ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু হয় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির বাসভবন ও দপ্তরে বিমান হামলার মধ্য দিয়ে। আলি খামেনিকে লক্ষ্য করে এই হামলার পেছনের ধারণা ছিল, খামেনিকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া গেলে বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়বে। লক্ষ্য ছিল এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা, যেমনটা ঘটেছিল লিবিয়ায় মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির পতনের পর বা সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর। এসব দেশে শাসক সরে যেতেই রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ওই সব সিস্টেময় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কার্যত এক ব্যক্তির সঙ্গে বাঁধা ছিল।
কিন্তু ইরানের ইতিহাস ও টিকে থাকার কৌশল আলাদা। সমকালীন খুব কম সরকারেই একটি দপ্তরে এত দৃশ্যমান ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন দেখা যায়, যতটা ইরানে সর্বোচ্চ নেতার পদে। ধর্মীয় বৈধতা, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং চূড়ান্ত রাজনৈতিক মীমাংসার ক্ষমতা—সবই সেখানে মিলিত।
তবে দৃশ্যময়তা মানেই ভঙ্গুরতা নয়। এই দপ্তরের নিচে রয়েছে নিবিড় ও বহুস্তরীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা শুধু নেতাকে সেবা দেওয়ার জন্য নয়; তাকে নিয়ন্ত্রণ, তদারক এবং প্রয়োজনে তাঁকে ছাড়িয়ে টিকে থাকার জন্য গড়ে তোলা। ইসলামি প্রজাতন্ত্র কেবল ধর্মীয় ভাষায় মোড়া ব্যক্তিনির্ভর শাসন নয়। এটি এক বিপ্লবী সিস্টেম, যা নেতৃত্ব বদলের পরিকল্পনায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে। চাপের মুখে এর কাঠামো ভেঙে পড়ার জন্য নয়, বরং একত্রিত হওয়ার জন্য নির্মিত।
ইরানের রাজনৈতিক আচরণ বোঝা যায় না, যদি না ধরা যায়—তাদের শাসকগোষ্ঠী ইতিহাসকে কত গভীরভাবে পাঠ করে। শতাব্দীজুড়ে ইরান রাষ্ট্র বারবার রাজনৈতিক শূন্যতার অভিজ্ঞতা পেয়েছে। সেই স্মৃতিই তাদের রাজনৈতিক কল্পনাকে নির্ধারণ করে। প্রতিটি সংকট মাপা হয় অতীতের পতনের মানদণ্ডে—সচেতনভাবে হোক বা অচেতনভাবে।
যদিও জাফরি শিয়া আইন উপমা গ্রহণ করে না, তবু ইরানের নেতারা প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইতিহাসকে দিকনির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করেন। কাজার রাজবংশের পতন, ইস্পাহান দখলের পর সাফাভি সাম্রাজ্যের ধস, নাদির শাহের মৃত্যুর পরের বিশৃঙ্খলা, কিংবা করিম খান জান্দের মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধ—সব ঘটনাই এক শিক্ষা দিয়েছে: স্পষ্ট নেতৃত্ব না থাকলে দেশ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আর তাই, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারীদের কাছে নেতৃত্ব বদলের সংকট কেবল ধারণা ছিল না; ইতিহাসের কঠিন সতর্কবার্তা ছিল। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বিলোপ করেননি; বরং সেটিকে সিস্টেমর অংশে পরিণত করেন। ১৯৭৯ সালের উত্তপ্ত বিতর্কে, অতীতের পতনের পুনরাবৃত্তি এড়াতে যে সমাধান খোঁজা হয়েছিল, তা সংবিধানে প্রতিফলিত হয়। প্রতিটি প্রধান প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় ইতিহাসে উন্মোচিত নির্দিষ্ট ঝুঁকির জবাব হিসেবে।
গার্ডিয়ান কাউন্সিল গঠিত হয় রাজনৈতিক বিচ্যুতি ঠেকাতে এবং আইনকে ইসলামি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে। গার্ডিয়ান কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ পরিষদ সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ও তদারকের দায়িত্ব নেয়, যাতে জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন না ঘটে। মজলিশে শূরা বা এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিল তৈরি হয় প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা নিরসনে, যাতে উচ্চপর্যায়ের মতভেদ সত্ত্বেও সিস্টেম সচল থাকে। এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিপ্লবকে ভেতরে ও বাইরে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব পায়—বিদেশি হুমকি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা মোকাবিলায়।
এই সচেতনভাবে নির্মিত ও পরস্পর-নির্ভরশীল এসব প্রতিষ্ঠানসমূহ কেবল স্তর বাড়ানোর জন্য নয়; স্থিতিস্থাপকতা সৃষ্টির জন্য। এক অংশ ব্যর্থ হলে অন্য অংশ এগিয়ে আসবে। লক্ষ্য ছিল, রাষ্ট্র যেন কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না থাকে। খোমেনি সরল ভাষায় বলেছিলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করা যেকোনো ব্যক্তিকে রক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—সে ব্যক্তি যত গুরুত্বপূর্ণই হোক। এই চিন্তাই এখনো নেতৃত্বের আচরণকে প্রভাবিত করে।
সিস্টেমটি শুরুতেই বড় পরীক্ষার মুখে পড়ে। প্রেসিডেন্ট আবুলহাসান বনি সদরকে অভিশংসনের পর, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজাই ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ বাহোনার নির্বাচিত হন এবং এক মাসের মধ্যেই নিহত হন। তবু ৫০ দিনের কম সময়ে খামেনি প্রেসিডেন্ট হন। এতে প্রমাণ হয়, সংকটে দ্রুত নতুন নেতৃত্ব তুলে আনা সম্ভব। আট বছর পর খোমেনির মৃত্যুর পর একই পদ্ধতি কাজ করে। খামেনি, যার কাছে খোমেনির ক্যারিশমা বা সর্বোচ্চ ধর্মীয় মর্যাদা ছিল না, তবু প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐকমত্যে সর্বোচ্চ নেতা হন।
রাষ্ট্রের ভেতরের বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—সিস্টেম ব্যক্তির চেয়ে বড়। সাম্প্রতিক ঘটনাও তা দেখিয়েছে। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেলে সংবিধানের বিধান সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়। ক্ষমতা মসৃণভাবে স্থানান্তরিত হয়, দ্রুত নির্বাচন হয়, স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। বিশৃঙ্খলা নয়, বরং এটি হঠাৎ নেতৃত্ব পরিবর্তনের অনুশীলন হয়ে ওঠে।
সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে বলে, সর্বোচ্চ নেতা মারা গেলে বা অক্ষম হলে ক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে একটি অন্তর্বর্তী পরিষদের হাতে যাবে। এতে থাকবেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং প্রজ্ঞা পরিষদের মাধ্যমে নির্বাচিত একজন জ্যেষ্ঠ আলেম। লক্ষ্য নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সিস্টেম বদলানো নয়। সংবিধানে পরবর্তী নেতার যোগ্যতা নির্ধারণ করা আছে, তবে কঠোর ধর্মীয় পথেই নির্বাচন সীমাবদ্ধ নয়।
এই নমনীয়তা উত্তরাধিকারের প্রক্রিয়াকে দর-কষাকষি ও স্থিতিশীলতার পথে রাখে, কেবল ধর্মীয় সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ রাখে না। নতুন নেতা বেছে নেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। যুদ্ধাবস্থায় অন্তর্বর্তী পরিষদ দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারে। বাইরে থেকে যা বিলম্ব মনে হতে পারে, তা ভেতরে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল।
উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট দিলেও, প্রকৃত সিদ্ধান্ত অনেক আগে থেকেই গড়ে ওঠে। সাধারণত তিনটি অনানুষ্ঠানিক ধাপ সম্ভাব্য প্রার্থীদের সীমিত করে। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে নেতা নির্বাচন না করলেও কোন ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য তা নির্ধারণে তাদের প্রভাব থাকে। যারা দেশের প্রতিরক্ষা বা ঐক্য দুর্বল করতে পারে, তারা সাধারণত সমর্থন পায় না।
সর্বোচ্চ নেতার পদ শূন্য হলে, বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা সংস্থা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারে এবং স্থলবাহিনী অভ্যন্তরীণ স্থিতি রক্ষায় মনোযোগী হবে। তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকবে সিস্টেমকে শক্তিশালী ও স্বনির্ভর রাখা, পাশাপাশি নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্রোত কোমকেন্দ্রিক সম্পর্কজালে প্রবাহিত। সম্ভাব্য উত্তরসূরির এমন ধর্মতাত্ত্বিক প্রোফাইল থাকতে হবে, যা অন্তত নীরব সমর্থন পাবে জ্যেষ্ঠ আলেমদের কাছ থেকে।
ধর্মীয় ও নিরাপত্তা বিবেচনার বাইরে উত্তরাধিকারের বর্ণনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, ঘটনাবলির বয়ানের মাধ্যমেও গড়ে ওঠে। নেতা কীভাবে মারা গেলেন, তা-ও প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের মধ্যে মৃত্যু হলে শহীদত্বের ধারণা প্রাধান্য পেতে পারে, এবং তখন স্থির ও দৃঢ় বলে বিবেচিত ব্যক্তিরাই বিবেচনায় আসবেন। সবচেয়ে সংবেদনশীল সময় সম্ভবত নতুন নেতা নির্বাচনের পর। নতুন নেতৃত্বকে দ্রুত ভেতরে কর্তৃত্ব প্রমাণ করতে হবে এবং বাইরে স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে হবে। বিপ্লব ও অনিশ্চয়তায় গড়া রাষ্ট্রে এই প্রমাণ প্রতীকে নয়, কর্মকাণ্ডে দেখাতে হয়।
পরিবর্তনের সময়ে কিছু পদক্ষেপ বাইরের মানুষের চোখে বিভ্রান্তিকর লাগতে পারে। যা বিদেশ থেকে আক্রমণাত্মক মনে হয়, তা ভেতরে আশ্বস্ত করার কৌশল হতে পারে। দূর থেকে বিশৃঙ্খলা মনে হলেও, বাস্তবে তা স্বাভাবিকতায় ফেরার প্রয়াস। অনেকে আকস্মিক পতনের প্রত্যাশা করেন, কিন্তু দেখেন না—সিস্টেমটি আঘাত সামলানোর জন্যই নির্মিত। ভিন্ন গোষ্ঠীগুলো সাধারণত নিজেদের স্বার্থকে অতিরিক্ত চাপিয়ে না দিয়ে সিস্টেমকে অটুট রাখতে আগ্রহী।
ইরানকে প্রায়ই ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক শৃঙ্খলা হিসেবে তুলে ধরা হয়। অথচ ১৯৭৯ সালের বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্রীয় শাসনকাঠামো গড়ে উঠেছে ভিন্ন যুক্তিতে—বিপ্লবী অভিজ্ঞতার ভেতরে দাঁড়িয়ে। খোমেনি এক মন্তব্যে এই শ্রেণিবিন্যাস তুলে ধরেছিলেন, যা ইরানের রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে প্রায়ই উদ্ধৃত হয়: ইসলামি প্রজাতন্ত্র সংরক্ষণ করা যেকোনো ব্যক্তিকে সংরক্ষণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সে ব্যক্তি যদি ‘যুগের ইমাম’ও হন—যা শিয়াবাদের দ্বাদশ ইমাম মুহাম্মদ আল-মাহদির প্রতি ইঙ্গিত। তবে এই সিস্টেম সব সময় এই নীতি অনুসরণ করবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে তেহরানে নেতৃত্ব পরিবর্তনকে সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান