মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং পাঁচ দিনের সফরে ভারতে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এটি মিন অং হ্লাইংয়ের প্রথম বিদেশ সফর। ফলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলে সফরটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এই বিষয়ে মঙ্গলবার (২ জুন) বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। এই কারণে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও পড়ে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অং সান সু চির সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন। এর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন ও গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এই সংঘাতে হাজারো মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
গৃহযুদ্ধের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেও পৌঁছায়। বিশেষ করে মিয়ানমারের শিন জনগোষ্ঠীর বহু মানুষ ভারতের মিজোরাম ও মণিপুরে আশ্রয় নেয়। এ অবস্থায় দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সামরিক সমর্থিত রাজনৈতিক শক্তি বিপুল জয় লাভ করে। বিরোধী দলগুলোর অনেককে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ায় এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ভোটগ্রহণ সম্ভব না হওয়ায় নির্বাচনটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এরপর সামরিক সমর্থকদের প্রাধান্য থাকা পার্লামেন্ট মিন অং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন, মোদি ও মিন অং হ্লাইংয়ের আলোচনায় মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং গৃহবন্দী অং সান সু চির বিষয়ও উঠে এসেছে। ভারত মিয়ানমারে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সব পক্ষকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে—কোনো পক্ষই তাদের ভূখণ্ডকে অপর দেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেবে না। মিন অং হ্লাইং ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আশ্বাস দিয়েছেন, অন্যদিকে মোদি মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পর মিয়ানমারের জন্য এ সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত রাজীব ভাটিয়ার মতে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের স্বীকৃতি মিয়ানমারের বর্তমান নেতৃত্বের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও মিয়ানমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো মিয়ানমার। পাশাপাশি দেশটিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবও ভারতের জন্য একটি কৌশলগত বিবেচনার বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত চায় সংঘাত থেকে বেরিয়ে একটি স্থিতিশীল ও স্বাধীন মিয়ানমার গড়ে উঠুক, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।