চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এই সংঘাত শুধু সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ইরানের প্রতিরক্ষা নীতি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের ভেতরে শক্তিশালী জাতীয় ও সামাজিক সংহতি তৈরি হয়। বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমতের স্পষ্ট অবস্থান তেহরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দেয়। এর ফলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত সামরিক প্রযুক্তির মুখেও ইরান কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশটির নিজস্ব ভূখণ্ড, যেখান থেকে প্রতিরোধের পরিধি বৃহত্তর অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাতের আগে ইরানের প্রতিরোধ কৌশল মূলত ‘আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা’ নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এই কৌশলের প্রধান ভিত্তি ছিল লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে বিস্তৃত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’। তবে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ তেহরানকে দেখিয়েছে, তার হাতে আরও শক্তিশালী কৌশলগত উপায় রয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম হলো হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। এই যুদ্ধ ইরানকে তার ভূগোল ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের প্রকৃত গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সহায়তা করেছে। সংঘাতকে আঞ্চলিক পরিসরে বিস্তৃত করা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে তেহরান বৈশ্বিক অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলো উন্মোচিত করেছে।
বর্তমানে ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা এবং অগ্রবর্তী বাহ্যিক প্রতিরক্ষার সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তবে অতীতের তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে প্রতিরোধের প্রথম স্তর ছিল দেশের বাইরে অবস্থানরত মিত্র নেটওয়ার্ক, কিন্তু এখন প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর শুরু হচ্ছে ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে। দ্বিতীয় স্তর হিসেবে প্রয়োজনে আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
ইরানের মূল ভূখণ্ডভিত্তিক প্রতিরোধ তার আঞ্চলিক মিত্রদেরও নতুনভাবে সক্রিয় হতে উৎসাহিত করেছে। বহু বছর ধরে পশ্চিমা দেশ এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা ‘প্রতিরোধের অক্ষের’ দেশ ও গোষ্ঠীগুলোকে শুধু ইরানের প্রক্সি বা হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ এবং ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ইরানের অবস্থান দেখিয়েছে যে তেহরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা যায় সোমবার। সেদিন যখন ইরান সতর্ক করে দেয়—ইসরায়েল যদি বৈরুত এবং দক্ষিণ দাহিয়া উপশহরে হামলা চালায়, তাহলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে সরে আসবে। এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট হয় যে ইরান যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে সব ফ্রন্টকে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করছে।
এই পরিস্থিতি কার্যত ইরানকে একটি উচ্চতর ভূরাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেশটির ভূমিকা বৈশ্বিক মাত্রা পেয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখার প্রকৃত মূল্য ও কার্যকারিতা নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সংঘাতের ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে ইসরায়েলের অবস্থানও পরিবর্তিত হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর তেল আবিব নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল। পশ্চিমা সমর্থনের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে তার সামরিক অভিযানগুলোও তুলনামূলকভাবে বাধাহীন ছিল। তবে ইরানের সামরিক প্রতিরোধ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা সেই প্রচেষ্টার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু বিশ্লেষক এমনও মনে করছেন, এই সংঘাতের পর আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধটি উপসাগরীয় অঞ্চলের সমষ্টিগত নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারণাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে একটি সমষ্টিগত নিরাপত্তাকাঠামো প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই ধারণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে।
আরব উপসাগরীয় দেশগুলো এখন একটি নতুন নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি। বহু বছর ধরে মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া এবং বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরও ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি বলে সমালোচনা হয়েছে। এর ফলে দেশগুলো এখন একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত-পরবর্তী বাস্তবতার ওপর। এ কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই এমন অবস্থানের দিকে ঝুঁকছে, যেখানে দুই পক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করা যায় এবং নতুন আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এড়ানো সম্ভব হয়। আরব নেতাদের পক্ষ থেকে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের জন্য ছাড় অন্তর্ভুক্ত করে একটি শান্তিচুক্তি গ্রহণের আহ্বান সেই প্রবণতার প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সামরিক সক্ষমতা, কৌশলগত শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানও তার নিজস্ব সামরিক সামর্থ্য ও দুর্বলতাগুলো নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পেয়েছে।
সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো ইরানের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে পরিবর্তন। স্বল্প মেয়াদে তেহরানের কূটনৈতিক মনোযোগ পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে বিতর্ক থেকে সরে এসে তার প্রতিরোধ কৌশলের ভূরাজনৈতিক সুবিধা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।