এটি অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন একটি এলাকা। চারটি কৃষক পরিবার, মোট প্রায় ৪০ জন মানুষ সেখানে গুহায় বসবাস করেন। তাঁদের অভিযোগ, কাছের অবৈধ বসতিতে থাকা ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিদিন হামলা ও হয়রানি চালায়।
লেখক নিজেও কয়েকজন উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীকে কাছ থেকে দেখেছেন। তারা গাড়ি নিয়ে আসে, হাসে, তাকিয়ে থাকে এবং চলে যায়। ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা লেখক ও তাঁর সঙ্গীদের চা খেতে খেতে বলেন, বসতি স্থাপনকারীরা নিয়মিত তাঁদের ভেড়া মারধর করে, সম্পদ নষ্ট করে এবং এলাকা ছাড়ার হুমকি দেয়।
এই সহিংসতা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগেও ছিল। তবে এরপর তা অনেক বেড়ে গেছে। সম্প্রতি ফিলিস্তিনিদের একটি কুকুরকে এক বসতি স্থাপনকারী মারধর করে। সেই ভিডিও ইসরায়েলে ভাইরাল হয়। এরপর কিছু মানুষের সহানুভূতি দেখা যায় কুকুরটির প্রতি, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের প্রতি নয়।
কুকুর হারানো সেই ফিলিস্তিনি পরিবার এতে যেমন অবাক হয়েছে, তেমনি বুঝেছে যে মূলধারার ইসরায়েলি সমাজে তাদের অস্তিত্ব প্রায় অদৃশ্য। এলাকাটি শুকনো ও অনুর্বর। বাইরে থেকে বেশি খরচ করে পানি আনতে হয়। কিন্তু সেই পানিও প্রায়ই বসতি স্থাপনকারীদের বাধার মুখে পড়ে।
বেইতসালেম নামের ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠনের মাঠকর্মীরা তাঁদের পথ দেখান। পরিবারগুলো এখন হামলার আগাম খবর পেতে ক্যামেরা বসিয়েছে। তবুও তারা কার্যত অরক্ষিত। গত কয়েক বছরে পশ্চিম তীরের আরও বহু গ্রামের মতো তারাও হয়তো দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে না এবং একসময় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে। লেখকের মতে, অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে এটি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমি থেকে সরিয়ে দেওয়া।
এই সংকট দ্রুত গভীর হচ্ছে। আর প্রশ্নটা ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে—আগামী কয়েক দশক পরে ফিলিস্তিনে কি আদৌ কোনো ফিলিস্তিনি অবশিষ্ট থাকবে?
মিডল ইস্ট আইয়ে লিখিত অ্যান্টনি লোয়েনস্টেইনের নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান