হোম > বিশ্লেষণ

বিশ্বজুড়ে এআই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করছে চীন!

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

চীনের মুনশটের কিমি কে৩—এআই মডেল পশ্চিমা দুনিয়ার এআই চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ জানানো শুরু করেছে। ছবি: সংগৃহীত

ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন থেকে এক ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। দেশটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্যকে নাড়িয়ে দেওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে। চীনা প্রতিষ্ঠান মুনশটের তৈরি ওপেন সোর্স এআই মডেল ‘কিমি কে৩’ বাজারে আসার পর থেকেই শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং পশ্চিমা প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই মডেল বিদ্যমান ব্যবসায়িক মডেল এবং প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।

এই মডেলটি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সবচেয়ে উন্নত এআই সিস্টেমগুলোর সমপর্যায়ের সক্ষমতা প্রদর্শন করে, অথচ এটি পরিচালনার খরচ তুলনামূলকভাবে কম। পাশাপাশি, মুনশট ব্যবহারকারীদের জন্য মডেলটির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত কোড অবাধে ডাউনলোড, ব্যবহার এবং পরিবর্তনের সুযোগও দিয়েছে।

গত রোববার নতুন মডেল ব্যবহারের জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষের হুমড়ি খেয়ে পড়ায় সার্ভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে মুনশট সাময়িকভাবে নতুন সাবস্ক্রিপশন গ্রহণ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

এদিকে, চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবাও ঘোষণা দিয়েছে, তারা তাদের ওপেন-সোর্স এআই মডেল কুয়েনের নতুন সংস্করণ উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোম্পানিটির দাবি, এটি হবে ‘বর্তমানে পাওয়া যাওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী মডেলগুলোর একটি’, যা সক্ষমতার দিক থেকে অ্যানথ্রপিকের সবচেয়ে উন্নত মডেলের ঠিক পেছনেই অবস্থান করবে।

এই অগ্রগতির সময়েই চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চীনা এআই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানোর উদ্যোগ জোরদার করছেন। এই উদ্যোগের ফলে বেইজিং-নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি বহু দেশে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআইয়ের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী ডিন বল এক্সে লিখেছেন, চীনের এআই কোড বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেওয়ার কৌশল সম্ভবত ‘পূর্ণাঙ্গ এআই কমিউনিজমের’ বা সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে, ‘মূলত চীন এটিই প্রস্তাব করছে।’

গত সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিনিয়োগকারীরা সপ্তাহান্তজুড়ে কিমি কে৩-এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, সোমবারও এই দরপতন অব্যাহত থাকতে পারে। ডিন বলের মতে, এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন চীনা এআই মডেলের ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ নিতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে আলিবাবাকে ইতোমধ্যেই হোয়াইট হাউসের কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করা হয়েছে।

প্যারামিটারের সংখ্যা দিয়ে শক্তিমত্তা পরিমাপ করা হলে কিমি কে৩ ই হবে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত এআই মডেল। আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস এবং এরিনা. এআই-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর কর্মক্ষমতা ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সর্বাধুনিক মডেলগুলোর সমতুল্য। আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, কিমি কে৩ পরিচালনার খরচও কম। প্রতিটি ‘ইন্টেলিজেন্স ইনডেক্স’ টাস্ক সম্পন্ন করতে এর ব্যয় মাত্র দশমিক ৯৫ মার্কিন ডলার (প্রায় দশমিক ৭০ পাউন্ড), যেখানে ওপেনএআইয়ের সবচেয়ে উন্নত মডেলের ক্ষেত্রে একই কাজের জন্য খরচ ১ দশমিক ০৪ মার্কিন ডলার।

কিমি কে৩-এর উন্মোচনের পর যুক্তরাষ্ট্রে আত্মসমালোচনার ঢেউ উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, এমন একটি প্রযুক্তি কেন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হলো না। মুনশটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ইয়াং ঝিলিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গে অবস্থিত কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় নিজের দক্ষতা গড়ে তুলেছিলেন। পরে তিনি নিজ দেশ চীনে ফিরে যান।

সিএমইউর অধ্যাপক রাস সালাখুতদিনভ ইয়াংকে পড়িয়েছিলেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, তাঁর ছাত্রের ‘যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার অসংখ্য সুযোগ ছিল’, এমনকি অ্যাপল থেকেও চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন। তবুও তিনি নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মুনশটের এই নাটকীয় উত্থান এমন সময় ঘটছে, যখন সি চিনপিং বৈশ্বিক পর্যায়ে চীনের এআই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। শুক্রবার এক ভাষণে তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর এআই সক্ষমতা বাড়াতে বেইজিং সহায়তা করবে। তাঁর এই বক্তব্যের মাত্র একদিন আগে রাশিয়া, ব্রাজিল ও পাকিস্তানসহ ২৯টি দেশ চীনের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনে যোগ দেয়।

ইউনিভার্সিটি অব সারের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড বলেন, ‘চীনারা মনে হচ্ছে তাদের মডেলগুলো জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সেগুলোর বিস্তার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে চীনকে প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। তখন তারা চাইলে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপও করতে পারে।’

স্বাধীন প্রযুক্তি বিশ্লেষক রিচার্ড উইন্ডসর বলেন, ‘এআই খাতে চীনের কৌশল অনেকটাই সৌর প্যানেল শিল্প দখলের সময়কার তাদের অত্যন্ত সফল কৌশলের পুনরাবৃত্তি। একই ধরনের কৌশল তারা অটোমোবাইল শিল্পেও অনুসরণ করছে, যার সুফলও ইতোমধ্যে দেখা যেতে শুরু করেছে।’

সম্প্রতি মার্কিন প্রতিষ্ঠান হারমোনিক সিকিউরিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে প্রতি ১২ জন কর্মীর মধ্যে অন্তত একজন ইতোমধ্যেই কোনো না কোনো ধরনের চীনা এআই ব্যবহার করছেন। হারমোনিকের প্রধান নির্বাহী অ্যালাস্টেয়ার প্যাটারসন বলেন, ‘এসব প্ল্যাটফর্মে জমা দেওয়া সব তথ্যকেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, কারণ এগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতার সম্পূর্ণ অভাব রয়েছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, চীন যদি এভাবে এআই প্রযুক্তি উন্মুক্তভাবে বিতরণ করতে থাকে, তবে তা শুধু বেইজিংয়ের বৈশ্বিক প্রভাবই বাড়াবে না, বরং ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেলকেও বড় ধরনের চাপে ফেলবে। এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস করে, তাদের এআই সেবার সাবস্ক্রিপশন ফি প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যয় করা বিপুল অর্থের যথার্থতা প্রমাণ করবে এবং ভবিষ্যতে তাদের বাজারমূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ–এর অধীনস্থ ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান সিয়ারান মার্টিন বলেন, ‘এটি একটি ওপেন ওয়েটস (open weights) মডেল। অর্থাৎ খুব শিগগিরই এটি যে কেউ ব্যবহার ও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারবে। এর সঙ্গে যদি কম খরচও যুক্ত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি প্রভাব বলয়ের বাইরের দেশগুলোতে এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। ফলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেলের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।’

মার্কিন এআই জায়ান্টগুলোর ওপর এমন চাপের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে এআই অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে নজিরবিহীন বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করেছে। যদি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধারণা জন্মায় যে এই বিপুল বিনিয়োগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না, তাহলে অন্তত শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।

এত শক্তিশালী একটি ওপেন-সোর্স এআই মডেলের সহজলভ্যতা সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অ্যানথ্রপিকের সর্বশেষ এআই মডেল ‘ক্লদ মিথোস’–এর ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল, কারণ আশঙ্কা ছিল এটি আর্থিক ব্যবস্থায় সাইবার হামলার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।

সিয়ারান মার্টিন সতর্ক করে বলেন, ‘কিমি কে৩ নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। শুধু এটি চীনের তৈরি বলেই নয়, বরং এটি ওপেন হওয়ার কারণেও। এর অর্থ হলো, সাইবার আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি ক্লড মিথোসের মতোই সক্ষমতা দিতে পারে। কিন্তু ক্লড মিথোসের ক্ষেত্রে যেভাবে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ (gatekeeping) করা হয়েছিল, এখানে তা করা সম্ভব হবে না।’

তথ্যসূত্র: টেলিগ্রাফ ইউকে

ককরোচদের আন্দোলন যে ৭ কারণে অতীতের চেয়ে আলাদা

ইসরায়েলিরা আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসে, কিন্তু আর্জেন্টাইনরা কি তাদের ভালোবাসে

ভূরাজনৈতিক সংঘাতে কেন সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে ডিজেল

‘রামরাজ্য’ কেমন ছিল

উত্তর প্রদেশে নামবদলের রাজনীতি: যেভাবে মুসলিম ঐতিহ্য মুছে দিচ্ছেন আদিত্যনাথ

বিশ্বকাপ ফাইনাল: হেভি মেটাল বনাম নিখুঁত অর্কেস্ট্রার লড়াইয়ে জিতবে কে

ডোনাল্ড ট্রাম্পই কি সর্বশেষ মার্কিন জায়োনিস্ট প্রেসিডেন্ট

চীনের ৫০০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের বিপরীতে ভারতের শূন্য, ব্যবধান ঘোচাতে পারবে দিল্লি?

জ্বালানি ও বিনিয়োগের বিনিময়ে কুয়েতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করছে পাকিস্তান

মাঠের বাইরে মেসির অন্য সাম্রাজ্য: বিলাসবহুল হোটেল থেকে পোশাক সব খাতেই বিপুল বিনিয়োগ