ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময় অপরিশোধিত তেলের তুলনায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে ডিজেল। কারণ, এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল পরিবহন, কৃষি, শিল্প, নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, ডিজেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে বেশি থাকলে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
ডিজেল মূলত ট্রাক, বাস, ট্রেন, জাহাজ, সামরিক যান, কৃষিযন্ত্র ও নির্মাণযন্ত্রে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি কারখানা, হাসপাতাল, বড় ভবন ও দুর্গম অঞ্চলের বিদ্যুতের ব্যাকআপ হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের বিকল্প নেই। ফলে এর সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে।
ব্রেন্ট বা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের মতো ডিজেলের কোনো একক বৈশ্বিক মূল্য নেই। অঞ্চলভেদে চাহিদা-সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও করের ওপর ভিত্তি করে এর দাম নির্ধারিত হয়। তাই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের ঝুঁকি, লোহিতসাগরে হুতিদের হামলা এবং রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি সীমিত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো সরাসরি ডিজেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের জ্বালানি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান ব্রিজেট পেইনের মতে, ডিজেলই এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং একই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। মধ্যপ্রাচ্যের রিফাইনারিগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া ও রাশিয়ার রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবহন, কৃষি ও শিল্পে ব্যাপক ব্যবহার থাকায় দাম বাড়ার প্রভাব দ্রুত পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ও ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বে ডিজেলের গড় মূল্য প্রতি লিটার প্রায় ১ দশমিক ৪৭ ডলার। তবে দেশভেদে দামের পার্থক্য ব্যাপক। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুতের দেশ ভেনেজুয়েলায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম মাত্র শূন্য দশমিক ০০৪ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা মাত্র ৪৯ পয়সা) আর হংকংয়ে তা ৪ দশমিক ৩৭৯ ডলার (প্রায় ৫৩৯ টাকা)। মাত্র ৩১টি দেশে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এক ডলারের নিচে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের সময় অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও ডিজেলের দাম দ্রুত কমে না। কারণ, রিফাইনারিগুলো কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই উৎপাদন পরিকল্পনা করে। ফলে বাজারে অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল এলেও তা দ্রুত ডিজেল, পেট্রল বা জেট জ্বালানিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয় না।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে পরিশোধিত জ্বালানির মুনাফা ও রিফাইনিং মার্জিন চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডেনমার্কের স্যাক্সো ব্যাংকের পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধান ওলে হ্যানসেন বলেন, প্রকৃত মূল্যস্ফীতির গল্প এখন অপরিশোধিত তেল নয়, বরং ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানিকে ঘিরেই। তাঁর মতে, ডিজেলের উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন, শিল্প খরচ ও ভোক্তা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।