২৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজা, ইরান, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের পর এটিই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে নিরাপত্তা, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ, বিচারব্যবস্থার সংস্কার ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো ইস্যুগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
নির্বাচনটি ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকোট। জনমত জরিপে দুজনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সামরিক অভিজ্ঞতা ও রাজনীতিতে তুলনামূলক নতুন মুখ হওয়ায় আইজেনকোটের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। গত বছর তিনি নিজের দল ‘ইয়াশার’ গঠন করেন। গাজা যুদ্ধে তাঁর সেনাসদস্য ছেলে নিহত হন। নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করলেও সংঘাত পরিচালনা নিয়ে মতবিরোধের জেরে ২০২৪ সালে পদত্যাগ করেন তিনি। ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিরোধী এই নেতা।
বিরোধী শিবিরে আরও রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, অ্যাভিগডর লিবারম্যান ও বামপন্থী নেতা ইয়ার গোলান। বেনেট ও লিবারম্যান নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের পক্ষে এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ইসরায়েলের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ সমর্থন করেন। অন্যদিকে গোলান পশ্চিম তীরের বড় অংশ থেকে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারের পক্ষে। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকার পরও তাঁরা আইজেনকোটের সঙ্গে সরকার গঠনে সহযোগিতা করতে পারেন।
ইসরায়েলের পার্লামেন্টের নাম নেসেট। এতে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
দেশটিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু থাকায় সাধারণত কোনো দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে না। ফলে, নির্বাচনের পর একাধিক দলকে নিয়ে জোট গঠনের আলোচনা চলে। সমঝোতা ও দর-কষাকষির কারণে নতুন সরকার গঠনে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিরাপত্তা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিরোধীরা নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুর সমালোচনা করছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে নিজেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
আলট্রা-অর্থোডক্স ইহুদি পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির বিষয়টিও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধিতা এবং খাদ্য ও আবাসন ব্যয় বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছর পরও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ এসব পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।
এ ছাড়া পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ বলে বিবেচিত ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।
গাজা প্রশ্নে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট—দুই শিবিরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনাকে সমর্থন করে। ওই পরিকল্পনায় হামাসের অস্ত্র ত্যাগের বিনিময়ে পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। আইজেনকোট ১৮ মাসের মধ্যে হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকারও করেছেন।
পশ্চিম তীরে নেতানিয়াহুর শিবির বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখতে চায়। আইজেনকোট সাধারণভাবে ইসরায়েলি বসতি সমর্থন করলেও বিতর্কিত ই১ প্রকল্পের বিরোধিতা করেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একসময় ইসরায়েলের মূলধারার বহু রাজনীতিক স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রধান ইহুদি দলগুলোর কেউই এ প্রস্তাবকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে রাখেনি।
২৭ অক্টোবর স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যমগুলো বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করবে। পরদিন প্রাথমিক ফলাফল ও ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের কথা রয়েছে।
এরপর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় নেতাকে দায়িত্ব দেবেন। কোনো নেতা ব্যর্থ হলে অন্য নেতাকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কেউ সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এবারের নির্বাচনে তাই শুধু কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা-ই নয়; বরং ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।