হোম > বিশ্লেষণ

চীনে সরকারি লোক হতে কত মূল্য চুকাতে হয়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সিএনএন

চীনে সরকারি চাকরি মানে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ এক ক্যারিয়ার। তবে অনেকের কাছে শক্তিশালী এই অবস্থান ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিনিময়ে পাওয়া একধরনের সামাজিক চুক্তিও। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নেতৃত্বে গত এক দশকে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন, বিদেশভ্রমণ, বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, বন্ধুত্ব—এমনকি সামাজিক আড্ডার ওপরও নজরদারি ও বিধিনিষেধ বেড়েছে।

উদাহরণ হিসেবে চীনের এক সরকারি নারী কর্মীর কথাই বলা যাক। বিদেশের একটি বিমানবন্দরে পরিচয় হওয়া এক বিদেশি পুরুষের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সহকর্মীরা তাঁকে অভিনন্দন জানানোর বদলে বিভাগীয় প্রধানের নির্দেশ মেনে বিয়েটি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন। কারণ, বিদেশিকে বিয়ে করলে তাঁর চাকরি হারানোর ঝুঁকি ছিল।

চীনে দীর্ঘদিনের একটি বিধান অনুযায়ী—সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশি নাগরিককে বিয়ের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। সি চিন পিং ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর এসব নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হয়েছে।

বার্লিনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মেরিক্সের বিশেষজ্ঞ কাটজা ড্রিনহাউসেনের মতে, সির আমলে ব্যক্তি, কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রের লক্ষ্য—এই তিনের মধ্যে পার্থক্য অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে, পার্টির সদস্যদের ব্যক্তিগত জীবনও রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

চীনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রায় সাত কোটি মানুষ কাজ করেন বলে ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও সরকারি হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা রয়েছেন। ফলে, এসব বিধিনিষেধের প্রভাব শুধু আমলাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি ঠেকানো এবং রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সুরক্ষার যুক্তিতে বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিদেশ ভ্রমণের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে বেইজিং। একই সঙ্গে সির দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও এই ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করেছে। রাষ্ট্রীয় কর্মীদের অনেককেই ব্যক্তিগত পাসপোর্ট জমা দিতে হয়। বিদেশ যেতে হলে নির্দিষ্ট অনুমতি নিয়ে পাসপোর্ট ‘ধার’ করতে হয় এবং কোথায় যাবেন, কত দিন থাকবেন, কী করবেন—সব তথ্য দিতে হয়। অনুমোদনের পর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতেও নতুন অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও গোপন তথ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ওপর বিধিনিষেধ আরও কঠোর। মহাপরিচালক বা তাঁর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে অবসর নেওয়ার পরও বিদেশ ভ্রমণে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে। বিদেশে স্ত্রী বা সন্তান থাকলে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এক সাবেক সরকারি কর্মী জানান, ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলের সমাবর্তনে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি টিকিট পর্যন্ত কিনেছিলেন, কিন্তু আবেদন করেও বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পাননি।

শুধু ভ্রমণ নয়, বিবাহবিচ্ছেদও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুর্নীতির অর্থ লুকাতে বিবাহবিচ্ছেদ ব্যবহার করা হয়েছে—এমন ঘটনাও চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এসেছে। তাই কর্মকর্তাদের বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন জানানো বাধ্যতামূলক এবং তা নজরদারির আওতায় আসতে পারে।

চীনের সামরিক বাহিনী—পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সদস্যদের ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর। বিয়ের আগে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় যাচাই করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুজন সামরিক সদস্যের বিবাহবিচ্ছেদেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কও ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারে। পার্টির শৃঙ্খলাবিধিতে ‘অনুচিত যৌন সম্পর্ক’ নেতিবাচক প্রভাব ফেললে বহিষ্কারের ঝুঁকি রয়েছে।

সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও এখন অনেকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে। কেউ কেউ অফিসের বাইরে রাতের দিকে, এমনকি দেরিতে দেখা করেন, যাতে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। সি চিন পিং পার্টির সদস্যদের মধ্যে ‘পরিষ্কার ও সরল সম্পর্ক’ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে সরকারি চাকরির আকর্ষণও কমেনি। বেসরকারি খাতে সুযোগ সংকুচিত হওয়া, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবাসন-সংকট ও তরুণদের বেকারত্বের কারণে রাষ্ট্রীয় চাকরিকে অনেকেই নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ হিসেবে দেখছেন। গত বছর মাত্র ৩৮ হাজার ১০০টি সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ। অর্থাৎ, প্রতি পদের বিপরীতে প্রায় ১০০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা এখন ১০ কোটির বেশি। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি রাষ্ট্রের কেন্দ্রে রয়েছে। তবে সি চিন পিংয়ের সময়ে সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পার্টির নেতৃত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বহু সরকারি কর্মী এসব বিধিনিষেধকে অসুবিধাজনক মনে করলেও চাকরির স্থায়িত্ব, ক্ষমতা ও মর্যাদার বিনিময়ে তা মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক আনুগত্যের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রবেশ তাই শুধু একটি চাকরি পাওয়ার ঘটনা নয়। এটি এমন এক জীবনব্যবস্থায় প্রবেশ, যেখানে ব্যক্তির ক্যারিয়ার, সম্পর্ক, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—সবকিছুর ওপরই দলীয় আনুগত্যের ছায়া পড়ে। আর সি চিন পিংয়ের চীনে সেই আনুগত্যের মূল্য দিন দিন আরও বেশি হয়ে উঠছে।

সিএনএন অবলম্বনে