হোম > বিশ্লেষণ

মক্কা জোট রেখে হুতিদের মোকাবিলায় ইসরায়েলের দ্বারস্থ কেন সৌদি আরব

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সৌদি আরব ইসরায়েলের সহায়তা চেয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইসরায়েল হায়োম, ওয়ালা এবং দ্য জেরুজালেম পোস্টে পৃথকভাবে নিজ নিজ কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, হুতি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূল ধরে অগ্রসর হওয়া, পেরিমসহ গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখল এবং সৌদি শহর, বিমানঘাঁটি ও তেল অবকাঠামোয় হামলা চালানোর সময় রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের কাছে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে।

অন্যদিকে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স আলাদাভাবে জানিয়েছে—সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি ওয়াশিংটনের কাছে সামরিক সহায়তার আবেদন করেছেন। তবে রিয়াদ বা জেরুজালেম, কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এসব খবর নিশ্চিত করেনি।

এখানে বিষয়টির পরিধি স্পষ্টভাবে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনগুলোতে যে সহায়তার কথা বলা হয়েছে, তা হলো গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও হুমকির অবস্থান শনাক্তে সহায়তা। এতে ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপ, বিমান হামলা কিংবা সৌদি আরবে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েনের কথা বলা হয়নি।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের কাছ থেকে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য ও রিকনেইশ্যান্স (কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য, এলাকা বা শত্রু পক্ষ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের একটি সামরিক বা কৌশলগত প্রক্রিয়া) সহায়তা চাওয়া এমন এক পদক্ষেপ, যার রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম এবং যেটি সহজে গোপন রাখা বা অস্বীকার করা যায়। অন্যদিকে, কোনো চুক্তিবদ্ধ মিত্রের কাছ থেকে সরাসরি সামরিক সহায়তা নেওয়ার জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতে পারে। সম্ভবত এ কারণেই রিয়াদের জন্য এই চ্যানেলটি মক্কা চুক্তি বা পাকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার তুলনায় ব্যবহার করা সহজ হয়েছে।

তবে এটিও নতুন কোনো চ্যানেল নয়।

একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে চাপে সৌদি

সৌদি আরবের ওপর চাপ এখন বাস্তব এবং একাধিক দিক থেকে আসছে। হুতি বাহিনী ১২ সেপ্টেম্বর পেরিম দ্বীপ দখল করেছে। এর ফলে সৌদি আরবের কার্যকর থাকা শেষ তেল রপ্তানি করিডরটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এর এক দিন আগে ড্রোন হামলায় পেট্রোলাইন পাইপলাইন বা ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন অচল হয়ে পড়েছিল।

একই সময়ে বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিও কার্যত সীমিত হয়ে আছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। অর্থাৎ, এটি কোনো একটি বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা নয়। একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পথ ও অবকাঠামো ঘিরে তৈরি হয়েছে সংকট। এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পারে কেন রিয়াদ পুরোনো বা নতুন কোনো একটি অংশীদারের ওপর অপেক্ষা না করে সবচেয়ে দ্রুত পাওয়া যায় এমন চ্যানেল ব্যবহার করেছে।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন

এই পরিস্থিতি চলতি বছরের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদি তিন দেশ ন্যাটো ধাঁচের চুক্তি করেই থাকে, যেখানে একজনের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে—তাহলে হুতিদের বিরুদ্ধে সহায়তার জন্য রিয়াদ কেন আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের বদলে জেরুজালেমের দিকে তাকাচ্ছে?

প্রশ্নটি যথেষ্ট যৌক্তিক। আর এর উত্তর শুধু এই বলে দেওয়া যে ‘চুক্তিটি এখনো খুব নতুন’ তা যথেষ্ট নয়। কারণ, রিয়াদ শুধু তার নিরাপত্তা কাঠামোর নতুন ও এখনো পুরোপুরি গড়ে না ওঠা অংশটিকে পাশ কাটাচ্ছে না। তার হাতে আরও পুরোনো এবং কার্যকর কিছু ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলোও এই সংকটে ব্যবহার করা হচ্ছে না। এমনকি সম্ভবত রিয়াদ এমন একটি সক্ষমতা চাইছে, যা তার মুসলিম বিশ্বের অংশীদারদের কাছে আদৌ নেই।

২০২৫ সালের সৌদি-পাকিস্তান কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রায় ৮ হাজার পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান এবং একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইতোমধ্যে সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। মক্কা চুক্তি এই ব্যবস্থাকে বাতিল করে তৈরি হয়নি, বরং এর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ, এটি এমন একটি কার্যকর দ্বিপক্ষীয় ও যুদ্ধ-প্রস্তুত ব্যবস্থা, যার অস্তিত্ব ছয় সপ্তাহের পুরোনো কোনো কাঠামোর মতো নয়, যেখানে এখনো নিয়ম-কানুন ও কার্যপ্রণালি তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু এই সংকটেও রিয়াদ সেটি সক্রিয় করছে না।

যদি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক অপরিপক্বতাই ইসরায়েলের কাছে যাওয়ার কারণ হতো, তাহলে সৌদিতে আগে থেকেই থাকা পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় মোতায়েনই স্বাভাবিকভাবে প্রথমে সক্রিয় হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হয়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুতিদের বিরুদ্ধে বহুপক্ষীয় জোট গড়তে সৌদি আরবের মক্কা চুক্তিরও প্রয়োজন নেই। এমন একটি জোট তারা এর আগেই তৈরি করেছে।

আগেই তৈরি ছিল হুতিবিরোধী জোট

এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্ক দুটিই রয়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে মিসর, জর্ডান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইনসহ আরও কয়েকটি দেশ। অর্থাৎ, এই নির্দিষ্ট সংকট মোকাবিলায় রিয়াদের হাতে তিনটি পৃথক পথ রয়েছে। প্রথমত, সৌদি আরবে ইতোমধ্যে থাকা দ্বিপক্ষীয় পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন। দ্বিতীয়ত, হুতিদের বিরুদ্ধে তৈরি একটি বিশেষায়িত বহুপক্ষীয় সামুদ্রিক জোট, যেখানে মক্কা চুক্তির দুই অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্কও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তৃতীয়ত, সদ্য স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি।

তারপরও রিয়াদ এই তিনটি পথের বাইরে গিয়ে সেন্ট্রাল কমান্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি গোপনীয় ও সীমিত যোগাযোগের পথ বেছে নিচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু কোনো একটি কাঠামো কতটা নতুন বা পুরোনো, তা নিয়ে নয়। বরং এটি ইঙ্গিত করে যে রিয়াদ আসলে কী চাইছে। সম্ভবত তারা এমন একটি গোয়েন্দা সক্ষমতা চাইছে, যা তাদের আঞ্চলিক অংশীদাররা এককভাবে বা সম্মিলিতভাবেও দিতে পারবে বলে রিয়াদ মনে করছে না। একই সঙ্গে তারা এমনভাবে সেই সক্ষমতা পেতে চাইছে, যাতে ওপরের তিনটি ব্যবস্থার কোনো একটিকে প্রকাশ্যে সক্রিয় করার রাজনৈতিক ঝুঁকিও না নিতে হয়।

বিষয়টি শুধু প্রস্তুতির নয়, সক্ষমতারও

এর একটি কারণ খুব সাধারণ হতে পারে। আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ হয়তো জেরুজালেম যে ধরনের সক্ষমতা দিতে পারছে, সেটি দিতে পারছে না। ইসরায়েলের সঙ্গে এই যোগাযোগের পেছনে এমন একটি প্রমাণিত গোয়েন্দা ও নজরদারি সক্ষমতার ইতিহাস রয়েছে, যা এই ধরনের সামুদ্রিক পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ইরানের নৌবাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে হরমুজ প্রণালির আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইসরায়েল ইতোমধ্যে একাধিক স্তরের গোয়েন্দা সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে, তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয়ই মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেও লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব অঞ্চলে একই ধরনের তুলনীয় সক্ষমতা দেখিয়েছে, এমন প্রমাণ নেই।

তাই ‘মক্কা চুক্তির কোনো অংশীদারের কাছ থেকে সহায়তা’ এবং ‘ইসরায়েলের কাছ থেকে পাওয়া নির্দিষ্ট গোয়েন্দা সক্ষমতা’কে একই ধরনের সহায়তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ, ওই আঞ্চলিক কাঠামোগুলোর কোনো একটি সক্রিয় করলেও এখানে যে নির্দিষ্ট সক্ষমতার প্রয়োজন, সেটি সমাধান হবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই সংকট থেকে দূরে থাকার পেছনে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক অপরিপক্বতা নয়, আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত কারণ থাকতে পারে। মক্কা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সময়ই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান তেহরান সফর করেছিলেন। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে তুরস্কের বাস্তব অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা একটি পক্ষের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত একটি শক্তির বিরুদ্ধে, সুন্নি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান সক্রিয় করা তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয়েরই এমন কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে, যেখানে তারা সরাসরি কোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার বদলে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে আরও একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

নিজস্ব নিয়ম এখনও লিখছে মক্কা প্রতিরক্ষা জোট, পরিণত হয়নি আইনেও

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বয়স এখনও মাত্র ছয় সপ্তাহের মতো। গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে এর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশ সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়। শুরুতে তিন বছরের জন্য এই সচিবালয়ের দায়িত্বে থাকবেন একজন পাকিস্তানি মহাসচিব। একই সঙ্গে জোটটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স বা মক্কা প্রতিরক্ষা জোট।

চুক্তির বাস্তবায়ন পরিচালনার জন্য একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক পলিটিক্যাল অ্যান্ড ডিফেন্স কমিটি’ বা কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এটুকুই জোটটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। চুক্তিতে কোনো যৌথ কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী কিংবা যৌথভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দিষ্ট ট্রিগার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এ ছাড়া চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ পাঠও এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তুরস্কের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, আঙ্কারা সম্ভবত অক্টোবর মাসে চুক্তিটি তুরস্কের পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করবে। অর্থাৎ, চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহ পরও এটি তুরস্কে অভ্যন্তরীণভাবে বাধ্যতামূলক আইনি শক্তি অর্জন করেনি। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মানুষ বিষয়টি বুঝতে চায় না, কিন্তু আমরা যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি, সেটি শুধু একটি নিরাপত্তা জোট নয়, বরং আসলে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।’

এটি শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, একটি বাস্তব আইনি ঘাটতিও। ফলে তুরস্ক চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সামরিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারত, এমন ধারণাও দুর্বল হয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্রও বলেন, ‘সংগঠনের কাঠামো, কার্যপ্রণালি ও পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে।’ তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও বলেছেন, এই ব্যবস্থা পরিপক্ব হওয়ার আগে তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশকে প্রথমে এর নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে।

এরপর জোটটি আরও সদস্য নেওয়ার দিকে যাবে। মিসর, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে আলোচনায় আনা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠাতারা নিয়মকানুন চূড়ান্ত করার পরই সম্প্রসারণের বিষয়টি এগোবে। অর্থাৎ, জোটটি এখনো নতুন সদস্য খুঁজছে, একটি নির্দিষ্ট সদস্যগোষ্ঠী হিসেবে কার্যকরভাবে কাজ করছে না। এটিও দেখায় যে জোটটি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

সহজভাবে বললে, মক্কা চুক্তি এখন একটি রাজনৈতিক ঘোষণা এবং একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক কাঠামো তৈরির কাজ। অন্তত তিন স্বাক্ষরকারী দেশের একটি, তুরস্কে, চুক্তিটি এখনো আইনে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এটি এখনো এমন কোনো কার্যকর সামরিক জোট নয়, যার স্থায়ী ব্যবস্থা রয়েছে এবং দ্রুত যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্ধারিত প্রক্রিয়াও তৈরি হয়েছে।

ন্যাটোও একদিনে তৈরি হয়নি

মক্কা জোটের সঙ্গে ন্যাটোর তুলনা করাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই তুলনাই তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ন্যাটো ৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, বিস্তারিত আর্টিকেল ৫-এর প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করছে। তারপরও সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে ন্যাটো একটি ঐক্যবদ্ধ যুদ্ধরত বাহিনী হিসেবে অংশ নেয়নি। জোটটির অনেক সদস্য বরং উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দিয়েছে।

একটি পরিণত ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সামরিক জোটও যদি তার সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্যের অনুরোধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি বড় যুদ্ধে যোগ না দেয়, তাহলে মাত্র ছয় সপ্তাহ বয়সী একটি চুক্তির কাছ থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর প্রত্যাশা করা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিই প্রশ্ন।

যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ধারা সাধারণত অগ্নিসংকেতের মতো কাজ করে না। কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে প্রথমে আক্রান্ত পক্ষের পক্ষ থেকে সহায়তার অনুরোধ, এরপর সদস্যদের মধ্যে আলোচনা এবং তারপর কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়।

হুতিদের হামলার ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে, যার উত্তর প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো প্রকাশ্যে এখনো দেয়নি। কোনো রাষ্ট্রবহির্ভূত গোষ্ঠীর অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলের ওপর ধারাবাহিক হামলাকে কি এই চুক্তিতে উল্লেখ করা ‘সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে?

মক্কা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য কী

মক্কা চুক্তিকে দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ব্যবস্থা হিসেবে দেখার চেয়ে তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে এরই মধ্যে গভীর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। এই তিন দেশ এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যাতে কোনো একক বহিরাগত শক্তির ওপর একচেটিয়া নির্ভরতার পরিবর্তে তাদের হাতে আরও বেশি বিকল্প থাকে।

এটি এমন একটি প্রকল্প, যার ফল পেতে বছর লাগতে পারে, কয়েক দিন নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে এর রাজনৈতিক মূল্য বা ভাবমূর্তির ক্ষতি নেই। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলেও, সৌদি আরব যখন ইসরায়েলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা তিনটি পৃথক কাঠামোও কার্যত ব্যবহৃত হচ্ছে না।

এই তিন কাঠামোর মধ্যে রয়েছে একটি দ্বিপক্ষীয় মোতায়েন ব্যবস্থা, একটি সামুদ্রিক জোট এবং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি। এগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার না হওয়া তুরস্ক ও পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও কিছুটা চাপ তৈরি করছে।

মক্কা চুক্তির সঠিক পরীক্ষা এই সপ্তাহে তুরস্ক বা পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান আকাশে উড়েছে কি না, সেটি নয়। বরং আগামী কয়েক মাসে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রথমত, তুরস্ক চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদন করায় কি না। দ্বিতীয়ত, সচিবালয় চূড়ান্ত সনদ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সেই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে কি না, যেগুলো এখনো আলোচনার মধ্যে রয়েছে। তৃতীয়ত, ইস্তাম্বুলের বৈঠকে নির্ধারিত প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং যৌথ সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান বাস্তবে এগিয়ে নেয় কি না।

আগামী মাসগুলোতে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের অগ্রগতি বোঝার ক্ষেত্রে এগুলোই হবে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই সপ্তাহে জোটটির নীরবতা নয়, বরং এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিক প্রস্তুতিগুলোই দেখাবে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর কাঠামোয় পরিণত হয়।

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান