আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ১৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অবস্থিত আফগান দূতাবাসে অনুষ্ঠিত হলো ‘ভিক্টরি ডে’ উদ্যাপন। অনুষ্ঠানে ভারতীয় কূটনীতিকদের পাশাপাশি প্রায় দুই ডজন বিদেশি কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন। কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন ছিল।
২০২১ সালের ১৭ আগস্ট তালেবান কাবুল দখলের পরপরই ভারত তড়িঘড়ি করে সেখানে থাকা দূতাবাস খালি করে দেয়। তখন থেকে এখন পর্যন্ত তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও নয়াদিল্লি তাদের সঙ্গে প্রকাশ্য কূটনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের এই অবস্থান ‘সতর্ক সম্পৃক্ততা’ হলেও অনেকেই বলছেন, এটি একটি বাস্তববাদী বা সুযোগসন্ধানী নীতির প্রতিফলন।
২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতনের পর আফগানিস্তানে সড়ক, বাঁধ, সংসদ ভবন, হাসপাতাল ও শিক্ষা খাতে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলারের উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছিল ভারত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আশরাফ গনি সরকারের পতন ঘটে এবং তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসে।
এরপর নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—তালেবানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা অথবা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়েই সীমিত সম্পর্ক বজায় রাখা। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় পথই বেছে নেয় ভারত, যাতে তাদের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও আফগানিস্তানে প্রভাব পুরোপুরি হারিয়ে না যায়।
এই পরিবর্তনের বড় কারণ পাকিস্তানও। একসময় তালেবানের প্রধান মিত্র হিসেবে পরিচিত ইসলামাবাদের সঙ্গে এখন আফগান শাসকদের সম্পর্ক তিক্ত। সীমান্তে একাধিক সংঘর্ষের পর দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস বেড়েছে। ভারত এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে।
আরেকটি কারণ চীন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সরে যাওয়ার পর বেইজিং আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে সক্রিয় হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়াও তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। ফলে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়তে ভারতও সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি উচ্চপর্যায়ের সফরে নয়াদিল্লি যান। এরপর থেকেই দিল্লিতে আফগান দূতাবাস কার্যত তালেবান-নিযুক্ত কূটনীতিকদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
বর্তমানে তালেবানের ভারপ্রাপ্ত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মুফতি নূর আহমদ নূর ভারতের স্বাধীনতা দিবস, রাষ্ট্রপতি ভবনের সংবর্ধনা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। যদিও ভারত এখনো তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তবু দিল্লি, মুম্বাই ও হায়দরাবাদের আফগান মিশনগুলো তালেবান-মনোনীত কর্মকর্তারাই পরিচালনা করছেন।
সম্পর্ক উষ্ণ হলেও ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান থেকে উদ্ভূত সন্ত্রাসী হুমকি এখনো কমেনি। ইসলামিক স্টেট-খোরাসান (আইএস-কে) এবং আল-কায়েদাসহ একাধিক জঙ্গি সংগঠন সেখানে সক্রিয় রয়েছে।
তবে ভারতের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, প্রতিবেদনে লস্কর-ই-তৈয়বা বা জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো ভারতবিরোধী সংগঠনগুলোর তৎপরতার কোনো উল্লেখ নেই। তবু নয়াদিল্লি সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে।
তালেবানও ভারতকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে। ‘ভিক্টরি ডে’ অনুষ্ঠানে মুফতি নূর আহমদ নূর বলেন, গত পাঁচ বছরে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আফগানিস্তানে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার হয়েছে। আফগানিস্তানের ভূখণ্ড কোনো নেতিবাচক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়; বরং এটি আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও যৌথ সমৃদ্ধির সেতু হতে পারে।
ওই সময় অনুষ্ঠানের মঞ্চে বড় পর্দায় ভেসে উঠেছিল, ‘From Victory to Regional Economic Connectivity’। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসের কেন্দ্র নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে চায় তালেবান।
তবে ভারত-আফগানিস্তান সম্পর্কের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক মানবাধিকার। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (সভাপতিত্ব তখন ভারতের হাতে ছিল) নারীর অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল।
২০২২ সালে তালেবান মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা নিষিদ্ধ করলে ভারত প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অবস্থান অনেকটাই নরম হয়েছে।
তালেবান সরকারের সময়ে ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ, নারীদের অনেক কর্মক্ষেত্রে কাজের সুযোগ সীমিত এবং পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ আফগান নারী এসব বিধিনিষেধের প্রভাব ভোগ করছেন।
তবু ভারতের বর্তমান কূটনৈতিক আলোচনায় নারী শিক্ষা বা মানবাধিকার আর প্রকাশ্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বরং ভারত আফগানদের জন্য চিকিৎসা, ব্যবসা ও শিক্ষার ভিসা চালু রাখা এবং ভারত-অর্থায়িত উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাজনৈতিক স্বীকৃতি না দিলেও আফগান জনগণের প্রতি মানবিক সহায়তা বন্ধ করেনি ভারত। ২০২১ সালের পর দেশটি ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম, ৪৪৫ টনের বেশি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, টিকা, বন্যা ও ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ, তাঁবু ও খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছে।
ভারতের কর্মকর্তারা বলছেন, এই সহায়তা তালেবান সরকারের জন্য নয়, আফগান জনগণের জন্য।
সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে ভারত-তালেবান সম্পর্ক অনেক দূর এগিয়েছে। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও মানবিক সহায়তা এখন নিয়মিত হলেও একটি বিষয় এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। আর তা হলো—ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি।
তথ্যসূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস